বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর

আমি বৃষ্টি ভালবাসি।

বাক্যটা পড়ার সাথে সাথেই রায়হান আবীর নিশ্চিতভাবেই তার পেটেন্ট করা “মায়াবী হাসি” লকারে পুরে গা জ্বালানো কোন হাসির ধান্দায় চারপাশ হাতড়ানো শুরু করে দেবে। আদনান ভাই হয়তো অস্ট্রেলিয়ায় না দেখা দুরত্বে থেকেই “দেখার মত” একটা হাসি দিয়ে চেয়ারে আরেকটু নড়েচড়ে বসবে কাহিনী নতুন কোন দিকে মোড় নেয় কীনা ভেবে। কিংবা কে জানে, আলম ভাই “ভালবাসি তোমাকে- পার্ট টু” বের করেও ফেলতে পারে বর্ষা আর বৃষ্টির মাঝে গোপন কোন যোগসূত্র আবিস্কার করে।

যেটাই হোক, তবুও বলি। আমি বৃষ্টি ভালবাসি। এবং আগেই বলে রাখি এই ভালবাসার সাথে বাংলাদেশী আষাঢ়, শ্রাবণ মাস ছাড়া অন্য কোন বর্ষাকালের কোন রকমের কোন সম্পর্ক নাই।

বৃষ্টির প্রতি এত ভালবাসাবাসি স্বত্বেও সেভেনে থাকতে মাঝে মাঝে বৃষ্টির ওপর চরম মেজাজ খারাপ হতো। বিশেষ করে বৃষ্টিটা সকালে পিটির টাইমে হলে। যখন দেখতাম বৃষ্টির জন্য পিটি এক্সকিউজ হবার পর সিনিয়রগুলান চোখের সামনে দিয়ে রঙ্গ কইরা হাইট্টা যাইতো আর বিছানার উপর ঝাপায় পড়তো। আর আমরা তখনো বাম ডান বাম ডান করতে করতে শেড কাপায় ফেলতেসি। মাঝে মাঝে বৃষ্টির শব্দের জন্য পায়ের আওয়াজ ঠিকঠাক শোনা যেতনা। আর তখনি স্টাফের চিল্লানি – হয়নাই, কিচ্ছু হয়নাই। সবগুলান ডানো খাইয়া বড় হইসে। দৌড়ে তালে তালে আবার হবে…. তখন মনে হইতো স্টাফরে ধইরা সামনে লনের পানিতে চুবাই।

বৃষ্টির মজা উপভোগ করা শুরু করলাম এইটে ওঠার পর। নভিসত্ব ঘুচিয়ে যখন আমরা পুরোদস্তুর ক্যাডেট। এইবার আমাদের রংগ করার পালা। সেভেনগুলার দিকে তাকিয়ে এইবার আমাদের তাচ্ছিল্যের হাসি দেবার সময়। কিন্তু তখন দেখা গেল বৃষ্টি যত না পিটির টাইমে আসে কিংবা আসলেও হয় পিটি টাইম এর আগে এসে চলে যায় না হয় পিটির পর আসে। ব্যাটে বলে টাইমিং হয় খুব কম সময়ই। কতদিন যে এমন হয়েছে দুই তলা থেকে দেখছি বৃষ্টি পড়ছে নিচতলায় নামতে নামতেই তার তেজ পুরা অর্ধেক হয়ে গেছে। তার পরেও স্টাফের সাথে গাইগুই করি -” দেখেন না স্টাফ, কত বৃষ্টি এখনো। ” এক্ষেত্রে কিছু কিছু পোলাপানের ভাষার ব্যবহার ছিল রীতিমত মুগ্ধ করার মত। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতেও এই শ্রেণীর পোলাপানের চাপার জোর পুরা মুষল ধারে বর্ষিত হত। এবং অনেক সময়ই এদের কথার বৃষ্টিতে সহ্য করতে না পেরে স্টাফ শেষমেষ বিশ্বাস করতে বাধ্য হত যে এই বৃষ্টিতে ফুটবল খেলা যায় কিন্তু কোনমতেই পিটি করা যায়না।

