২৫জুন, ২০১৭

বাসায় এসেছি ২২তারিখে।

বাসায় এসেছি লেখার পর মনে হলো এটাতো আসলে আমার আপুর বাসা। আব্বা থাকার সময় প্রতিবছর ঢাকা থেকে ঘাটাইলে যেতাম ঈদের সময়। সেটা বাসা ছিল। ঢাকার সীমানা পার হতে হতে মনে হতো আমি এখন নিজের বাসার সীমানার কাছাকাছি এগিয়ে যাচ্ছি। গত দু’বছর হলো আমার আর যাওয়ার বাসা নেই। ঢাকার বাসাটাই এখন নিজের বাসা হয়ে গেছে। বোঝা গেল দুটো বছরও নতুন করে বাসার ঠিকানা এডিট করার জন্য খুব কম সময়।

ওকে, আপু বাসায় এসেছি ২২তারিখে। উপলক্ষ ঈদের ছুটি। ইনফ্যাক্ট যে কোন ছুটিছাটায় আমার যাওয়ার জায়গা হচ্ছে আপুর বাসা। নতুন বাসায় উঠেছে ও এবছরই। মাসখানেক হয়ে গেল। এ বাসাটা আমার বেশ পছন্দের। সবকিছুতেই নতুন বইয়ের মত আনকোরা এক গন্ধ। নতুন যে কোন কিছুই কার না ভালো লাগে। আমি আসলে আম্মার রুমটায় থাকি, আম্মার সাথে। প্রচুর আলোবাতাস খেলে রুমটাতে। বিছানায় শুয়ে দুপাশে আকাশ দেখা যায়, জানলার পাশে গাছের সবুজ সতেজ পাতাগুলো বাতাসে নুয়ে পড়ে হাই হ্যালো বলে নিয়ম করে। আমার বেশ ভালো লাগে এ রুমটা। এ রুমটায় অনেক আলো, বাতাস আছে। আর আছে আম্মা। আমি যত বড় হয়েছি আম্মার সাথে থাকার ফ্রিকোয়েন্সি ততই কমে এসেছে। অথচ মনে পড়ে, ক্যাডেট কলেজে যাওয়ার আগে প্রতিরাতে আম্মার সাথে জড়াজড়ি করে, একটা পা আম্মার ওপর না তুলে দিয়ে কখনো ঘুমাতে পারতাম না। আমার ঘুমের জন্য আম্মার গায়ের গন্ধ লাগতো, আম্মাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকা লাগতো। অথচ সময়ের সাথে সাথে আমার সে অভ্যাস কীভাবে একটু একটু করে পাল্টে গেছে, নিজেও বুঝে উঠতে পারিনি ঠিকঠাক।

২২তারিখ ঢাকার বাসা থেকে বের হয়েছি একটু দেরি করে। এনা’র কাউন্টারে এসে দেখি লাইন তখনো খুব বেশি বড় হয়নি। তাই দাঁড়িয়ে গেলাম পেছনে। বিশ পঁচিশ মিনিট অপেক্ষা করা যেতেই পারে। বাস ছাড়ার পরই আমি ঘুমিয়ে গেছি কখন টের পাইনি। যখন ঘুম ভেঙে গেল তখন গাজীপুর ছাড়িয়ে গেছে বাস। একটু সজাগ হতেই টের পেলাম বাস মোটামুটি উড়ে চলছে। নিজের অজান্তেই আমার পা দুটো সামনের সীটের পাদানি তে রাখলাম হঠা ব্রেক কষলে যেন সামলে নিতে পারি। ড্রাইভার সাহেব কোন কিছুরই তোয়াক্কা করছিলেন না, বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার, সামনে যা কিছু আসছিলো সবকিছু সাঁই সাঁই করে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিলেন। পাশ কাটানোর সময় যখন স্পীড বাড়িয়ে দিচ্ছিলেন পেটের ভেতর কেমন হালকা অস্বস্তিকর একটা অনুভূতি হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল গ্র্যাভিটির মান একটু খানেক কমে যাচ্ছে যেন। মাঝে নামলো বৃষ্টি। শঙ্কা বেড়ে গেল একটুখানি। তবু ভালোভালোয় একসময় ময়মনসিংহ পৌঁছলাম কোন অঘটন ছাড়া। ড্রাইভারের প্রিয় গান মনে হয় – মানুষ আমি আমার কেন পাখির মত মন?!

