দশ দশ পনেরো

আমি মানুষ। অন্যান্য মানুষদের মতই আমারও দুইখান হাত, দুইখান পা ইত্যাদি ইত্যদি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের পাশাপাশি স্বাভাবিক নিয়মে একখান মাথাও আছে। আর সেই মাথার উপর বর্তমানে একখানা বড়সড় আকৃতির পাহাড় উঠে বসে আছে। পাহাড়খানা কাজ দ্বারা নির্মিত । বড়ই নাছোড়বান্দা সেই পাহাড়। তবে আমিও কি কম যাই। পাহাড়টারে ঘাড় ধরে মাথা থেকে নামায়ে ব্লগ লিখতে বসলাম। কারণ হঠাৎ মনে হইলো আমার একখান ব্লগ লিখতে হবে। কেন লিখতে হবে সেই ব্যাপারে আমার একমাত্র মাথাকে জিজ্ঞেস করেও তেমন কোন সদুত্তর পাওয়া গেলোনা। তাই আমি ভাবলাম, উত্তর দিয়ে আর কী হবে, যাই বরং একখান ব্লগ লিখি।

পরসমাচার এই যে, এতটুকু লিখার পর আমার মনে হইতেসে, থাক, ব্লগ লিখার দরকার নাই। কিন্তু আসল কথা হইতেসে আমি চাইলেও কিছু লিখতে পারতেসিনা। একটা সময় ছিলো যখন কীবোর্ডখানা চিন্তা করার আগে আগে কতসব শব্দ টাইপ করে ফেলতো। এখন ঠেলেঠুলেও বাটনগুলারে দিয়ে কোন নতুন অক্ষর লিখানো যায়না। আমি যেমন অলস, আমার কীবোর্ডও তেমন কুড়ে। যেমন মালিক, তেমন ভৃত্য। যেমন কুকুর, তেমন মুগুর। নাহ, শেষ প্রবাদটা মনে হয় ঠিক হইলোনা। ঠিক হইলেই বা কী, বেঠিক হইলেই বা কী। তারচে বরং ব্লগ লিখায় মন দেই।

আচ্ছা, আবারো রিফ্রেশ মেরে শুরু করি। পরসমাচার এই যে, আমি ভালো আছি। ওহ ওয়েট, না, আমি আসলে ভালো নাই। কিংবা হয়তো সত্যিই ভালো আছি কিন্তু ব্যাপারটা ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারতেসিনা। কিংবা ভালো-মন্দ দুই মিলিয়েই আছি। আমি বরাবরই কনফিউজড মানুষ। পাখি পাকা পেপে খায়। পেঁপে পাকা পাখি খায়। আমি ভালো আছি, কিংবা আমি ভালো নাই। হোয়াটএভার। সবচে বড় ব্যাপার আমি বেঁচে আছি। আজকাল বেঁচে থাকাটাই বোধহয় ভালো থাকা।

আব্বা মারা গেছেন একমাস দুইদিন হলো। আমার আব্বা, হ্যা আমার আব্বাইতো। এমন একজন মানুষ যাকে নিয়ে কখনো খুব গভীরভাবে দুইমিনিট সময় আলাদা করে কিছু ভাবিনাই। আব্বা কিংবা আম্মা – এই দুইজন আমার কাছে শ্বাস প্রশ্বাস নেয়ার মত। সারাক্ষণই নিচ্ছি, কিন্তু সচেতনভাবে সেটা কখনো ভেবে দেখিনা। দেখিনাই। অথচ গত একমাস দুইদিন ধরে ভেবে টেবেও তাকে আর শ্বাস প্রশ্বাসের মতন স্বাভাবিক বিষয় মনে হচ্ছেনা। আমি ঠিকই অবচেতন মনে নিয়ম মেনে অক্সিজেন নিচ্ছি, আর কার্বনডাইঅক্সাইড ছাড়ছি। কিন্তু আব্বা নিচ্ছেন না। আব্বা চলে গেছেন। সূর্য পূর্ব দিকে উঠে, পশ্চিম দিকে অস্ত যায়। আমি দুই বেলা ভাত খাই, এক বেলা রুটি। ঠিক আগের মত করেই। শুধু মোবাইলে আব্বার নম্বর ডায়াল করলে আব্বাকে আর পাওয়া যায়না। কী অদ্ভুত ব্যাপার। অথচ আব্বা যেদিন মারা গেল সেদিন সবাই কাঁধে হাত দিয়ে বললো – এটাই নাকি স্বাভাবিক। এটাই মেনে নিতে হবে। এখানে অদ্ভুতুড়ে কিছু নাই। আমি মেনে নিতে নিতেও মেনে নিতে পারিনা। আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে আজকাল বড় বেশি। মনে পড়ে বিকেল বেলা আব্বার একটা অাঙুল ধরে কলেজ মাঠের দিকে ছোট ছোট পায়ে হেঁটে চলা সেই ছোট্ট ছেলেটার কথা। যে হঠাৎ করে না চাইতেও এখন বড় হয়ে গেছে। কিংবা হয়তো আরো আগেই বড় হয়ে গিয়েছিলো, টের পেলো মাত্র কিছুদিন হলো। কেননা, শেষ একটা বছর আব্বাই বরং আমার হাত ধরে চলাচল করতো বাইরে গেলে। আমি আব্বার হাত ধরে ধীর গতিতে তাল মিলিয়ে সামনে এগোতাম। হাঁটতে হাঁটতে ছোটবেলার সেই ছোট ছেলেটার কথা মনে পড়তো। বাবার একটা আঙুল ধরে হেঁটে চলা ছোট্ট ছেলেটা। যে ছেলেটা বড় হয়ে গিয়ে অনেকক্ষণ ধরে একটা ব্লগ লিখার চেষ্টা করতেসে। কিন্তু পারতেসেনা।

Advertisements
This entry was posted in জঞ্জাল, দিন লিপি. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s