আবার গেমস টাইমে ব্যাপারটা হতো ঠিক উল্টা। তখন বৃষ্টি হওয়া মানে পিটি টাইমের চে ডাবল মেজাজ খারাপ হওয়া। কারণ গেমস টাইমে বৃষ্টি হওয়া মানে জীবনের অন্যতম আনন্দের সময়টুকু স্রেফ বৃষ্টির জলে ভেসে যাওয়া। কাজেই তখন স্টাফের সাথে আমাদের ভাববিনিময়ের সুরটা পিটি টাইমের ঠিক উল্টা হতো। তাতে মাঝে মাঝে কাজ হতো। মাঝে মাঝে হতোনা। হলে তো কথাই নেই। বৃষ্টির পানিতে নাকানি চুবানি খেয়ে ফুটবল খেলার মত মজা পৃথিবীর আর কিছুতে পাওয়া যায় বলে আমার জানা নেই। কেউ যদি আমার এ কথার সাথে দ্বিমত করে থাকেন তাহলে বলবো হয় আপনি ফুটবল কি জিনিস সেটা কেবল টিভিতেই দেখেছেন কিন্তু বাস্তবে কোন দিন ফুটবলের গায়ে লাথি মারার সৌভাগ্য হয়নি অথবা অাপনি একজন এক্স গার্ল ক্যাডেট (কারণ আমার মনে হয়না তাদের কখনো বৃষ্টিতে ফুটবল খেলার অভিজ্ঞতা আছে )

ক্লাস এইটের ফুটবল কম্পিটিশনের কথা। প্রতিপক্ষ নজরুল হাউস। সাথে যোগ হল বৃষ্টি। ফলাফল: খেলা শুরু হবার আগে মাঠের দিকে তাকিয়ে সেটাকে আর মাঠ বলে চেনা যায়না। যতদুর চোখ যায় মাঠে শুধু পানি আর পানি। মাঠের এই অবস্থা যদি রবি ঠাকুর তার জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারতেন তাহলে বোধহয় বর্ষা নিয়ে নতুন মাত্রার আরো কিছু ছড়া কবিতা আমরা পেতাম। তো ডিসিশন হলো সবাইকে খালি পায়ে খেলতে হবে। খেলা মাঠে গড়ালো। দুইদলই বলের পিছনে দৌড়াছে। কিন্তু বল বাবাজি কাউকেই তেমন একটা পাত্তা দিচ্ছেনা। নিজের মন মর্জি মত মাঠে গড়াগড়ি খাচ্ছে। হয়তো বামে শট করার পরেও দেখা গেল বল ডানে যাচ্ছে কিংবা ডানে শট করলে বামে। আর মাঝে মাঝে কোনদিকেই যাচ্ছেনা। শট খাবার পরেও ভাল মানুষের মত মুখ করে যেখানে ছিল সেখানেই বসে থাকছে। সে এক অবস্থা বটে। খেলার এক পর্যায়ে আমি ক্যামনে ক্যামনে জানি বাইশ জনের হল্লাহাটির মধ্যে থেকেও প্রতিপক্ষের গোল কীপারকে একলা পেয়ে গেলাম। আমার পায়েই যে তখন বল ছিল সেটা বলাই বাহুল্য। ওটা এতোই সহজ একটা গোলের সুযোগ ছিল যে শুধু ফুটবলে লাথি মারতে যতক্ষণ লাগে ততটুকুই দেরী হবার কথা। এদিকে আমিও বেশ এক্সাইটেড। গোল দেবার আগেই গোল দেবার আনন্দে বিভোর। এবার শট নেবার পালা। শট করলামও। সামনে দেখছি প্রতিপক্ষের গোল কীপার আমার শট নেবার ডিরেকশন বুঝে সেদিকে ঝাপিয়ে পড়লো। বল যেখানটাতে ছিল মাঠের ঐ অংশটায় খুব বেশি পানি জমে ছিল। ফলে কোনমতে শটটা করতে পারার পরই আমিও মাঠে চিৎপটাং হয়ে পড়ে গেলাম। তার পরপরই আমি আর গোল কীপার দুজনেই উঠে দাঁড়িয়ে দেখি জালের ভেতর বল নাই। থাকবে ক্যামনে। বল বাবাজি শট করার আগে যেখানে ছিল ঠিক সেখানেই আছে। মাঝখান থেকে আমি আর গোল কীপার কাঁদার মধ্যে গড়াগড়ি খেয়ে বেকুব হইলাম।

