মেঘ পিয়নের চিঠি

তারা তিনজন

সাউথ হলের পাঁচতলার আমাদের ব্লকের সীমানায় একেবারে পূর্ব দিক ঘেঁষে করিডোরের শেষ মাথায় যে জায়গাটুকু সেটা আমাদের সবারই খুব প্রিয় জায়গা। সেখানে হাত দিয়ে হেলান দেয়ার জায়গাটুকুতে পা ছড়িয়ে বসে আয়েশ করে অনেক কিছুই দেখা যায়। ইট কাঠের জঞ্জালের ধোঁয়া ওঠা শহরে এখনো যে কিছু গাছ আছে সেটা বোঝা যায় সবচে ভালোভাবে। ক্যাম্পাসের পূর্বদিকের সীমানা ঘেঁষেই ঢাকা গাজীপুর হাইওয়ে। সে রাস্তায় জীবন থেমে থাকেনা এক মুহূর্তের জন্যও। রাত দিন চব্বিশ ঘন্টা যানবাহনের দৌড়াদৌড়ি। আমাদের সেই প্রিয় জায়গাটাতে বসে কিংবা দাঁড়িয়ে থেকে নিচে বহমান সেই ব্যস্ততার একজন না হয়েও ব্যস্ততাটুকু উপভোগ করা যায় ষোল আনায়। আরো দেখা যায় গার্মেন্টসের মেয়েদের পিপড়ের মত সারি সারি হেঁটে যাওয়া, দুলদুল-বনশ্রীর হৈ হট্টগোল.. আর আর… দৈনন্দিন ক্যাচালের ভারে ক্রমশ নুয়ে আসা ঘাড় টাকে যদি কোনমতে সোজা করে উপরের দিকে তাকানো যায় তাহলে দেখা যায় মস্ত বড় একটা আকাশ…

এবং শেষের ব্যাপারটিই আমাকে আকর্ষণ করে সবচে বেশি।

তাই ভালো লাগা মন্দ লাগা মুহুর্ত, যখনই হোক, একটু সময় পেলেই সেখানে গিয়ে পা ছড়িয়ে বসে পড়ি। দিনের বেলার ব্যস্ততা দেখি, রাতের বেলার নির্জনতা দেখি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে জায়গাটুকু সবসময় খালি পাওয়া যায়না। কারণ সৌন্দর্যের কদর সবাই বোঝে। আর আমাদের মধ্যে যারা প্রেমিক পুরুষ তারা বোঝে সবচে বেশি। সবসময়ই সেখানে তাদের কাউকে না কাউকে কানে মোবাইল গোঁজা অবস্থায় দেখা যায় জায়গাটাতে।

