২৭ জুন, ২০১৭

এখনকার ঈদগুলো রঙ হারাতে হারাতে এমন বিবর্ণ হয়ে গেছে! কে বলবে এই ঈদের জন্য, চাঁদ রাতে ঘুরে বেড়ানোর জন্য একসময় কী রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার প্রহর পার করতাম! গতকাল ঈদ গেল। ঈদের কথা ভাবতে গেলে প্রথম যেটা মনে ভেসে ওঠে সেটা হচ্ছে আব্বার সকাল বেলার ডাকাডাকি। ছোটবেলার বেশিরভাগ ঈদগুলো শীতের দিকে পেয়েছি বোধহয়। কারণ পেছনে ফিরে চাইলে যে দৃশ্যটা মনে পড়ে বেশি তা হচ্ছে আমি লেপমুড়ি দিয়ে শুয়ে আছি, গভীর ঘুমে মগ্ন। ব্যাকগ্রাউন্ডে আব্বার ডাকাডাকি শোনা যাচ্ছে না শোনার মত করে। আম্মাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলছে ঈদের সকালে এতক্ষণ ধরে কেন বিছানায় আমি। নামাযটা নির্ঘাত মিস করবো। এত অলস হয়ে জীবনে কী করবো। ইত্যাদি ইত্যাদি। গত দুবছর ধরে আব্বাও নেই, কোন ডাকাডাকিও নেই। বড় হবার পর আব্বার সেই ডাকাডাকিটুকু তবুও ঈদের আমেজটুকু ধরে রেখেছিল। এখন বলতে গেলে আর দশটা সাধারণ দিনের মতই লাগে। ছোটবেলার পূর্ণদৈর্ঘ্য রঙিন ছবি এখন একদম সাদাকালো।

ঈদের দিন সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই সুবর্ণ’র মুখোমুখি। বড় বড় চোখ দুটো গভীর চিন্তামগ্ন হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলো – “আচ্ছা মামা, পাখিদের কি কোন ঈদ নেই? ওরা ঈদের দিন কোন আনন্দ করেনা?” বরাবরের মতই ওর এই গভীর দার্শনিক প্রশ্ন আমার মুখে হাসি ফোটায়। আমি হেসে বলি – “না। ওদের জন্য সবদিনই ঈদের দিন। দেখোনা প্রতিদিন ওরা কী আনন্দ নিয়ে পুরো আকাশজুড়ে ঘুরে বেড়ায়?!”

নামায পড়তে গিয়ে দেখি ঈদগাহ মাঠের ডানের এক তৃতীয়াংশ ছায়াঢাকা। বাকিটুকুতে কটকটে রোদ। ধর্মপ্রাণ মানুষজনের সিংহভাগ রোদের অংশটুকু খালি রেখে কেবল ছায়ার অংশটুকুতে বসে আছে। দেখে আমার হাসি আসে। নাস্তেক বোলগার হলেও আমি রোদভরা অংশটুকুর দিকেই পা বাড়াই। দ্বিতীয় কাতারে বসে ইমাম সাহেবের বয়ান শুনি। রোযা না রাখলে কী কঠিন কঠিন সব অভিনব উপায়ে শাস্তি পেতে হবে সেসব বেশ গ্রাফিকাল ওয়েতে ইমাম সাহেব একের পর এক বর্ণনা করে যান। বলতে বলতে দেখি তার চোখমুখ কেমন টকটকে, কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সেটা রোদের তীব্রতায়, নাকি বেরোজদারদের প্রতি নাখোশ হবার কারণে, ঠিক বুঝতে পারিনা। আমি মাথা নিচু করে পিঠের ওপর থেকে নিচে নামতে থাকা ঘামের বিন্দুদের গভীর মনোযোগে অনুসরণ করতে থাকি মনে মনে।