কলেজে থাকতে বৃষ্টিতে ভেজার ছিল আরেক মজা। কারণ সেখানে একা একা ভিজে বাংলা সিনেমার শুটিং করার কোন অবকাশ নাই। নামলে সব দল বেঁধে নামা। তবে ক্লাস নাইন পর্যন্ত বৃষ্টিতে ভেজার উপায় ছিলনা। কারণ তখনো পর্যন্ত অঘোষিতভাবে এর উপরের সিনিয়র ক্লাসগুলাই শুধু রঙ্গ কইরা বৃষ্টিতে ভিজতে পারতো। তবু মাঝে মাঝে চুরি করে নেমে পড়তাম। তখন মাথায় চিন্তা থাকত দুইজনকে নিয়ে। এক: সিনিয়র ক্লাস দুই: হাউস বেয়ারা মনির ভাই। বৃষ্টিতে ভেজার সময়ে কলেজ লাইফে যে মানুষটা সবচে বেশি পেইন দিসে সে মনে হয় এই মনির ভাই। একবার হলো কি বৃষ্টিতে ভিজতেসি কোয়াইট আওয়ার এর সময়। আমরা জনা পাঁচেক হব। সবার হাফ ড্রেস পড়া। হঠাৎ শেডের কোণায় মনির ভাইয়ের অবয়ব স্পষ্ট হয়। আমরা শার্ট খুলে মুখ ঢেকে যে যেভাবে পারি দৌড় লাগালাম। আমি হাউসের অন্য সাইডের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলাম। মনির ভাই ক্যমনে ক্যমনে জানি সেটা দেখে ফেললো। এবং আমি যেইটা ভাবিনাই এরপর সে সেই কাজটাই করলো। আমারে চেনার জন্য পেছন পেছন সেও দৌড় লাগালো। কিছুক্ষণ দুই তলা জুড়ে হাইড এন্ড সিক খেলার পর মনির ভাই শেষমেষ ক্ষান্ত দিল। তবে সবচে মজা পাইসিলাম গেমস টাইমের পর আমাদের রুমে এসে যখন যখন এই কাহিনী সে আমারে এসে বলতেসিল। তার ধারণাতেই ছিলনা আমার মত শান্ত শিষ্ট একটা ছেলে বৃষ্টিতে ভেজার মত এমন জঘন্য একটা অপরাধ করতে পারে।

ক্লাস ইলেভেনে ওঠার পর মনির ভাইরেও আর তেমন বেইল দিবার টাইম নাই। কিন্তু এটা ঠিক, বৃষ্টিতে ভেজার সময়ে শেড বরাবর হাউসের এর দরজায় দাঁড়িয়ে থেকে মনির ভাই হাউস মাস্টার এর কাছে বিচার দিবে, এই করবে সেই করবে বলে বংগবন্ধু টাইপ যে ভাষণ দিত সেটা শুনতে মোটেও ভাল্লাগতোনা।

একবার মনে আছে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ফজলুল হাউস থেকে আমরা কয়েকজন সোহরাওয়ার্দী হাউসের দিকে গেলাম। তারপর ঐ হাউস থেকে কয়েকজনরে ডেকে বের করে রওনা দিলাম নজরুল হাউসের উদ্দেশ্যে। এবার ঐ হাউস থেকেও ডেকে ডেকে ক্লাসমেট বের করার পালা। এরপর সবাই মিলে নজরুল হাউসের হাউস গার্ডেনে ঢুকে হাডুডু খেলা শুরু করলাম। তিন হাউস থাকতে নজরুল হাউসের গার্ডেন সিলেক্ট করার কারণ বছরের ঐ সময়টাতে অন্য দুই হাউসের গার্ডেনে তখন ফুল তেমন ভাবে না থাকলেও কিছু গাছ অন্তত ছিল। নজরুল হাউসেরটায় সেটাও ঠিকমত ছিলনা!! নির্দ্বিধায় ওটাকে হাডুডুর জন্য ইন্টারন্যাশনাল ভেন্যু করা যাবে। খেলা শুরু হবার পর দেখা গেল সোহরাওয়ার্দী হাউসের জানালা আর নজরুল হাউসের করিডোরে অনেক দর্শক জমে গেছে খুব অল্প সময় এর মধ্যেই। জমে উঠলো খেলাও। কিন্তু ক্যাডেট কলেজে কোন কিছুই ঠিক শান্তিমত হবার নয়। হঠাৎ শোনা গেল ডিউটি মাস্টার কোত্থেকে জানি এই ইন্টারন্যাশনাল ম্যাচের খোঁজ পেয়ে খেলা দেখতে এদিকেই আসছে। কিন্তু আমরা তাকে চেহারা দেখাতে মোটেও রাজি নই। কাজেই যার যা কিছু আছে সে সেটা নিয়েই ওখান থেকে দৌড়। ভাগ্য ভাল, সে যাত্রায় আমাদের কেউ ধরা খাইনি। তবে তখন যদি হাউস গার্ডেনটাকে দেখে কেউ সদ্য হাল চায করা জমি ভেবে বসেন আমি তার বুদ্ধিমত্তা নিয়ে মোটেও প্রশ্ন তুলবোনা। বরং বলবো তার আই কিউ বেশ ভালো।

