অগাস্ট ১২, ২০১০

ক্ষিলখেত নামটা শুনতেই কেমন ক্ষ্যাত ক্ষ্যাত লাগে। সেই তুলনায় নিকুঞ্জ নামটা বেশ সুন্দর। মনে হয় কত গোছানো আর পরিপাটি। কিন্তু প্রথম যেদিন নিকুঞ্জ দেখার সৌভাগ্য হলো সব গোছানো আর পরিপাটি ভাবনা চিন্তা দুই নাম্বার রোড থেকে দশ নাম্বারে আসতে আসতেই গায়েব হয়ে গেল। দশ নাম্বারে তখন জনি’রা থাকতো, এখনো থাকে। আমার এলাকার ফ্রেন্ড। ওর সাথেই দেখা করতে প্রথম আসা এই এলাকাটাতে। মোড়ের চায়ের দোকানে বসে চা খেতে রাস্তার এখানে ওখানে জমে থাকা ময়লা পানি দেখে ঘেন্নায় কেমন গা গুলিয়ে আসছিল। ভাবছিলাম – এইখানে মানুষ ক্যামনে থাকে। কোন কিছুর নাম শুনেই তার সম্পর্কে ধারণা করতে যাওয়া যে মহা বোকামি সেটা আরেকবার বুঝেছিলাম সেদিন। প্রমথ চৌধুরী ঠিকই বলে গেছেন – ব্যাধিই সংক্রামক, স্বাস্থ্য নয়। খিলক্ষেত এর পাশে যার অবস্থান ক্ষ্যাত হওয়াই তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি।

তখনো জানা ছিলোনা বর্ষার সময় ভেনিস হয়ে ওঠা এই এলাকাতেই একসময় এসে ঘাটি গাঁড়তে হবে। না হলে প্রথমবার ভাবতে গিয়ে আরেকটু সহনশীল কিছুই ভাবতাম। অবশেষে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের বলি হয়ে গাট্টি বোঁচকা বেঁধে, আর নাক মুখ কুচকে জানুয়ারীর কোন এক লোডশেডিংময় রাত্রে উঠে গেলাম ১৪নাম্বার রোডের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা বিল্ডিং এর তিনতলায়। মুহাম্মদ, জামান, তাওসীফ, ইমন – ওরা আগেই উঠে গিয়েছিল। আমি ওদের সাথে যোগ দিলাম সর্বশেষ বাসিন্দা হিসেবে। আইইউটি লাইফ শেষে আমরা পাঁচজন আবার একত্রিত হলাম।

মানুষ অভ্যস্থ হয়ে যায় কোন পরিবেশেই। শুধু একটু সময় দিতে হয়। আস্তে আস্তে তাই রাস্তার ময়লা পানি কিংবা মোড়ের দোকানের ভীড় বাট্টার দৃশ্যপটও একসময় কেমন নির্বিকার আর সহনীয় হয়ে আসে। আমরা পাঁচজন তার মাঝে কখন যে মিশে যাই তা’ ঠিকমত বুঝে ওঠাও হয়না।

নিকুঞ্জতে কয়েকমাস পেরোতে না পেরোতেই আবার সেই আসর ভাঙার গান। সবার প্রথমে তাওসীফ, ইরাসমাস স্কলারশীপ নিশ্চিত হবার পর রংপুর থেকে একদিন ফোন দিয়ে খুশির খবরটা জানায়। এর কিছুদিন পর মুহাম্মদ বাসা থেকে ফোন দিয়ে জানায় ওর স্কলারশীপটাও হয়ে গেছে। আমরা আবারও খুশি হই। আর ভাবি- আর কিছুদিন পর তাওসীফ এর পাশাপাশি মুহাম্মদকেও আমরা হারাতে যাচ্ছি। দেখতে দেখতে ইমনেরও চাকরি হয়ে গাজীপুর চলে যায় ও। বাকি রইলাম কেবল আমি আর জামান।

আমি, মুহাম্মদ, আর জামান রাস্তার পাশের রুমটাতে থাকতাম। দক্ষিণমুখী বলে প্রায় বেশিরভাগসময়েই কেমন একটা ঠান্ডা ঠান্ডা বাতাস আসতো। ঢাকা শহরেও বাতাস বয় এই কথাটা আগে কেন যেন বিশ্বাস হতে চাইতো না। ভুল ভেঙেছিল এখানে এসে। আর লোডশেডিং এর সময় বারান্দাতে এসে বসতাম আমরা। কখনো বালিশ নিয়ে এসে সটান হয়ে বারান্দাতেই শুয়ে পড়া। আমাদের বারান্দাটাতে বসে কেন যেন এই ব্যাচেলর পাড়ার রুক্ষতাটা ঠিক গায়ে লাগতোনা। কারেন্ট চলে গেলে বারান্দায় বসে আমরা পাঁচজন মিলে আড্ডা পিটাতাম লোডশেডিং এর পুরো সময়টুকু। ঢাকা আমার কাছে কেন যেন কখনোই ভালো লাগেনি।এত জ্যাম, এত গরম , আর এত সমস্যার এই শহরে ভালো লাগার কোন কিছুই কখনো খুঁজেও পাইনি। কিন্তু বিকেল বেলায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে ব্যাচেলর বিল্ডিং এর গায়ে লেপ্টে থাকা ডিমের কুসুমের মত হলদেটে আলো দেখতে দেখতে কিংবা সন্ধ্যা বেলার চুপচাপ অন্ধকারে বসে হেডফোনে গান শুনতে শুনতে সেই যান্ত্রিক শহরটাকেও কেন যেন মানবীয় মনে হতো। বারান্দায় বসে থাকার সময়টুকুতে তাই ঢাকা শহরের সব দোষ ভুলে গিয়ে আরো একবারের মত তাকে মাফ করে দিতাম।

