ফ্ল্যাশ কার্ড!

থিওরিটিক্যালি আমার হাতে এখন অনেক সময়। অবশ্য কোন সময়ই আমার সময়ের কমতি পড়েনা! শুধু যখন পরীক্ষার ঠিক আগের রাতে স্বপ্নীলের কাছ থেকে সিলেবাস বুঝে পড়তে বসি তখন শুধু মনে হয়, ইশ আরেকটু সময় নিয়ে শুরু করলেই পারতাম!
হ্যা। আমার হাতে অনেক সময়। মানে ঠিক পাঁচ পাঁচটা দিন। এই কয়দিন চাইলে আমি নাকে তেল না দিয়েও দীর্ঘ ঘুম দিতে পারি। কারো কিছু বলার নেই। আর আমার রুমে আমি একা। বাসায় যাব হয়তো পরশু কিংবা কাল।
এবারের পরীক্ষাতেও আমি তেমন ব্যতিক্রমী কিছু করিনি। এবারই প্রথমবারের মত কোন মিড পরীক্ষার আগে পাক্কা আড়াইদিন ছুটি ছিল। পরীক্ষাটা ছিল মেশিন ডিজাইন। আর আমি বরাবরের মতই সিলেবাস শুরু করলাম পরীক্ষার ঠিক আগের রাতে, দশটা থেকে।
মেশিন ডিজাইন পরীক্ষা শুরু হবার সাথেই সাথেই যা কাহিনীটা হইলো! কথা ছিল এটা হবে ওপেন বুক + ওপেন নোট এক্সাম। মানে আমি চাইলে সাথে করে ক্লাস নোটও নিয়ে যাতে পারবো। আমি ক্লাসে যাইনা। তাই আরেকজনের ক্লাস নোটের ফটোকপি সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমার মত ছিল আরো অনেকেই। ব্যাপারটা জানা যে ধরবেনা। কিন্তু তারপরও অডিটোরিয়ামে ঢোকার সময় কেমন একটা অনুভূতি হচ্ছিল। যদি কেউ ধরে বলে তুমি পুরা ক্লাস হিস্টোরি তোমার সাথে নিয়ে আসছো ক্যানো?! আমার জবাব দেয়ার মত জবাব ছিল। কিন্তু ভয় ব্যাপারটা আসলে এত জবাব টবাব এর ধার ধারেনা!
অডিটোরিয়ামে বেশ ভালোভাবেই ঢোকা গেল। কেউ কিছু বললোনা। তারপর প্রশ্ন দিল। আমি শুরু থেকে চোখ বোলাতে বোলাতে শেষের প্রশ্নে এসে থামলাম। একটা অংকে পুরো ২৫ মার্কস। এবং আমি হতভম্ব হয়ে খেয়াল করলাম এইটা ছাড়া বাকি সব অংকই আমার ডুপ্লিকেট ক্লাস নোটে আছে। কি ভয়ানক কথা! দেখে দেখে পরীক্ষা। তাও যদি এনসার না করতে পারি তাইলে ব্যাপারটা কেমন কেমন হয়ে গেলনা? আমি পেছনে তানভীর ভাইকে জিগাইলাম। তার কাছে আছে। আমার নিজেকে একটা বেকুব মনে হতে লাগলো শুধু। হঠাৎ সামনে তাকিয়ে দেখি হেড স্যার নেমে এসে সব নোট তুলে নিচ্ছে। মাঝে কে জানি কি বলতে চাচ্ছিল স্যারকে। এক ধমকে তাকে ঠান্ডা করা হলো। আমি আশেপাশে আমাদের পোলাপানের মুখগুলার দিকে তাকালাম। ভালো ছাত্রদের চেহারা গুলো কেমন খারাপ হয়ে গেছে। খিক খিক। সানী দেখি দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাবার আগের মুহূর্তে মুখের যেমন একটা এক্সপ্রেশন হওয়া উচিত মুখটা তেমন করে বসে আছে। আবার চেয়ারের উপরেই এলায়া পড়সে হাতপা ছেড়ে। অবশ্য কাউকেই দোষ দেয়া যায়না। কারণ ওপেন বুক এক্সামে কেউ পড়েনা। শুধু ব্যাপারগুলা বুঝে আসে। আর পরীক্ষার খাতা পাওয়া মাত্রই স্যারকে বুঝানোর জন্য সেগুলা লেখা শুরু করে । অবশ্যই দেখে দেখে। কিন্তু এবার ওপেন নোট বলে সব জিনিসগুলো ছিল নোটের ভেতর । মাঝির হাত থেকে হালটা কেড়ে নিয়ে যদি বলা হয়, মাঝি, এবার নৌকা চালাও! ব্যাপারটা ঠিক সেরকম একটা কিছু। কিন্তু এত কিছু দেখে আমার তাও কেন জানি হাসি আসছিল। আর আমি হাসছিলামও! 😀 বরং মনে হচ্ছিল ভালই হলো- নোট থাকলেও তিরিশ নাম্বারের অংকটাতো আমি করতে পারতাম না! সবাই পরীক্ষা শেষ করে বাইরে বেরিয়ে অনেক সময় ব্যায় করে হেডুকে গালাগালি করলো। আমি কিছুক্ষণ শুনলাম। তারপর টায়ার্ড হয়ে গেলে আমরা কয়েকজন মিলে বের হলাম প্রিন্স এ গিয়ে কিছু খেয়ে আসার জন্য। কারণ আমি ঠিকমত লাঞ্চ করে পরীক্ষা দিতে যাইনি। গিয়ে একটা মোটা সোটা নাদুস নাদুস মোগলাই খেলাম। আর আমার ছোট্ট পেটটা তাতেই ফুলে ফেপে উঠলো! খাওয়া শেষ করে মনে হলো আমি মানিব্যাগ নিয়ে আসিনি!

