কলিকালের দিনলিপি

আমার এই মুহুর্তে এই ব্লগটা লেখার কথা ছিলোনা। লিখতে চেয়েছিলাম খুব প্রিয় একজন বন্ধুকে নিয়ে। যে আমার উষ্ণ অনুভূতিগুলোর খুব কাছাকাছি থাকে সবসময়। কিন্তু কখনো মুখ ফুটে বলা হয়নি আমি তাকে কতটা ভালবাসি। কিন্তু তা’ আর হলো কই। আমার সব ব্যাপার কিংবা ভাবনাগুলোই অনেকটা এরকম। প্রথমে ভাবি এক কিন্তু পরে হয়ে যায় অন্য কিছু। অনেকটা সিসিবির অনেক পোস্টের মত। হয়তো লেখা হয় সিরিয়াস কিছু ভেবে আর শেষ হয় মাস্ফু ভাইয়ের “আমিও কেক খাপো”তে গিয়ে। কাজেই ভাইসব, আগেই বলে নেই। এইটা একটা আজাইরা কিন্তু ভদ্রলোকের দিনলিপি।

সিসিবি আড্ডাতে যোগ দেবার জন্য ঘাটাইল থেকে গিয়েছিলাম সেদিন দুপুরেই। আগের দিন আম্মাকে বলতেই বললো কিসের অনুষ্ঠান। আমি বলি আম্মা এইটা ইন্টারনেটে আমাদের একটা সাইট আছে। সেইখানেই সবার সাথে আলাপ। কালকে সেই সাইটটার জন্মদিন উপলক্ষ্যে একটা গেট টুগেদার হবে। আম্মার মুখ দেখে বোঝা গেল তাকে বেশ ঝামেলায় ফেলে দিসি। আমি না হয় ডিজ্যুস আমলের পোলাপান, আম্মাতো না। সারাদিন কীবোর্ডে টিপাটিপি করে ক্যামনে এতগুলা মানুষের সাথে আলাপ হলো সেটা তার মাথায় ধরেনা ঠিকঠাক। অবশ্য বেশি কিছু বলেনও না আর। কিন্তু তারপর আবার হাঙ্গামা বাঁধান ঢাকায় গিয়ে থাকবো কৈ, খাবো কৈ এইসব কথা বলে। আম্মারে যতই বোঝাই সেসব নিয়ে সমস্যা হবেনা কিন্তু মায়ের মন বলে কথা। সব নিশ্চয়তার মধ্যেও ছেলের জন্য অবশ্যম্ভাবী কোন অনিশ্চয়তা ঠিকই খুঁতখুঁতে মন নিয়ে বের করে ফেলে। কাউকেই চিনিনা কিন্তু সবাই পরিচিত- সেটা শুনে আরও বেশি চিন্তায় পড়ে যান। না চিনেও সবাইরে চিনা সেইটা আবার ক্যামনে কি। আমি মনে মনে ভাবি তুমি যদি ক্যাডেট হইতা আর রাত দিন খাইয়া না খাইয়া সিসিবিতে ব্লগাইতা তাইলে তুমিও বুঝতা…

ভাবলাম পরের দিন সকালে উঠতে হবে খুব সকাল সকাল। ঢাকাতেও যেতে হবে খুব তাড়াতাড়ি। কামরুল ভাই ইনডাইরেক্টলি বলে দিসে তার বাসায় বুয়া নাই। সরাসরিতো আর বলতে পারেন না তুই আইসা বুয়ার কাম কর। ঘরগুলা গোছগাছ কর। আমারেই সেটা বুঝে নিতে হয়। কাজেই এলার্ম দিয়ে রাখি সাতটার সময়। বোধহয় সেটা ঠিক সময়ে বেজেও উঠেছিল। এলার্ম অফ করে আবার দ্বিতীয় দফা ঘুম থেকে উঠে দেখি দশটা বাজে। বুঝলাম দেরি করে ফেলসি। লেট করার আগেই তাড়াহুড়া করে ছোট কাজ, বড় কাজ সবকিছু সেরে ঢাকার দিকে দৌড়। ড্রাইভার সাব ভালো লোক। পথে বেশি দেরি করেন নাই। মেডেলিয়নের সামনে পৌছে যখন কামরুল ভাইরে ফোন্দিলাম ঘড়িতে তখন আড়াইটা।

বাকিটুকু মোটামুটি রায়হান বলে দিসে পোস্টে। তবে আড্ডা জমসিলো ব্যাপক। আড্ডার শেষে মনেই ছিলোনা কামরুল ভাই ক্যামনে নির্দয়ের মত আমারে দিয়া বেসিন ধুয়াইসে। এত চমৎকার একটা গেট টুগেদার আয়োজনের জন্য মনে মনে তখনই কামরুল ভাইরে মাফ করে দিসিলাম। আমার বদ দোয়ার জন্য একজন মানুষ বেহেশতের দরজায় পর্যন্ত গিয়া উষ্টা খেয়ে পড়ে যাক – হাজার হোক এতটা নির্দয় আমি না।