নিকুঞ্জে, কোন এক বিকেল বেলায় বারান্দা থেকে তোলা


এই মাসের শেষের দিকেই মুহাম্মদ , তাওসীফ এর ফ্লাইট। ইমনও থাকছে গাজীপুরে, চাকরিসূত্রে। এক জায়গা থেকে শেকড় তুলে ফেলে আবার আরেক জায়গায় এসে ছড়িয়ে দেয়ার সময় চলে আসলো দেখতে দেখতে। এই মাসের শুরুর দিনে আমি আর জামান তাই নিকুঞ্জের পাট চুকিয়ে চলে আসলাম নতুন বাসায়, পল্লবীতে।

নতুন সংসার১নতুন সংসার২

গত কালকের বৃষ্টি

আরেকটু স্পেসিফিক্যালি বললে – ব্লগ প্রিন্সিপাল স্যারের ঠিক মাথার উপর। লাবলু ভাই তিনতলায় থাকেন, আর আমরা চারতলায়। নিকুঞ্জের বাসার তুলনায় এই বাসাটা বড্ড বেশি চুপচাপ আর পরিপাটি। এখানে ভীড় বাট্টা নেই, কলোনী সুলভ চিৎকার চেচামেচি নেই। বরং এখানে এসে নিজের জন্য সময় হঠাৎ করে যেন বেড়ে গেছে। কম্পিউটারে কাজ করতে করতে যখন ভালো লাগেনা তখন পিসি অফ করে বই পড়ার অভ্যাসটা আবার আস্তে আস্তে হয়ে যাচ্ছে নতুন বাসায় এসে। জানলার পাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে বিকেলগুলো তাই বই হাতে নিয়েই কাটছে ইদানিং। সবমিলিয়ে ভালোই আছি।
শুধু লোডশেডিং হলে কেন যেন নিকুঞ্জের কথা মনে পড়ে। আর মনে পড়ে বারান্দায় বসে আমাদের চারজনের অর্থহীন আড্ডায় ঘন্টার পর ঘন্টা সময় নষ্ট করার কথা। একজন মানুষের জীবনে বন্ধু থাকা, আর তাদের সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা অনর্থক প্যাচাল পেড়ে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় নষ্ট করার মত অসাধারণ ব্যাপার বোধহয় খুব কমই থাকে।

————————————
আজকে বিকেল বেলা কি মনে করে এফএম রেডিও শোনার খায়েশ জাগলো বহুদিন পর। পর পর কয়েকটা নিজের পছন্দের গানশুনে মনটা ভালো হয়েই গেছিল প্রায়। কিন্তু তারপরেই টানা কয়েকটা হিন্দী গান শুনে মন মেজাজ আবার যেই কে সেই। বাংলা এফএম এ এমন ধুমাধুম হিন্দী গান চালানোর মানে টা কি?
—————————

৯০ সালের দিকে যখন আমাদের ফ্রিজ ছিলোনা, তখন রোজার দিনে ইফতারির আগে আম্মার কাছ থেকে টাকা নিয়ে বেশ দূরের বরফ কল পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে বরফ কিনে আনতাম। আনার পর খালি ঘড়ির দিকে তাকাতাম আর ভাবতাম কখন আযান দিবে আর কখন বরফ দেয়া ঠান্ডা শরবত খাবো। আজকে প্রথম রোজার দিনে বরফ কিনে আনার সেই ছেলেমানুষী উত্তেজনার কথা কেন যেন খুব মনে পড়ছে। ছেলেবেলাটুকুও কেমন বরফের মত গলে গেল। আহা! : (

———————————————-

সঞ্জীব চৌধুরী যে বস একটা পাব্লিক সেটা বুঝতে আমার বহুদিন লাগসে। শুরুতে ভাবতাম এই মানুষটারে মানুষ চেনে বাপ্পা মজুমদারের জন্য। অবশ্য সেই ধারণা বহু আগেই পাল্টে গেছে। এখন মনে হয় বাপ্পার ভাগ্য যে এই লোকটার সাথে একসাথে কাজ করতে পারসে। লোকটা নাই, কিন্তু রেখে যাওয়া গানগুলা মানুষটাকে ভুলে যেতে দেয়না।
সবার জন্য সঞ্জীবদা’র একটা গান রেখে গেলাম যাবার আগে।

Bhalo LageNa.mp3
Advertisements
This entry was posted in দিন লিপি. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s