ক্লাস টুয়েলভ এ উঠে হাউস পোর্চে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি বিলাসের দিন শুরু। বৃষ্টি শুরু হলেই সোজা পোর্চে চলে যেতাম। সেটা রাত হোক আর দিন হোক। কলেজ থেকে বের হবার পরও যে অসংখ্য স্মৃতিগুলো আমাকে প্রতিনিয়ত সংগ দেয় রাতের বেলা একা একা পোর্চে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভেজার স্মৃতিগুলোও ওদেরই একজন। আমি আজো সেই স্মৃতির বৃষ্টিতে সিক্ত হই প্রতিনিয়ত। চোখ বুজে এখনো কলেজের সেই শ্রাবণ রাতগুলোকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করি। সেসব স্মৃতির সাথে সাথে বৃষ্টিভেজা আরো কত শত স্মৃতি পাশ ঘেঁষে এসে দাঁড়ায় চুপচাপ।

আমি কোন কথা বলিনা। চুপচাপ ওদের সাথে ভিজি। হঠাৎ মনে হয় আমার পাশে হিমেল এসে দাঁড়ালো। একটু পরেই দুটো মানুয পোর্চের খসখসে কংক্রিটের ওপর সটান হয়ে শুয়ে পড়ে। সারা আকাশজুড়ে তখন শ্রাবণ বৃষ্টির উচ্ছাস। মানুষ দুজন ভিজতে থাকে। বন্ধ দু চোখের পাতায় বৃষ্টির ফোটাগুলো কেমন ঘোর লাগা স্পর্শ বুলিয়ে যায়। ওভাবেই শুয়ে থাকা অনেকক্ষণ।

হঠাৎ করেই ঘোর কেটে যায়। বন্ধ চোখ খুলে কলেজ থেকে অনেক দূরে চারদেয়ালের মাঝে নিজেকে আবার ফিরে পাওয়া। চোখের কোণায় হাত বুলোতেই কেমন ভেজা ভেজা স্পর্শ লাগে। ও কিছুনা। বোধহয় বৃষ্টির ছাঁট এসে লেগেছে। জানালার বাইরের আকাশে এখন এখানেও বৃষ্টি হচ্ছে।

কী বোর্ডের উপর হাতদুটো কিছুক্ষণের জন্য চুপচাপ বসে থাকে। আনমনা হয়ে বাইরে তাকিয়ে আমি বৃষ্টি দেখি।

কারণ আমি বৃষ্টি ভালবাসি। অনেক অনেক বেশি ভালবাসি।

rainingmcc

ছবি: নজরুল হাউসের দোতলার বক্স রুম থেকে তোলা।

Advertisements
This entry was posted in ক্যাডেট বেলা. Bookmark the permalink.

6 Responses to বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর

  1. রাশেদ বলেছেন:

    বৃষ্টি খুব বিরক্ত লাগে এখন। আগে বৃষ্টিতে ভেজা মেয়ে দেখতে খুব ভালো লাগতো! 🙂

  2. Zihad বলেছেন:

    bristite pura dunia vije. ar apner chokhe khali maia i porlo…

    😕

  3. রাশেদ বলেছেন:

    হি হি! নষ্ট ছেলের ভ্রষ্ট চোখ! 😛

  4. Metalliferous বলেছেন:

    সি সি বি তে ঢোকা যাচ্ছেনা কেনো জিহাদ?
    তোমাদের কারো মেইল আই ডি ও আমার কাছে নাই যে মেইল করে জানবো, তাই অনেক ঘুরাঘুরি করে তোমার ব্লগটা পেয়ে এখানেই জিগাইলাম।

  5. Zihad বলেছেন:

    ভাইয়া সিসিবি মোটামুটি ভাল একটা বিপদের মধ্যে আছে। আজকে সকালে হঠাত করে সার্ভার হার্ড ডিস্ক ক্র্যাশ করসে। ডাটাবেস ব্যাক আপ আছে। বাট অন্যগুলো হারিয়ে যাবার চান্স আছে। কালকে শিওর হওয়া যাবে। চেষ্টা করছি নতুন কোথাও আপাতত শুরু করা যায় কীনা 😦

  6. Metalliferous বলেছেন:

    হায় আল্লাহ্, এটাতো দুঃসংবাদ!!
    প্রার্থনা করছি যেনো সব ঠিকঠাক হয়ে যায়।
    সি সি বি তো বলা যায় লাইফের একটা অংশই হয়ে গেছে।

    এন্ড মেনি থ্যাংকস্ ফর দ্য আপডেট।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s