জনি জনি প্লীজ ডোন্ট ক্রাই

কয়েকদিন ধরে ভারী যন্ত্রণায় আছি। খালি স্বপ্ন দেখি। ঘুমাইতে ঘুমাইতে দেখি। আবার জেগে থাকতে থাকতেও দেখি। ঘুমাইতে ঘুমাইতে যেগুলা দেখি সেগুলা আবার নানা কিসিমের। হরর, কমেডি, ফ্ল্যাশব্যাক,ড্রামা, থ্রিলার – মানে যতরকমের হতে পারে আর কি। তাদের মধ্যে কিছু আছে যেগুলা সবাইকেই বলা যায়। আবার কিছু আছে কাউকেই বলা যাবেনা। 😀 এত সব স্বপ্ন দেখার কারণ বোধহয় মিড সেমিস্টার শেষ হবার পর থেকে শুরু হওয়া নন স্টপ ঘুম। পরীক্ষার সাতটা দিন টানা এত বেশি ধকল গেল তা পুরণ করতে গিয়ে শেষ কয়দিন খুব বেশি বিছানা ছেড়ে ওঠা হয়নি। এখানেই যদি সব শেষ হত তাও ভাল ছিল। কিন্তু পরীক্ষা শেষের পর প্রথম ল্যাবের জন্য রিপোর্ট রেডী করতে গিয়ে বেক্কল হয়ে আবিস্কার করলাম আমার ঐ সাবজেক্টের সব ল্যাব রিপোর্ট পুরা ফাইল সুদ্ধ গায়েব  হয়ে গেছে। গায়েব মানে একেবারে গায়েব। যেরকম ভাবে গায়েব হয়ে গেলে দশ হাজার বার ইন্নালিল্লাহ পড়লেও মুখ ব্যাথা ছাড়া আর কোন লাভ হয়না। পড়লাম মহা বিপদে। আমার ঘুম উর্ধ্ব পাতন প্রক্রিয়ায় পুরোপুরি উবে গেল। এবার শুরু হল জেগে জেগে স্বপ্ন দেখা রাউন্ড। আরেকটু নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে দু:স্বপ্ন দেখার শুরু। দিনের বেলাতেও পারতপক্ষে এই সাবজেক্ট টীচারটার ছায়া মাড়াতে চাইনা। আর সে কীনা আমার রাতের ঘুমের সময়েও ওভারটাইম করা শুরু করলো। মাস্টার মশাই আমার নিদ্রার ভেতরে রুটিন মাফিক দর্শন দিতে লাগলেন। স্বপ্নে খালি দেখি বিশাল একটা মাঠের উপর দিয়ে আমি জান প্রাণ নিয়ে দৌড়াচ্ছি। আর পিছনে পিছনে ঐ স্যারটা। তার হাতে আমার হারানো ফাইল খানা ভীমের গদার মত করে ধরা। আমি দৌড়াচ্ছি তো , দৌড়াচ্ছি। কিন্তু মুশকিল হল আমার পা খানা যেখানে ছিল সেখানেই আটকে আছে। একচুলও এগোচ্ছি না। অনেকটা ঘরের ভিতর দৌড়াদৌড়ি করার যে একখানা মেশিন আছে যেটাতে জায়গায় দাঁড়িয়েই লোকজন ম্যারাথন দিয়ে আসতে পারে ঐ রকম। এদিকে আমার আর স্যারের মধ্যকার ব্যবধান প্রতিদিনকার দু:স্বপ্নে একটু একটু করে কমতে থাকে। ঠিক ধরে ফেলবার আগ মুহুর্তে এক সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে হল ফাইলটা আমার টেবিলেই আছে। এবং সেটা অন্য একটা ল্যাব রিপোর্ট ফাইল এর ভেতরে ছদ্মবেশে সহাবস্থান করছে। যেই ভাবা সেই কাজ। আমি ঘুম থেকে উঠে দাঁত ব্রাশ করার আগেই টেবিলের বইয়ের স্তুপে আবার হুমড়ি খেয়ে পড়ি। কিছুক্ষণ খোঁজাখুজির পরই আমার হারিয়ে যাওয়া রিপোর্টগুলো আরেকটা রিপোর্ট ফাইলের ভেতর থেকে কাঁচুমাচু মুখে বেরিয়ে এল।আমি তখনই ঐ অবস্থায় রিপোর্ট হাতে একপাক নেচে নিলাম। ঘুম থেকে উঠে বাকি দুই রুমমেট আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলো। বোধহয় বোঝার চেষ্টা করলো তারা জেগে উঠেছে না এখনো ঘুমিয়েই আছে।

অনেকদিন পর সে রাতে  আমার খুব ভাল ঘুম হলো। এবং কোন রকম স্বপ্ন কিংবা দু:স্বপ্ন দেখা ছাড়াই। 😀

……….