এই যেমন ওপরের ছবিটার কথা ধরা যাক। আমি এই জায়গাটার কথাই বলছিলাম এতক্ষণ। একেবারে বামে দাঁড়ানো হাসান। ওর ভাষায় ও এখনো “একা”। সপ্তাহের পাঁচটা দিন আসলে ও তাই থাকে। কিন্তু উইকেন্ড এলেই ব্র্যান্ডের শার্ট, জিনস আর পারফিউম লাগিয়ে কোথায় যেন ঘুরতে বেরোয় এই একা মানুষটা। জিজ্ঞেস করলেও সদুত্তর পাওয়া যাবেনা। তাই আমরা কখনো জিজ্ঞেসও করিনা ওকে। মাঝের ছেলেটা তপু। এখনো ওর সেই অর্থে নিজের কেউ নেই। আর সেজন্য সুবিধা সবচে বেশি। সে যখন খুশি তখন মেসেজ পাঠায় বান্ধবীদের যে কাউকে। আর একেবারে ডানে দাঁড়ানো ছেলেটা হলো গৌরব। আমাদের ব্যাচের গানের মানুষ। ওর গানের গলা দুর্দান্ত বললেও কম বলা হয়। এখন প্রেম করছে বগুড়া মেডিক্যাল এর আরেক গানের পাখির সাথে। আর ছবিতে না থেকেও এই চমৎকার ছবিটার পেছনে যার অবদান সবচে বেশি সে হচ্ছে সাফওয়ান। এই ছবিটা ওর তোলা। সিলেটের ফুয়া। তবে প্রেম করছে ঢাকাইয়া ফুরির সাথে। আর সবমিলিয়ে এদের মত হাবিজাবি প্রেমিক প্রবরদের জ্বালায় আমার প্রিয় জায়গাটা বেদখল থাকে বেশির ভাগ সময়।তবে এদেরকে হটিয়েও জায়গাটা সবচে বেশি যার দখলে থাকে ও হচ্ছে মারুফ। মারুফকে চেনা খুব সোজা। সাউথ হলে ঢুকে পাঁচতলায় উঠে যে ছেলেটার এক হাতে গোল্ডলীফ আর আরেক হাতে মোবাইল ফোন কানে ধরা থাকবে – বুঝবেন সেই ছেলেটাই হচ্ছে মারুফ। ছেলেটা এত বেশি সিগারেট খায়। মাঝে মাঝে মনে হয় সিগারেটকে ও বোধহয় ওর প্রেমিকার চেয়েও বেশি ভালোবাসে। আমার ধারণা আই ইউ টি লাইফের অর্ধেক সময় কেটেছে ওর ঐ জায়গাটাতে; যে জায়গা নিয়ে এতক্ষণ হলো বকবক করে যাচ্ছি। রাত নেই, দিন নেই, সময় নেই, অসময় নেই মারুফকে দেখা যাবে সেখানে হেলান দিয়ে বসে আছে। কানের কাছে এক প্রেমিকার ফিঁসফিঁসানি আর আরেক হাতের দু আংগুলের ফাঁকে একটু একটু করে পুড়তে থাকা আরেক প্রেমিকা গোল্ডলীফ – আমাদের ০৫ ব্যাচের পোলাপানের জন্য খুব বেশি পরিচিত দৃশ্য। সেই ফার্স্ট ইয়ার থেকেই দেখে আসছি, এখন অব্দি ও নিষ্ঠার সাথে ঝগড়া করেই যাচ্ছে সবচে কাছের মানুষটার সাথে। ওদের মধ্যকার এত ঝগড়া দেখে প্রথম প্রথম খুব আশ্চর্য হতাম। কিন্তু আস্তে আস্তে বুঝলাম এতদিন ধরে ঝগড়া করতেও অনেক ভালোবাসা লাগে। এবং মারুফের সেটা যথেষ্ট পরিমাণেই আছে।

এই জায়গার প্রেমে পড়া মানুষের লিস্টিতে সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে ৫২৯ এর ইশতিয়াক। যাকে নিয়ে আমাদের ধারণা ছিল যে ছেলেটা জীবনে কোনদিন প্রেমে পড়বেনা। আমাদের ধারণাকে কাঁচকলা দেখিয়ে সে এখন বিপুল উদ্যমে জায়গাটার সদ্ব্যবহার করছে, বলাই বাহুল্য।

আর এইসব ভ্যালেন্টাইনদের জ্বালায় আমি, মো: স্বপ্নাহত, রুম নাম্বার-৫২৮; আছি ভারী যন্ত্রনায়। কারণ আমার প্রিয় জায়গাটুকুকে ইদানীং খুব কম সময়ের জন্যই ফাঁকা পাই…