তারপর বাকি পরীক্ষাগুলোও নিয়ম মেনে শেষ হয়ে গেল। আর আমার পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলো নির্ধারিত সময়েরও পাঁচ মিনিট আগে। কারণ শেষ পরীক্ষার দিন আমি আমার সামনে কোণাকুণি বসা ইশতিয়াককে মাথা নিচু করে জিজ্ঞেস করছিলাম ওর চার নাম্বার প্রশ্নে রেইনল্ডস নাম্বার কত আসছে। ইশতিয়াক ঠিকমত শুনতে পেলনা। কিন্তু সামনে থেকে ইলেক্ট্রিক্যাল এর এক খাইস্টা স্যার কেমনে জানি শুনে ফেললো। আই মিন দেখে ফেললো। তারপর বিড়ালের মত চুপি চুপি এসে আমার খাতাটা গুছিয়ে নিয়ে বললো ওকে জিজ্ঞেস করছিলে ক্যানো? কি অদ্ভূত প্রশ্ন! কেন জিজ্ঞেস করসি এইটা জিজ্ঞেস করার আছেটা কি। খাতা নিতে চাইলে নিয়ে গেলেই হয়। কিন্তু উত্তর জানা প্রশ্ন করার কোন মানে তো নাই! আমি তাও খুশি মনে হল থেকে বেরিয়ে আসলাম। যদিও বুঝতে পারছিলাম আমার চার নাম্বার প্রশ্নের অংকের ক্যালকুলেশনের জংগলে বড় বড় বাঘ ছেড়ে দিয়ে এসেছি!

আর তারপর রুমে এসে একটা লম্বা রকম ঘুম দেবার কথা ছিল। কারণ ঐদিন সকালে আমার ঘুম একদম ভালো হয়নি। আর তার মধ্যে উদ্ভট রকমের দুইটা স্বপ্ন দেখসিলাম। কিন্তু বদলে রুমে এসে মুভি দেখা শুরু করলাম। প্রথমটা দেখলাম দ্য রীডার। মন খারাপ করা মুভি। আর মনটা খারাপও হলো। হয়তো খুব বেশি না, একটু । কিন্তু সব বড় কিছুর শুরু তো একটু থেকেই হয়, তাইনা?