প্রায় দেড়মাস পর বাসায় গিয়েছিলাম। শবে বরাতের বরাতে এবার টানা তিনদিন বাসায় থাকা হলো। ছুটি শেষে আজই ক্যাম্পাসে ল্যান্ড করলাম। চলে আসার আগে আগে বাসার গেটে দাঁড়িয়ে মা আমার উদ্দেশ্যে বললেন। অনেক কিছুই বললেন। ভালোমত থাকিস। খাওয়া দাওয়া করিস। রাত এগারোটায় ঘুমিয়ে যাবি(!)। বেশি রাত না জেগে ভোরে উঠে পড়ার চেষ্টা করবি(!!)।সবসময় রুমে খাবার জন্য কিছু না কিছু রাখবি। দিনের পড়া দিনেই শেষ করবি(!!!)। …..।…….। কথাগুলো শুনতে শুনতে হঠাৎ আমি খেয়াল করে দেখলাম ঠিক একই কথাগুলোই আমি ক্লাস সিক্সে প্রথম যেদিন ঘর ছেড়ে বেরোই সেদিন থেকে শুনে আসছি। কোন হেরফের নেই। ৯৮ থেকে ২০০৮। দশ বছরের এই সময় ব্যবধানে কত কিছুই বদলে গেছে। খালি মায়ের চোখে সেই সেদিনের  আমিই আটকা পড়ে আছি। আর তাকে নিয়েই মায়ের এত দুশ্চিন্তা। এত কিছু বলা। তারপরও প্রতিদিন ঘড়ির কাটা অন্তত সাড়ে তিনটায় না এনে বিছানায় ওঠার কথা মনে পড়বেনা। সপ্তাহে বড়জোর একদিন ব্রেকফাস্ট করার মত  বিলাসিতা দেখাতে টাইমলি ঘুম থেকে উঠবো। ঘুমের কল্যানে হয়তো সুর্যোদয় বা সুর্যাস্ত কোনটাই ঠিকঠাক দেখা হবেনা। এবং খুব সম্ভবত শোনা কথাগুলোর কোনটাই শেষমেষ আর মানা হবেনা। তবু তখন মুখে হু হ্যা করে সায় দেই।

বলতে বলতেই মার চোখ কেমন ঝাপসা ঝাপসা হয়ে আসে। শুধু আমিই না, আমার মা ও সেই  আগের সময়েই আটকা পড়ে আছে। এতদিন হয়ে গেল তারপরও এতটুকু বদলালো না। এদিকে হোম সিকনেস ব্যাপারটাকে ছুটি দিয়ে দিয়েছি অনেক আগেই। তারপরও আমি সরাসরি মায়ের মুখের দিকে তাকাতে পারিনা। কোনমতে বিদায় নিয়ে নিস্পৃহ মুখে সামনের দিকে এগোই। একবারও পেছন ফিরে তাকাইনা আর।

মায়ের চোখের জল তাকিয়ে তাকিয়ে দেখার মত শক্তি বোধকরি পৃথিবীর  কোন ছেলেরই নেই।

……

কয়েকদিন ধরে আরেকটা ব্যাপার ঘটছে। মাথার মধ্যে দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা খালি একটা গান ঘুরঘুর করে। আজকে ঢাকা টু কেন্দুয়া “বিনিময়” বাসে যখন আসছিলাম তখনও। আবার চন্দ্রা টু বোর্ডবাজার “বনশ্রী”তে করে আসার সময়ও। সারাক্ষন খালি কেউ একজন মাথার ভেতর বসে বসে বিষণ্ণ ভারী গলায় গাইছে, জনি জনি প্লীজ তুমি কেঁদোনা। আর একটুও কেঁদোনা 😦  কাঁদতে মানা করা এই গানের সুর শুনতে শুনতে আমার নিজেরই এখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি টাইপ অবস্থা। গানটা শোনা হয়না অনেক দিন। তারপরও ক্যান যে হঠাৎ আমার উপর ভর করলো ঠিক বুঝতে পারছিনা। তবে এটা ঠিক গানটা আমার খুব খুব প্রিয় একটা গান। যতবারই শুনি না দেখা মানুষ দুজনের কথা ভেবে মনটা কেমন বিষণ্ন হয়ে যায়। গানের লিরিকের ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকা কষ্ট গুলো বুঝতে পেরে চুপ করে থাকি। মনে হয় জিমি আর জনি দুরের কেউতো নয়। নিজের জীবন থেকেই উঠে আসা চেনা দুটো চরিত্র। পৃথিবীর সব জিমিরাই বোধহয় এমন বোকা। সময় থাকতে ভালোবাসা বুঝতে পারেনা। যখন বোঝে তখন its too late.এরপর জনি কে কাঁদতে মানা করে নিজেই ঝাঁপসা চোখে মন খারাপ করে নিরর্থক অপেক্ষায় থাকে। কেউ এক মাস, কেউ এক বছর, আর কেউবা এক জীবন।

জনি তবু ভাল থাকুক। বর্ষা ভুলে সারা বছর জনির দু চোখে বসন্ত লেগে থাকুক।

জনি, তবুও তুমি কেঁদোনা…. প্লীজ আর কেঁদোনা।

Advertisements
This entry was posted in দিন লিপি. Bookmark the permalink.

3 Responses to জনি জনি প্লীজ ডোন্ট ক্রাই

  1. রাশেদ বলেছেন:

    হু!

    ক্লাস নাইনে শুনেছিলাম প্রথম এই গান। এই গান পরে এক নির্মম রসিকতা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো আমার জন্য!

  2. Zihad বলেছেন:

    ঝেড়ে কাশেন মিয়া 😉

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s