………………

ভ্যালেন্টাইন ডের দিন ন্যাট জিও চ্যানেলে খুব মজার একটা ডকুমেন্টারি দেখলাম। ডকুমেন্টারির বিষয় বস্তু ভিয়েতনামের পাহাড়ি একটা গ্রাম, যেখানে বছরের নির্দিষ্ট একটা দিনে “ভালোবাসার বাজার” বসে। যতদূর মনে পড়ে গ্রামের নামটা “কাওয়া ভাই”। যার বাংলা অর্থ করলে ভারী সুন্দর একটা মানে দাঁড়ায়- “মেঘেদের গ্রাম”। রাজধানী থেকে প্রায় এক হাজার কিমি দূরত্বের পাথুরে গ্রামটাতে সত্যিকার অর্থেই মেঘেদের রাজত্ব। সকাল, দুপুর, বিকেল- তিন বেলাতেই সেখানে মেঘেদের আনাগোনা একেবারে হাত ধরা দূরত্বে। ছবির মত পাহাড়ের গায়ে ঝুলে থাকা গ্রামটার নিয়ম কানুন কিন্তু মোটেও সুন্দর নয়, বরং পাথরের মতই রুক্ষ। কারণ সেখানে বেশিরভাগ নারীপুরুষদেরই জীবনসঙ্গী/সঙ্গিনী বাছাই করার ব্যাপারে নেই নিজস্ব কোন স্বাধীনতা। এসব ব্যাপারে গ্রাম্য সভার নির্দেশই শেষ কথা। তবে আছে অদ্ভূত এবং মজার এক নিয়ম। বছরের একটা নির্দিষ্ট দিনে গ্রামের নির্দিষ্ট একটা জায়গায় বসে ভালোবাসার বাজার। গ্রামের বিবাহিত, অবিবাহিত সব নারীপুরুষ সেদিন সেখানে জমায়েত হয় সকাল থেকেই। কারণ এই একটা দিনে বিবাহিত, অবিবাহিত সবার রয়েছে নিজের মত করে একদিনের জন্য সঙ্গী/সঙ্গীনি বাছাইয়ের স্বাধীনতা। সবাই যার যার পছন্দ মত একজনকে বাছাই করে দুজনে মিলে পাহাড়ের কোথাও হারিয়ে যায়। পুরো একটা দিন আর পুরো একটা রাত নিজেদের মত করে কাটাবে বলে। এই একদিনের জন্য কোন বাঁধা নেই। বিবাহিত রা নির্দ্বিধায় অন্য কাউকে বাছাই করতে পারবে, আর অবিবাহিতরা খোঁজে তাদের হয়তোবা হতে যাওয়া ভবিষ্যত সাথীকে। ভালোবাসার সেই দিনটা শেষ হয়ে যাবার পর সবাই আবার যার যার আটপৌরে জীবনে ফেরত যায়। যে জীবনে ঠিক আগের মত করেই কাটে বাকি ৩৬৪ টা দিন।
ডকুমেন্টারিটাতে বেশ কয়েকজন নারী পুরুষের সাক্ষাতকারের পাশাপাশি দেখালো সেই গ্রামেরই এক মাঝবয়েসী মহিলাকে, যে কীনা সেইগ্রামেরই একসময়কার ডাকসাইটে সুন্দরী। খুব অল্প বয়েসে সে প্রেমে পড়েছিল পাশের গ্রামের এক বাঁশিওয়ালা যুবকের। সেই ছেলেটার বাঁশির সুরে তন্ময় হয়ে সেদিনের ষোড়শী কিংবা অষ্টাদশী মেয়েটা স্বপ্ন দেখতো তার সাথে নিজের মত করে ঘর বাঁধতে। কিন্তু শেষমেষ তা’ আর হয়ে ওঠেনি গ্রামের নিয়মকানুনের বেড়াজালে পড়ে। অথচ ভালোবাসতো সেই ছেলেটাও। জোর করে চলে আসা অন্য সংসারে মানিয়ে চলা সেই মেয়েটা কিন্তু তারপরও ছেলেটাকে ভুলে যায়নি। কিংবা ছেলেটা ভোলেনি মেয়েটাকে। তাই বিয়ের অনেক বছর চলে যাবার পরও আজও দু’জনে অপেক্ষায় থাকে সেই ভালোবাসার দিনটার জন্য। একটা দিনের জন্য হলেও সেদিন সত্যিকারের সেই ভালোবাসার মিলন ঘটে। দুজন মানুষ তার প্রথম জীবনের ভালোবাসাকে এই পুরোনো বেলায় আবার নতুন করে ফিরে পায়। তারপর আবার ৩৬৪ দিনের অপেক্ষা, সেই ভালোবাসার একটা দিন ফিরে পাবার জন্য…এই ঘটনা দেখতে দেখতে কেমন কেমন যেন লাগে। বুকের ভেতর বিষ্ময়, আনন্দ আর খানিকটা বিষাদমাখা অনুভূতি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে…

বড় অদ্ভূতই বটে। ৫২৬ এর মারুফ, ২৯ এর ইশতিয়াক কিংবা তাদের থেকে হাজার মাইল দূরের মেঘের দেশের সেই মাঝবয়েসী রমণীটা, ভালোবাসা যার ওখানে বাস্তবতার দামে বিকোয়, ভালোবাসা রেহাই দেয়না তাদের কাউকেই। তবে সেটা অদ্ভূত নয়তো কী?

