সুশি খুশি

কাল থেকে আকাশের ভীষণ মন খারাপ। কখনো ফিঁচ ফিঁচ করে কাঁদছে। কখনো আবার হাউমাউ করে। আবার কখনো কখনো ভালোমত না তাকালে চোখের জল বোঝা যাচ্ছেনা। কিন্তু মানুষজনের সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। এই যেমন জামান। এখন দুইটা বাজে , অথচ তার ঘুম থেকে ওঠার কোন নাম নেই। ঘুমাচ্ছে তো ঘুমাচ্ছেই। অবশ্য এই ওয়েদার এ ঘুমালে খুব বেশি দোষও দেয়া যায়না। আমি কেন ঘুমাচ্ছি না? উমম, জটিল প্রশ্ন। আমার ইদানিং একটা নির্দিষ্ট সময়ে উঠতে উঠতে অভ্যাস হয়ে গেছে। চাইলেও এর বেশি শুয়ে থাকতে ভালো লাগেনা। তাই।

আজকে সেকেন্ড ওয়ান্ডে ছিল। বিএন ভার্সাস এনজেড। কিন্তু বৃষ্টিতে সব ভেসে গেল। আর তাই আমার মন খারাপ। বেশ আশা নিয়ে বসেছিলাম আজকের জন্য। ( দীর্ঘশ্বাস )

আমরা সেদিন একটা জাপানীজ রেস্টুরেন্টে গেলাম। রায়হান আর জামান খাওয়ালো ওদের স্কলারশীপের টাকা বাড়লো এইজন্য। আমরা বলতে আমি, রায়হান, সামিয়া, মিস্টার, জামান, ইকবাল। রায়হান বললো সাড়ে ছয়টায় সৈনিক ক্লাবের ওখানে থাকতে। সিএনজিতে গিয়ে আমি সাড়ে ছয়টার আগেই পৌছে গেলাম। কিন্তু সিএনজি থেকে নেমে ডাউটে পড়ে গেলাম। জায়গার নাম সৈনিক ক্লাব, কিন্তু ক্লাবটা কোথায়? কিন্তু বেশিক্ষণ সে চিন্তায় তা’ না দিয়ে , আমি বিলবোর্ডে আড়ং এর মেয়েটার ভাবভঙ্গী মনযোগ দিয়ে দেখা শুরু করলাম। অবশেষে ওরা আসলো। অবশ্য সামিয়া আসলো ওদেরও একটু আগে। তারপর সবাই মিলে রওনা হলাম রেস্টুরেন্ট এর দিকে। অবশ্যই রিকশা তে। রাস্তা পার হবার সময় আমরা সবাই পার হয়ে গেলাম। কিন্তু জামান আর পার হতে পারেনা। রায়হান বললো, ব্যাপার নাহ। জামান কোন ডিসিশনই একবারে নিতে পারেনা। আমরা বললাম, হুম, ঠিক!

রেস্টুরেন্টের নাম Samdado। মিস্টার মনযোগ দিয়ে কিছুক্ষণ পাশের জাপানীজ লেখাটা পড়ার চেষ্টা করতে করতে একসময় হাল ছেড়ে দিলো। বদলে হঠাৎ আবিষ্কার করে বসলো এই রেস্টুরেন্ট টা সামিয়ার দাদা প্রথম শুরু করেছিল। কারণ রেস্টুরেন্টটার নাম স্যাম দাদু (Sam Dado)। আমরা কিছুক্ষন এটা নিয়ে ফান করলাম সামনের ফুটপাত এ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। আর দেখলাম আমরা ছাড়া এই রেস্টুরেন্টে সবাই গাড়ি নিয়ে আসে। আর বেশিরভাগ মেয়েগুলোই ছোট ছোট প্যান্ট পড়ে আসে। সেগুলো দেখে আমার আদীবার প্যান্ট এর কথা মনে পড়ে গেল। ওর বয়েস পাঁচ বছর। আমার ভাগ্নী।