নামায শেষ করে বাসায় এসে জামা কাপড় পরিবর্তন করে সরাসরি বিছানায় উঠলাম। সঙ্গী সেই পুরনো সুহৃদ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। পায়ের তলায় সর্ষের অনুভূতি নিতে নিতে কখন ঘুমিয়ে গেছি টের পাইনি। উঠে মোবাইল স্ক্রীণে তাকিয়ে দেখি আড়াইটা বেজে গেছে। আজকাল ঘুমোলেও মাথাটা ঠিক নির্ভার হচ্ছেনা। বরং কেমন ভারী হয়ে থাকে সবসময়। অনুভূতিটা খুব অস্বস্তিকর। পিএইচডির চিন্তা মাথায় বেশ ভালোভাবেই ভূতের মত চেপে আছে, বুঝতে পারছি। কিন্তু এটাকে কিভাবে চ্যাংদোলা করে মাথা থেকে নামানো যায় সে উপায় এখনো ভেবে বের করতে পারিনি। বিছানা থেকে উঠে হাতমুখ ধুলাম। নিচে নেমে খেয়ে ভাবতে লাগলাম কী করা যায় এরপর। ওদিকে আপু আমাকে সহ সুবর্ণ, আদীবাকে ঝাড়ি দিচ্ছে। ঈদের দিনে ঘরের ভেতর এরকম ঝিমাচ্ছি দেখে। আপু বললো পিচ্চিদের নিয়ে বাইরে থেকে ঘুরে আসতে। আমি রোবটের মত বললাম – আচ্ছা। তারপর বিকেলের দিকে আমরা চারজন বেরোলাম, আমি, ভাইয়া, সুবর্ণ, আদীবা। মাঝপথে সুবর্ণর বান্ধবী জারা জুটলো আমাদের সাথে। কলেজের পুকুরপাড়ে গিয়ে দেখি দুটো ইনফ্ল্যাটেবল নৌকা ভাসছে এককোণায়। আর তার কাছে পিচ্চিদের ভীর। লাইন ধরে দুইজন করে নৌকায় উঠছে, কিছুক্ষণ পুকুরের একপাশে এদিক ওদিক ভেসে থাকার পর পরের দুইজন উঠছে। প্রথমে ভাবলাম কেউ হয়তো টাকার বিনিময়ে করাচ্ছে ওসব। পরে জানা গেল বিদেশ ফেরত কেউ একজন ফেরার সময় রাবার বোট দুটো নিয়ে এসেছে। উনিই পিচ্চিদেরকে নৌকায় তুলে ঘুরাচ্ছেন। সুবর্ণ, জারা-কে দেখে বোঝা গেল তাদের উঠতে মন চাচ্ছে। ভাইয়া ওদেরকে নিয়ে গেল সামনে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর ওরাও নৌকায় উঠলো। দেখে বোঝা যাচ্ছিল বেশ মজা পাচ্ছে ওরা। যাক, অন্তত ওদের ঈদ আমার মত বোরিং হচ্ছেনা তাহলে একদম! নৌকাপর্ব শেষে কৃষিফার্মের দিকে এগুতে লাগলাম আমরা। পথে পিচ্চিদেরকে আইসক্রীম কিনে দেয়া হলে। সাথে আমাকেও! আমরা আইসক্রীম খেতে খেতে কৃষিফার্মের কোয়ার্টারের দিকে হাঁটতে লাগলাম। ওখানে আপুর এক কলিগ থাকেন কোয়ার্টারে। বাসার সামনে দোলনা আছে, খেলার মাঠ আছে। পিচ্চিরা দোলনায় চড়বে। তাই যাওয়া। আমার সরকারি সব কোয়ার্টারের মত এই কোয়ার্টারটাও ভালো লাগে। বারদুয়েক গিয়েছি আগেও। কোয়ার্টার এরিয়াতে ছিমছাম,সটান দাঁড়িয়ে থাকা লাল ইটের বিল্ডিং, বাধানো রাস্তা, মাঠে কলোনীর ছেলেমেয়েদের হৈচৈ – এই পরিচিত দৃশ্যগুলো দেখতে ভালো লাগে। চারপাশ বেশ শান্ত আর নির্ভাবনাময় একটা দৃশ্যকল্প ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে মনে হয়। ফাতেমা আপা দোলনাতেই বসে ছিলেন তার কয়েকমাসের পিচ্চিটাকে নিয়ে। নাম জিজ্ঞেস করলাম, বললেন আফরীন। বাবার নাম “আরিফ” এর সাথে মিলিয়ে রাখা। পিচ্চিটা গম্ভীর মুখে পৃথিবীর সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিল। মোটাসোটা, গোলগাল একটা নরোম বলের মত মানবশিশু। দেখে মনটা এমনিতেই হাসিহাসি হয়ে ওঠে। সুবর্ণরা দোলনায় দোল খাচ্ছিল, আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাঠে ছেলেদের ক্রিকেট খেলা দেখছিলাম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। শেষ কবে ক্রিকেট খেলেছি মনে করার চেষ্টা করলাম। উত্তর খুঁজে পাওয়ার আগেই সজোরে মারা একটা বল আমার দিকে আসতে লাগলো। আমি রিফ্লেক্স থেকেই পুরনো অভ্যাসে ক্যাচ ধরার চেষ্টা করলাম। বলটা হাত ফসকে বেরিয়ে গেল। কোন কারণ ছাড়াই বিব্রত লাগলো একটু। যখন খেলতাম তখন লং অনে ফিল্ডিং করেছি অনেক। হাই ক্যাচ বেশ ভালো ধরতে পারতাম। সেই পুরনো দিনের ক্ষিপ্রতা বা স্কিল দীর্ঘ দিনের অনভ্যাসে এতদিনে হারিয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু হয়তো মনের গভীরের কোন অংশ যুক্তিহীনভাবে আশা করছিল সবকিছু এখনো হারিয়ে যায়নি। সে ভুল ভাঙার বেদনা নিয়ে বলটা কুড়িয়ে আবার ফেরত পাঠালাম ফিরতি থ্রো তে। ততক্ষণে বেশ সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। চারপাশের আলো ঝুপ করে কমে যাচ্ছে। ফাতেমা আপার বড় ছেলে ক্রিকেট খেলা শেষে ফিরে এসেছে। ওর সাথে আগেও একবার দেখা হয়েছে, শেষবার যখন ওদের বাসায় এসেছিলাম। এবার চিনতে পারেনি। চেনার কথাও না অবশ্য। ছোটবেলার জগতের দৃশ্যপট খুব দ্রুত এক পর্ব থেকে আরেক পর্বে চলে যায়। ও ওর বন্ধুর সাথে একটা সেভেন আপের প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে ফুটবল খেলছিল রাস্তার ওপর। আমিও যোগ দিলাম এগিয়ে গিয়ে। তিনজন মিলে মিনিট পনেরো খেলেই একদম ঘেমে নেয়ে একাকার। ততক্ষণে সন্ধ্যা পুরোদমে হাজির হয়ে গেছে। রুবাইয়াতের বন্ধু বাসায় ফিরে গেল। সন্ধ্যার শেষ আবীরটুকুও মুছে যাচ্ছে, আমি ঘামে ভেজা হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি। পাশের পানির ট্যাপে হাত মুখ ধুয়ে নিলাম। তারপর তিনতলায় ফাতেমা আপার বাসায় গেলাম। আমার আগেই পিচ্চিরা চলে গিয়েছিল। আমি খেলার জন্য থেকে গিয়েছিলাম। তার আগে কিছুক্ষণ দোলনায় দোল দিয়েছি ওদেরকে। জারাকে দেখে বোঝা যাচ্ছিল সে খুব মজা  নিয়ে দোল খাচ্ছে দোলনায়। একটু পরপর দু বান্ধবী মিলে খিলখিল করে হাসছিল। পুরো বিকেল আর সন্ধ্যা তাদের বেশ ভালো কেটেছে। তাদের ছোটাছুটি, আর উচ্ছাসই বলে দিচ্ছিল সে কথা। ফেরার পথে একজন আরেকজনকে বলছিল – আজকের ঈদে খুব মজা হলো, তাইনা? আমি শুনে মনে মনে হাসলাম। ছোটবেলার চাওয়া পাওয়াগুলো কি সামান্য অথচ কত সহজেই না মন ভরিয়ে দেয়! আমি এই ছেলেবেলা, আর এইসব আনন্দময় সরলতা বহু আগেই পেছনে ফেলে এসেছি।