ময়মনসিংহ পৌঁছে সিএনজিতে উঠলাম জামালপুরে আসার জন্য। ময়মনসিংহ-জামালপুর রোডটা এই কয়মাসে জঘন্য হয়ে গেছে একদম। মুক্তাগাছায় পৌঁছে দেখি সেখানে ঢাকার মত বিশাল জ্যাম পড়ে গেছে। সিএনজি ড্রাইভার দুইনম্বরি করে ডাবল লাইনে না এগোলে বহুক্ষণ সেই জ্যামে বসে থাকতে হতো। অবশ্য ডাবল লাইনে এগোতে গিয়ে কমপক্ষে দুইবার ট্রাকের সাথে সংঘর্ষের একটা অবস্থা তৈরি করে ফেলেছিলেন ড্রাইভার সাহেব। ড্রাইভার লোকটা বেশ চিকন বুদ্ধির মানুষ। নিজে যখন ডাবল লাইনে এগোচ্ছিল তখন সেটা নিয়ে তার কোন বিকার নেই। আবার অন্য একজন যখন ডাবল লাইনে তাকে ক্রস করতে যাচ্ছিল, বেশ ইমোশনাল এংগেলে তাকে বেশ ধুইয়ে দিলো ড্রাইভার। আমি মনে মনে ভাবলাম – এরচে ভালো কোন উদাহরণ দিয়ে বাঙালির চরিত্র বোঝানো যাবেনা।

আমি বাসায় আসবো বলে সুবর্ণ আগের দিন থেকেই ফোন দিচ্ছিল বারবার কখন পৌঁছবো জানতে। আমি মোবাইল স্ক্রীনে আম্মার নাম দেখে ফোন ধরে বলি – হ্যালো, আম্মা। ওপাশ থেকে দাঁত পড়া চিকন সুরে শোনা যায় – আমি তোমার আম্মা না, আমি সুবর্ণ! এই পিচ্চিটা কখন যে আমার ওপর এত ন্যাওটা হয়ে গেছে নিজেই জানিনা। আমার বাসায় আসার কথা শুনলে সুপার এক্সাইটেড হয়ে যায়। আদীবা আমার এতটা ভক্ত কখনো ছিল বলে মনে পড়েনা। অবশ্য সুবর্ণ আদীবার থেকে সব কিছুথেকেই বিপরীত মেরুতে। আদীবা একটু চুপচাপ। সুবর্ণ অনেক ছটফটে, চঞ্চল। সারাক্ষণ কটকট করে কথা বলে সারা বাসা মাথায় তুলে রাখে। মাঝে মাঝে মনে হয় এই পিচ্চিগুলো যদি এই বয়সেই সারা জীবনের জন্য আটকে থাকতো! কিন্তু সে তো হবার নয়। চোখের সামনে ধেই ধেই করে বড় হয়ে যাচ্ছে। প্রতিবারই কয়েক মাস পর পর বাসায় এসে সে পরিবর্তন টের পাওয়া যায়। এবার এসে দেখি তার সামনের তিনটে দাঁত পড়ে গেছে। আসার সাথে সাথেই সে দাঁত পড়ার গল্প শোনালো আমাকে। দু’টো দাঁত এমনিতেই পড়ে গেছে কোন কিছু না করতেই, আর আরেকটা দাঁত নানুমণি তুলে দিয়েছে। আজ সকালে আমি মাত্র ঘুম থেকে উঠে সোফায় বসে ঝিমোচ্ছি, হঠাৎ টাইলস ফ্লোরের ওপর ধুপধাপ ধুপধাপ। সুবর্ণ সুপার এক্সাইটেড হয়ে রুমে ঢুকে ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বললো – “মামা দেখো, ভাত খেতে গিয়ে আমার আরেকটা দাঁত পড়ে গিয়েছে!” তাকিয়ে দেখি তার ডান হাতের মুঠোর ভেতর একটা নিরীহ দর্শন সদ্য ওঠা দাঁত ভাতের সাথে মাখামাখি হয়ে শুয়ে আছে!