তারপর আমি একটা ব্রেক নিলাম। কারণ আমি চোখ নিয়ে ভালো যন্ত্রণায় পড়সি। আমার উচিত দৌড়ে গিয়ে কোন একটা ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে ঢুকে পড়া। কিন্তু আমার সব কিছু করতেই এখন আলসেমি লাগে। দৌড়াতেও…

তারপর দেখতে বসলাম সেভেন ইয়ারস ইন টিবেট(TIBET) । নাকি তিব্বত? তবে তিব্বত বলতে ইচ্ছা করছে না। “তিব্বতে সাত বছর” বললে ঠিকাছে। কিন্তু সেভেন ইয়ারস ইন তিব্বত বললে ব্যাপারটা কেমন জানি ক্ষেত টাইপের লাগতেসে শুনতে। 😀 মুভিটার প্রথম দিকে কেমন জানি একটু বোরিং টাইপের লাগছিল। কিনতু আস্তে আস্তে মনোযোগ বাড়ছিল। আর মুভিটা শেষ করে আমার তিব্বতের সেই মানুষগুলার কথা ভেবে খুব খারাপ লাগছিল। যদিও ব্যাপারটা ঘটে গিয়েছিল অনেক আগেই। কতগুলো অহিংস মানুষ, যারা আর কিছু নয় শুধু শান্তিতে নিজেদের মত করে থাকতে চেয়েছিল, তারা শেষমেষ সেটুকুও পারেনি। আমাদের পৃথিবীর নিয়ম কানুন গুলো আসলে কাউকে ভালো থাকতে দেয়না।

আমার সামনে খুব বেশি সময় নেই। একটু ভালোমত চোখটা সোজা করে সামনে তাকালেই দেখতে পাচ্ছি আমার ভাল থাকার সময়টুকুর শেষ মাথা। আর মাত্র কয়েকটা মাস ব্যাস। তারপর পঁচা বাস্তবতা হাউ মাউ খাও বলে ঝাপিয়ে পড়বে আমাকে তার দলে টেনে নেবার জন্য। সময়টা এলো বলেই। আর আমার সামনে নিশ্চিত ভাবেই অনিশ্চিত একটা পৃথিবী অপেক্ষা করছে। কারণ সবাই যখন সিরিয়াস মুডে বিএসসি শেষে কি করবে, কোন দেশের কোন ইউনিতে কোন সাবজেক্ট ভালো এসব নিয়ে গম্ভীর মুখে ক্যাফেটেরিয়াতে খেতে খেতে কথা বলে, আমি তখন নিচু হয়ে ভাবি আজকে খাশির মাংসটা খুব জঘন্য হইসে। আমি তবু বুঝতে পারি আমার চারপাশের মানুষ, আর চারপাশের জীবনের মাপে এখনো সেভাবে বড় হতে পারিনি….

আমি কাল বাসায় যাবো কীনা ভাবছি। পরশুও যাওয়া যেতে পারে। আমার হাতে ছুটি আছে। চাইলে আজই যাওয়া যায়। কিন্তু কেন যেন আমার কোন কিছুই করতে ইচ্ছে করেনা। যেমন ইচ্ছে করছেনা আজমেরীতে চন্দ্রা পৌঁছৈ সেখানে আবার আধাঘন্টা বেকুবের মত ঘামতে ঘামতে দাঁড়িয়ে থেকে তারপর ঘাটাইলের বাস ধরতে। তারচে এখন যেমন বসে আছি, যেভাবে খুট খাট করছি আমার শক্ত হয়ে যাওয়া কীবোর্ডের বাটনগুলোতে সেটা করতেই ভাল লাগছে।

যদিও জানি এই ভালোলাগা বেশিক্ষণের জন্য না। আর এভাবে সবকিছুকে অস্বীকার করে বসে থাকা যায়ও না। ONe day i have to face the reality, sooner or later…

Advertisements
This entry was posted in দিন লিপি. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s