তো আড্ডা শেষে সবাই তো একসময় চলে গেল। রইলো বাকি আমি আর মুহাম্মদ। রায়হান আমাদের দুজনকে ওর বাসায় নিয়ে যেতে চাইসিল। কিন্তু ওকে সেই সুযোগ না দিয়ে আমরা কামরুল ভাইয়ের বাসাতেই থেকে গিয়ে তাকে ধন্য করার সিদ্ধান্ত নিলাম। সাথে ছিল সাইফ ভাইও। চারজনে মিলে টুকটাক গ্যাজানিতে রাত কখন ভোর হয়ে ঘড়ির কাটায় পাঁচ বানিয়ে দিল টেরই পাইলাম না। এর মধ্যে অবশ্য সাইফ ভাই আর কামরুল ভাইয়ের ফেসবুকতুতো বান্ধবী নিয়ে বেশ কিছু কাহিনী হৈলো। কিন্তু সিসিবি তো ভদ্রলোকের ব্লগ। কাজেই আমরা সেইসব কাহিনীর দিকে আর না যাই। তো পাঁচটার দিকে আমি আর মুহাম্মদ কাঁচুমাচু হয়ে এক সাইডে শুয়ে পড়লাম। কামরুল ভাইকে বল্লাম – ভাই রাত তো শেষ হয় হয়। শুয়ে পড়ে দুই ঠ্যাং একটু এক করে নেন। এখনই সময়। কিন্তু কামরুল ভাইয়ের সব মনোযোগ তখন মেসেণ্জারে। তিনি তখন শীতের রাতে চেয়ারে বসে বসে কী বোর্ডে গ্রীষ্মের কালবৈশাখী ঝড় তুলতেসেন। মুখ না তুলেই বল্লেন- “তোরা ঘুমা। আমার কাম বাকি আছে।” এত রাইতে মেসেন্জারে কিসের কাম বাকি থাকতে পারে আমার মাথায় ঢুকলোনা। বোধহয় বোঝার বয়সও হয়নাই। ভাবতে ভাবতে আমি ঘুমানোর চেষ্টা করলাম।

সাইফ ভাই ডেকে তুললেন মনে হয় ছয়টার দিকে। বলে রাখসিলাম যেন বাইরে খেতে বের হলে ডাক দিয়ে নিয়ে যায়। (সারা জীবন সিনিয়দের ডেকে তুলসি কলেজে। এই চামে সিনিয়রদের দিয়ে ডাকাইয়া নিলাম B-) ) পরে একসাথে বের হয়ে গিয়ে চারজনে মিলে গরম গরম পরাটা আর ডালভাজি দিয়ে একটা ব্রেকফাস্ট সেরে এসে বিছানায় শুয়ে আবার ঘুম। উঠতে উঠতে সেই বারোটা। হয়তো আরেকটু নাক ডাকা ছাড়া ঘুমানো যেত। কিন্তু মুহাম্মদ উঠে ক্যাও ম্যাও ট্যাও ট্যাও শুরু করে দিল। ও মোবাইল কিন্তে যাবে। ভালো কথা। তো ওর সাথে বের হলাম সব কিছু নিয়ে। এর আগে কামরুল ভাইকে ঘুম থেকে তুলে বিদায় নিয়ে নিলাম। সাইফ ভাইয়ের নাক ডাকা দেখে বড় মায়া হলো। তাকে আর তাই তুল্লাম না।

বের হয়ে মেডেলিয়নের সামনে দাঁড়িয়ে চায়ের অর্ডার দিতে না দিতেই রায়হান আবীরের জোব্বা টাইপের জ্যাকেট পড়ে দৃশ্যপটে আবির্ভাব। ঐটার পূরুত্ব দেখেই এই আঠারো ডিগ্রি সেলসিয়াসের শীতেও আমার কেমন যেন ঘাম হওয়া শুরু করলো। জিগাইলাম- দোস্ত এই মাল কোত্থিকা জোগাড় করলি।
“আগের বছর ব্যবহারের পর আই ইউ টিতে রুমে হ্যাংগারে ঝুলাইয়া রাখসিলাম। এরপর আর ধরে দেখিনাই। আজকে বের হবার আগে শীত লাগতেসিল দেখে এইটা পড়ে আসলাম।” – রায়হান আবীর বেশ ভাবের সাথে আমার কথার জবাব দেয়।

আমি আর কথা বাড়ানোর সাহস পাইনা। জ্যাকেট এত পুরু হবার কাহিনিও পুরা কিলিয়ার হয়ে যায়।

আমরা তিনজনে এইবার কারওয়ান বাজারের দিকে পা বাড়াই। ঐখানে আরব বাংলাদেশ ব্যাংক নামে একটা আখাস্তা ব্যাংক আসে। আর সেই ব্যাংকে মুহাম্মদের কাড়ি কাড়ি টাকা জমা আছে। মোবাইল কিনতে টাকা লাগে। কাজেই আমরা টাকা তুলতে মুহাম্মদের সাথে ঐ দিকে যাচ্ছি। টাকা তুলতেও বেশ ক্যাচাল করতে হলো। দুনিয়ার সব বানরমুখো মানুষ মনে হয় এই ব্যাংকে এপয়েন্টমেন্ট পায়। আর মুহাম্মদের মত মাসুম বাচ্চাগুলারে হাতের নাগালে পেয়ে তাদের মানুষ না ভাবার কারণগুলা প্রাকটিস করে।