এবার এসে সুবর্ণ সংক্রান্ত আরো নতুন কয়েকটা জিনিস আবিষ্কার করলাম। একটা একটা করে বলি।

গতকাল সন্ধ্যায় দেখি সুবর্ণ বিছানার ওপর বসে বসে কাঁচি দিয়ে পেপার কাটছে। একটু কাছে এসে দেখি প্রথম আলোর ঈদ সংখ্যা থেকে তারকাদের ছবি কাটছে। জিজ্ঞেস করলাম কেন কাটছো। বললো – এমনি, কাটতে ভালো লাগে। একটু পর অবশ্য বললো – এগুলো আপুকে দেব, আপু খুশি হবে! আমি ভাবলাম -হুম! একটা ছেলের ছবি কাটতে কাটতে বললো – মামা, জানো এই ছেলেটা ইংরেজি গান করে। আমি একটু ভালোমত তাকিয়ে দেখি সেটা ওয়ান ডিরেকশনের জেইন মালিকের ছবি! প্লে তে পড়া পিচ্চি জেইন মালিককে কীভাবে চেনে জিজ্ঞেস করতেই বলে – “উটুব!” ইন্টারনেট এর দৌড় কতদূর চলে গেছে! তার এসব কাটাকাটি দেখে আমি তার মাথায় আরেক ভূত চাপিয়ে দিলাম। ওকে বললাম ছোট থাকতে আমিও পছন্দের মানুষের ছবি কেটে একটা সাদা খাতায় আঠা দিয়ে সাঁটিয়ে রাখতাম, সেটাকে স্ক্র্যাপবুকিং বলে। ব্যাপারটা সম্ভবত তার বেশ পছন্দ হয়েছে। আজকে সকালে দেখি তার বাবার কাছে গিয়ে বাসায় আঠা আছে কীনা জিজ্ঞেস করছে। শেষখবর পাওয়া পর্যন্ত সে একটা ডায়রী ম্যানেজ করেছে, কিন্তু আঁঠা এখনো খুঁজে পায়নি।

আরেকটি বড়সড় ঘটনা হচ্ছে সুবর্ণ এখন বানান করে বেশ পড়তে পারে। কেন্দ্রের ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী থেকে ইস্যু করে আনা উপেন্দ্রকিশোরের হাসির গল্প এবার এসে দেখি সে বিছানায় শুয়ে শুয়ে বানান করে করে পড়ছে। আপুকে জিজ্ঞেস করলাম ঘটনা কী। বললো এটাই তার বানান করে পড়া প্রথম বই হতে যাচ্ছে। আমি দেখে বেশ পুলকিত এবং আনন্দিত। এতদিন বই পড়ে শোনানোর জন্য আম্মা আর আপুর কাছে ঘ্যান ঘ্যান করতো। এখন নিজেই বেশ গাম্ভীর্য নিয়ে নিজের বই পড়ছে। দৃশ্যটা অভূতপূর্বতো বটেই, মজারও! যুক্তবর্ণগুলো এখনো ঠিকঠাক বাগিয়ে নিতে পারেনি, তবে খুব বেশি সময় লাগবেনা মনে হচ্ছে। আমার দুই ভাগ্নীই বেশ মনোযোগী পাঠক হয়ে গেছে এরমধ্যেই, এই ব্যাপারটা আমার বেশ ভালো লাগে। ছোটবেলা থেকেই ওদের জন্য বইই কিনে নিয়ে আসতাম বেশি অন্য কোন শিশুতোষ খেলনার চেয়ে। এখন মনে হচ্ছে সেটা বেশ ভালো কাজে দিয়েছে।

আরেকটা ঘটনা যেটা এবার এসে খেয়াল করলাম সেটা হচ্ছে সুবর্ণ বেশ কয়েকটা শব্দে এ কার এর বদলে ই-কার দিয়ে বলে। যেমন: টেবিল কে বলে টিবিল, লেবুকে লিবু, বেগুন কে বিগুন! শুনতে খুউব মজা লাগে। কেউ শুদ্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করেনা অবশ্য! বলুক না। বড় হয়ে গেলে এই ই-কারময় ঘটনাগুলোইতো মধুমাখা হয়ে থাকবে স্মৃতিতে।

সুনীলের “পায়ের তলায় সর্ষে” পড়া শুরু করেছি। পড়তে পড়তে এক জায়গায় এসে জানতে পারলাম “সুবর্ণরেখা” নামে এটা নদীও আছে। এতদিন শুধু ঋত্বিক ঘটকের সিনেমার নাম হিসেবেই জানতাম। তবে নামটা যে ভীষণ সুন্দর সেটা বহু আগে থেকেই জানা হয়ে গেছে!

 

 

 

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s