তারপর একসময় একটা কাপল আসলো। মেয়েটা নামার পর দেখলাম সেও আদীবার মত একটা প্যান্ট পড়ে এসেছে। চেহারা দেখে বোঝা যায়না, দেশী নাকি ল্যাটিন আমেরিকান। মিষ্টার বললো দেশী না হয়েই যায়না। আমি অব্শ্য চেহারা দেখার মত সুযোগই পাইনি। তার আগেই ঢুকে গেল ভেতরে। ততক্ষনে রায়হান, ইকবাল চলে এসেছে। আমরা ভেতরে ঢুকে গেলাম। দরজার কাছে গিয়ে দেখি নিচতলায় ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই অবস্থা। আর আমাদের দেখে সেই পিচ্চি প্যান্ট পড়া মেয়েটা বলে উঠলো – ও মাই গড! তারপর ওয়েটার আমাদের দোতলায় নিয়ে গেল। গিয়ে মনে হলো এখানটাতেই ভালো। ভীড় নেই, শুধু আমরা। আর একটা কোরিয়ান কাপল। আমরা বসতে না বসতেই সেই মেয়েটা আর ছেলেটাও আমাদের রুমে ঢুকলো। আমরা হাঁ হয়ে কিছুক্ষন মেয়েটাকে দেখলাম। গত ছয় মাসে আমি (কিংবা আমরা) এত সুন্দর চেহারার কোন মেয়েকে দেখিনি এটা নিশ্চিৎ। মেয়েটার ইংরেজী উচ্চারণ শুনে আমরা আবার ডাউটে পড়ে গেলাম। কারণ নেটিভ ল্যাংগুয়েজ না হলে এত চমৎকার ইংরেজি কেউ বলতে পারেনা।
তো আমরা তারপর চপস্টিক নিয়ে বিজি হয়ে গেলাম। কারণ কেউই আগে চপস্টিক ব্যবহার তো পরের কথা, টিভি স্ক্রীণ ছাড়া চোখেও দেখিনি । একমাত্র রায়হানেরই ভাসা ভাসা কিছুটা ধারণা আছে। সে সেটুকু জ্ঞান নিয়েই বেশ ভাবের সাথে চপস্টিক ধরা শিখাইতে লাগলো। কিন্তু কিছুক্ষণ পর দেখা গেল সে নিজেই ব্যাপারটা ঠিক ঠাক পারতেসেনা। তারপর আমরা চপস্টিক নিয়ে কিছুক্ষণ খেলাধূলা করতে করতেই কমপ্লিমেন্টারি দুইটা আইটেম আসলো। যার একটা ছিল সেদ্ধ কি একটা সবজি, এক বাটি বাদাম, আর আরেকটা বাটিতে সস এ ভেজানো বাধাকপি। আমরা বিপুল উদ্যমে চপস্টিক দিয়ে এক্সপেরিমেন্ট চালাইতে লাগলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যে দেখা গেল আমি চপস্টিক এ মোটামুটি প্রো হয়ে গেসি। আর ইকবাল বাধাকপি চিবাইতে চিবাইতে বলতে লাগলো – বাসাতেও কোনদিন জীবনে এত মনযোগ দিয়ে বাঁধাকপি খায়নাই। আমরা শুনে হা হা হি হি করে হাসলাম কিছুক্ষন। তারপর একসময় অরিজিনাল মেনু আসলো। এইক্ষেত্রেও রায়হান আমাদের গাইড। কারণ সে আসার আগে রনি ভাইরে ফোন দিয়ে জেনে আসছে কিভাবে কোনটা দিয়ে শুরু করতে হয়। কিন্তু শুরুর আগেই রায়হান তার শিখে আসা টিউটোরিয়াল ভুলে গেল। তাই আবার রনি ভাইকে ফোন । এইবার শুনে টুনে রায়হান আর সামিয়া মিলে ওয়াসাবি নামের একটা বস্তু আর সস দিয়ে কি একটা পেস্ট বানালো। আর বললো, নে এইবার এইটাতে ভিজায়া ভিজায়া অন্যগুলা খা!
এদিকে পাশের কোরিয়ান কাপলটা ঠিক সিনেমার মত করে টেনে টেনে কথা বলেই যাচ্ছিল। শুনে মনে হয় ঝগড়া চলতেসে। মিস্টার খাওয়া বাদ্দিয়ে সেই কনভারসেশনের সাবটাইটেল দেয়া শুরু করলো। আমরা হাসতে হাসতে খাবো, নাকি খেতে খেতে হাসবো ঠিক বুঝতে পারলাম না। পরে ঝাড়ি দিয়ে তাকে থামানো হইলো। আইটেম এর মধ্যে সুশি ছিল। সুশি হচ্ছে সেদ্ধ মাছ আর রাইস দিয়ে তৈরি একটা খাবার। তো সেটা রায়হানের তৈরি করা মিক্সচারে ভিজিয়ে মুখে দিতেই মনে হলো হাই ভোল্টেজ শক খেলাম। পেস্টের জিনিসটা যে সরিষার সাথে মিশিয়ে তৈরি সেটা বুঝতে টাইম লাগলোনা। ঝাঁঝ একদম মাথার তালুতে গিয়ে ঝাকি খেল, আর আমরা ঝিম মেরে কতক্ষন বসে রইলাম। এমনি করে একসময় সবগুলোই খেয়ে ফেল্লাম। এমনকি কাঁচা বাঁধাকপির প্লেটও একদম খালি। তারপর খেয়ে টেয়ে আমরা সেই বিদেশিনীকে আবার দেখতে লাগলাম। আর ভাবতে লাগলাম – কী সুন্দর! কী সুন্দর!

সবমিলিয়ে অভিজ্ঞতাটা একদম খারাপ ছিলোনা।

বৃষ্টি এখন আপাতত বন্ধ। তবে আকাশ কালো, ঠিক আগের মতই।

Advertisements
This entry was posted in দিন লিপি. Bookmark the permalink.

5 Responses to সুশি খুশি

  1. tusin বলেছেন:

    আসলে বৃষ্টি আসলে আমার ত্ত এমন হযে যায় …..কি যেন ভাবি………যেন অতীতে ফিরে যাই….
    ভাল লাগল আপনার লেখাটা।
    আপনার ব্লগটি ঘুরে দেখলাম। ভাল লাগল…..

  2. tusin বলেছেন:

    ব্লগে আমরা কিছু মানুষ এই আজাইরা বকবকানি লিখি এখণ পড়তে ভালবাসি এই আজাইরা বকবকানি। কথায় আছে না রতনে রতনে চিনে……..

  3. নিবিড় বলেছেন:

    ছোটকালে একটা সিরিয়াল দেখাইতো (জাপানী বা চাইনীজ), সেইটা দেখে কাঠি দিয়ে খাওয়ার বহুত খায়েশ হইছিল পরে আম্মাজানের কাছে খাওয়ার টেবিলে সে খায়েশ পেশ করতেই যে ধমক খাইছিলাম তার পর থেকে কাঠি এবং লাঠি দুইটা দেখলেই ভয় পাই 😦

  4. কাইয়ূম বলেছেন:

    স্যাম দাদু মজার হইসে 😀

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s