টাকা পয়সা তোলার মামলা শেষ হবার পর এইবার গন্তব্য বসুন্ধরা সিটি। এই দোকান সেই দোকান ঘুরে পছন্দের মোবাইলটা পাওয়া গেল। কিন্তু দাম শুনে সেটা আর পছন্দ করা ঠিক হবে কীনা সেটা নিয়ে ডাউটে পড়ে গেলাম। সব দোষ হাঁসের বাচ্চার। ও সেটটার যে দাম বলেছিল আসলে তা থেকে আরো আড়াই হাজার টাকা বেশি দাম। তো কি আর করা। এই দোকান সেই দোকান ঘুরি কিন্তু দামের তেমন হেরফের নাই। আমরা পাঁচতলার দিকে পা বাড়াই। উঁচুতে উঠে দাম নিচে নামে কীনা সেই ধান্ধায়। নকিয়ার শোরুম দেখে ঢুকে গেলাম। কিন্তু এখানেও একই অবস্থা। তবে এইখানে বাড়তি হিসেবে সেইরকম একটা সেলস গার্ল আছে। আমরা ঢুকতেই কেমন কেমন করা একটা হাসি দিয়ে এগিয়ে আসে সে। মুহাম্মদ একটু আগেও মিন মিন করতেসিল সেটটা এত দাম দিয়ে কিনবে কিনা। সেলস গার্লের ছবক শুনে কি হলো কে জানে।
– কিনেই ফেলি, কি বলো? মুহাম্মদ আমার দিকে তাকিয়ে একটা তেলতেলে হাসি দিলো।
আমার আর কিইবা বলার থাকতে পারে। সব তো ওর হাসি দেখেই বুঝা যাইতেসে।

ঐদিকে রায়হাইন্যা আমার কানে কানে কি জানি ফিসফিসানি স্টার্ট করলো। “দোস্ত, মাইয়াডা তো…. “আমি জোর করে ওরে ঐখানেই থামায় দেই। “চুপ থাক ব্যাটা। তুই না ভদ্র লোক?”

এইবার আমরা ফুড কোর্টের দিকে পা বাড়াই। তবে খাইতে না। ঐখানে অনেক খালি চেয়ার টেবিল থাকে। সেখানে বসে বসে নতুন মোবাইলটার ক্যামনে কি সেইটা দেখবো। দেখতে দেখতেই আমি ভদ্র লোকের মত এদিক ওদিক চোখ বুলাই। দেশ কত আগায় গেছে। ভাবতে ভালোই লাগে। আমাদেরই কয়েক টেবিল সামনে এক টেবিল জুড়ে নীল,সাদা স্কুল ড্রেস পড়া কতগুলা ছোট আপু বসে আছে। সাথে দুইজন ছেলে মনে হয়। ছেলে গোণার টাইম কৈ। আমি স্নেহের দৃষ্টিতে মাঝে মাঝে আপুগুলার দিকে তাকাইতেসি। এইরকমই হঠাৎ করে একবার তাকাতেই দেখি সবগুলা মেয়ে একসাথে আমার দিকে তাকায় আছে। আমি এক্টু থতোমতো খাই। কিন্তু চোখ সরিয়ে নেইনা। তাহলে ভাববে আমার তাকানোতে স্নেহ না অন্য কিছু ছিল। কিন্তু আমি তো ভদ্রলোক। অন্য কিছু জানি না ভাবতে পারে এইজন্যে আমি তবু তাকিয়েই থাকি।

কিন্তু এক্টু পরে একি! ইয়াল্লা! এক মেয়ে দেখি ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ক্যামেরা মোবাইল বের করে আমার দিকে তাক করে ধরসে। আমি হাসবো কীনা ভাবতেসি। হাজার হোক আমার ছবি তোলা হচ্ছে। পরপরই ক্যামেরার শাটারের আওয়াজ পেলাম। বুঝলাম এই মুহূর্তে আমার চেহারা মোবারকের একখান ছবি তোলা হইলো।

অবস্থা আর বেশি সুবিধার মনে হলোনা। ভদ্রলোক হলে এর বেশি অনাচার সহ্য করা সম্ভব না। রায়হানের ডান হাত খামচে ধরে বল্লাম – দোস্ত, আয় যাইগা।

এস্কেলেটর দিয়ে নামতে নামতে আমি ঘটনাটা ভাবতেই আছি ভাবতেই আছি। কী দিনকাল পড়লো। ভদ্র লোকেদের আর বেইল নাই। এরেই বুঝি কয় ঘোর কলিকাল।

Advertisements
This entry was posted in দিন লিপি and tagged . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s