…………

টানা তিনদিনের ছুটি পেয়ে অনেকদিন পর বাড়ি গেলাম। ফিরলাম আজকেই। পরশুর কথা। ভ্যালেন্টাইন ডে র প্রথম প্রহর তখন আসি আসি করছে। আমি বিছানা গুছিয়ে ঘুমোবার প্রস্তুতি নিচ্ছি। ডাবল সাইজের বিছানা, স্প্যানিশ লীগের ফুটবল মাঠের মত বিশাল তার বুক। আর আমি হলাম একমাত্র খেলোয়াড়। সঙ্গী কেবল সেই ছোটবেলা থেকে আমার বিছানা দখল করে থাকা কোল বালিশটা। ঘুমানো ছাড়া আর কিইবা করার আছে? লেপটা আরেকটু ভালোমত জড়িয়ে একদিকে ফিরতে না ফিরতেই মাথার বালিশ কাঁপতে থাকে। মোবাইলের ভাইব্রেশনের ধরণ দেখে বুঝি ওটা একটা নতুন এসএমএস এর পূর্বাভাস। ইনবক্সে ঢুকতে ঢুকতে ভাবি কেইবা আর হবে। বারোটা বাজার সাথে সাথেই বিছানা গোছাতে শুরু করা আমারই মত কোন নিরস জীবন যাপনকারী পাবলিক। মেসেজ পড়তে শুরু করার পর বাম চোখের ভ্রুটা একটু কুঁচকে গেল। স্ক্রুল করে নিচের দিকে আরো নামতে নামতে ডান চোখেরটাও। এবং পড়া শেষ করে দুই কুঁচকানো ভ্রু নিয়ে কিছুক্ষণ ঝিম মেরে পড়ে থাকি। মাথার ভেতর তখনো লাস্ট লাইনটা কেবল ঘুরপাক খায় ধোঁয়াশার মত – Will u b my Valentine forever? চিন্তিত পরিচিত বন্ধু। কিন্তু আহবানটা অপরিচিত। কয়েকদিন ধরেই একটু একটু বুঝতে পারছিলাম। তবে হুট করে এতদূর আশা করিনি।
আমি আরো কিছুক্ষণ ঝিম মেরে শুয়ে থেকে ভাবি। মেসেজের রিপ্লাইটা আমার জানা। শুধু ভাবছি কিভাবে লিখবো। একসময় গা ঝাড়া দিয়ে রিপ্লাই লেখা শুরু করি। লেখা শেষও হয়। সেন্ড করি। সেটা ডেলিভারিও হয়।

এই রাতের বেলায় মাথার ভেতর হুট করে আবার শ্রীকান্ত ফিরে আসে গানটা নিয়ে। যে গানটা গত কয়েকদিন ধরে রাত দিন আমার মাথা চিবিয়ে খাচ্ছে। হাল ছেলে দিয়ে শেষমেষ শ্রীকান্তের সাথে সাথে গুনগুনাই। আবার ওদের কথা ভাবি। মারুফের কথা, সেই বিগত যৌবনা মেঘবালিকার কথা, রিপ্লাই পাবার পর ফোনের ওপাশে হয়তোবা বেদনায় নীল হয়ে যাওয়া আমার বন্ধুটার কথা…আর কিছুটাক্ষণ আমার নিজের কথা… ভালোবাসা যাদের কাউকেই রেহাই দেয়নি…
কেবল শ্রীকান্ত তখনো নির্বিকার গলায় গেয়ে যায় নিজের মত করে – মেঘ পিয়নের ব্যাগের ভেতর মন খারাপের দিস্তা, মন খারাপ হলে কুয়াশা হয়.. ব্যাকুল হলে তিস্তা…

ভালোবাসা, তুমি অদ্ভূত নওতো কী?

Megh Pion-r bag-r …
Advertisements
This entry was posted in দিন লিপি and tagged . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s