জারার মা বারবার ফোন দিচ্ছিল ওকে বাসায় চলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ও চাচ্ছিল আরো কিছু সময় সুবর্ণর সাথে কাটাতে। শেষমেষ আপু ফোনে সে কথা বলে দিলো ফোনে জারার মা কে। দুজন মিলে বাসায় এসে দেখি কাপড় চোপড় খুলে খালি গায়ে হারমোনিয়াম নিয়ে বসেছে। একটু মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করে দেখলাম সুবর্ণ নির্ভুলভাবে সারেগামা বাজাচ্ছে। আপুকে জিজ্ঞেস করতে বললো আদীবা ওকে শিখিয়েছে। কয়েকবার দেখিয়ে দেয়ার পরেই নিজে থেকে সারেগামা বাজাতে পারে এখন। আমি আপুকে বললাম ওকে গানের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিতে। আপু বললো – দেখি। আমার কাছে মনে হয়েছে মিউজিক ব্যাপারটা ওর ভেতর সহজাত। একটু গাইডেন্স পেলে বেশ ভালো করবে গানে। দেখি আবার আপুকে বলে দেখবো পরে।

রাতের বেলা বাইরে একটু বৃষ্টির আভাস। বাইরে শব্দ পাচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিল বৃষ্টি নামবে জোরে জোরে যে কোন সময়। আমি বিছানায় তখন শুয়ে আছি। সুবর্ণ জানালার গ্রীলে গাল ঠেকিয়ে বাইরের অন্ধকারে তাকিয়ে আছে। শব্দের জের ধরে বৃষ্টিকে দেখার চেষ্টা বোধহয়। কিছুক্ষণ পরে আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে হঠাৎ বলে উঠলো – “মামা, তুমি কি বৃষ্টির গন্ধ বুঝতে পারো?” তারপর উত্তরের অপেক্ষা না করে নিজে নিজেই বলে উঠলো – “আমি পারি।” এই বলে পাশের রুমে চলে গেল।

আমি শব্দহীন হয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে তারপর বৃষ্টির গন্ধ বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম।

 

 

 

 

 

Advertisements
This entry was posted in দিন লিপি. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s