একটি হারানো বিজ্ঞপ্তি

ঠিকমত হাঁটতে শেখার আগেই আমি জীবনে প্রথমবারের মত হারিয়ে গেলাম। বাবা মার ভাষায় সে সময়ে আমি কেবল টুক টুক করে এ ঘর ও ঘর করতে পারি। তবে গট গট করে হেঁটে বাসা থেকে বেরিয়ে গিয়ে হারিয়ে যাবার মত গায়ের কিংবা পায়ের জোর কোনটাই তখনো হয়নি। কিন্তু শেষমেষ সেটাই হল।এবং কেমন কেমন করে যেন হল। আমার বয়স তখন এক এর পিড়ি পেরিয়েছে মাত্র। সেই কিছুই না হওয়া বয়সে বাসার ছোট ছেলে সবার চোখ এড়িয়ে গায়েব হয়ে গেল। এবং সবচে মজার ব্যাপার হচ্ছে সবাই এদিক ওদিক বিছানার নিচে , আলমারির চিপায়, রান্নাঘরের কোণে সব গলি ঘুপচি খোঁজা শেষ করে যখন বুঝতে শুরু করেছে আমি আসলেই হারিয়ে গিয়েছি ঠিক তখনই আমাকে খুঁজে পাওয়া গেল। বলা ভাল খুঁজে এনে দেয়া হল। কিন্তু ততক্ষণে আমার মা বিছানার একটা স্ট্যান্ড ধরে কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছেন। বাবা গেছেন সবচে কাছের মাইকের দোকানে। যাবার আগে সাথে করে একটা হারানো বিজ্ঞপ্তি রেডি করে নিয়ে গিয়েছিলেন কীনা সেটা অবশ্য কখনো জিজ্ঞেস করে দেখিনি। তবে উদ্দেশ্যটা সেরকম কিছুই ছিল। গুল্টু গাল্টু, ফর্সামত, মল্লিকা শেরাওয়াতের ব্যবহার করা সাইজের সমান হাফপ্যান্ট পড়া এক বছর বয়সী একটা বাচ্চা হারানোর নিখোজ সংবাদ মাইকে করে পুরো মহল্লায় প্রচার করা। তো এই যখন অবস্থা বাসার গেটে আরেকজনের কোলে ললিপপ খাওয়া অবস্থায় হঠাৎ আমাকে দেখা গেল। বিছানার স্ট্যান্ড ছেড়ে মা আমাকে কোলে নেবার জন্য দৌড়ে এলেন। বাসার কাজের মেয়েটার মুখেও স্বাভাবিক রং ফিরে আসলো। কারণ আমাকে দেখাশোনা করার দায়িত্ব ওর ওপরেই ছিল। আমি হারানো মানে ওর নিজেরও বাসা ছাড়া হওয়া। যে লোকটার কোলে আমি নিশ্চিন্তে গুটিসুটি মেরে ললিপপ খাচ্ছিলাম তিনি আমাদের পরিচিত এক রিকশাওয়ালা। তার কাছ থেকে যা জানা গেল আমি নাকি বাসা থেকে পাঁচ টাকা রিকসা ভাড়া দুরত্বের বাস স্ট্যান্ডের কাছে বাচ্চা হিমুর মত ঘোরাফেরা করছিলাম। গাব্দুস গুব্দুস টাইপের একটা বাচ্চার একা একা এরকম সন্দেহজনক ঘোরাফেরা করা দেখে আশেপাশের মানুষজনের ভুরু কুঁচকে ওঠে। দেখতে দেখতে একসময় আমার আশেপাশে ভীড় জমে যায়। সবাই যখন বলাবলি করছে এরকম সুইট কিউট বাচ্চাটা কোত্থেকে এখানে এসে পড়লো আর আমি তখন আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে কান্না শুরু করলাম। বাবা মা ছাড়া এতগুলো অপরিচিত মুখ একসাথে দেখতে আমার এক বছর বয়েসি চোখ তখনো অভ্যস্ত নয়। আমাদের পরিচিত রিকশাওয়ালাটাও সেই ভীড়জমা মানুষগুলোর মাঝে একটু পর এসে ভীড়লো। এখানে কীসের এত কান্নাকাটি হল্লাহাটি সে রহস্য বোঝার আশায়। তিনি এসে আমাকে দেখলেন এবং একনিমিষে কাহিনী বুঝে নিলেন। যার ফলস্বরুপ উনি যখন এই ঘটনাটা বাসার সবাইকে বলছেন আমি তখন ললিপপ শেষ হয়ে যাবার পর তার ডাটি দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে খেলছি। আমাকে ফিরে পেয়ে বাসায় আবার প্রাণ ফিরে এল। মা আমাকে কোলে নিয়ে যখন আদরে আদরে ভরিয়ে দিচ্ছেন তখন বাসার সামনের রাস্তা থেকে মাইকের আওয়াজ পাওয়া গেল- একটি হারানো বিজ্ঞপ্তি, একটি হারানো বিজ্ঞপ্তি… আমার মা,আপু, কাজের মেয়েটা, পাশের বাসার মুনা আপু, রাব্বি ভাইয়া – সবাই একসাথে হো হো করে হেসে দিল। আর হঠাৎ এরকম উচ্চস্বরের হাসির আকস্মিকতায় সেদিন দ্বিতীয় বারের মত আমি ভ্যা করে কেঁদে দিলাম।

সেদিন থেকেই আমার হারিয়ে যাবার ক্যারিয়ারের শুরু …

দ্বিতীয়বার হারালাম ক্লাস ওয়ানে। আমরা তখন টাংগাইলের ঘাটাইলে থাকি (বাসা এখনো সেখানেই আছে,শুধু আমি মিসিং)। বাবার কলেজ থেকে পিকনিকে যাচ্ছে। পিকনিকের গন্তব্য শালনা এবং ফেরার আগে সময় থাকলে বানিজ্য মেলায়ও ঢু মেরে আসা হবে। তখন ঢাকায় বানিজ্য মেলা চলছিল। পিকনিকের দিন বাবা ওষুধ, চশমা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের পোটলা নেয়ার সাথে সাথে আমাকেও নিয়ে রওনা হলেন। শালনা পর্ব বেশ সুন্দর ভাবে শেষ হল। এবং তারপর দেখা গেল বানিজ্য মেলা থেকে একপাক ঘুরে আসার মত সময়ও চাইলে করা সম্ভব। তো পিকনিকের বাস ছুটলো শেরে বাংলা নগরের দিকে। শেষ বিকেলের দিকে আমাদের বাস মেলায় পৌছলো। আলোকজ্জ্বল মেলা প্রাংগন দেখেই ছাত্র ছাত্রীরা তড়িঘরি করে মেলায় যাবার জন্য কিচির মিচির শুরু করলো। তবে ছেড়ে দেবার আগে টীচাররা সবাইকে পই পই করে বলে দিলেন যেন নির্দিষ্ট সময়ের পরেই যেন সবাই আবার বাসের কাছে চলে আসে।বাবা চাইলেন আমি তার সাথে মেলায় ঘুরবো। কিন্তু আমি তাতে ভেটো দিয়ে বসলাম। কারণ পিকনিকের সময়টুকুর মধ্যে বাবার এক ছাত্রের সাথে আমার খুব ভাব হয়ে যায়। আমি গোঁ ধরে বসলাম আমি ঐ ভাইয়াটার সাথে মেলায় ঘুরবো। ঐ টুকুন বয়সেই বাবা আমার জেদের কথা বোধকরি আমার চে ভাল ভাবে জানতেন। কাজেই এ নিয়ে আর কোন উচ্চবাচ্য করলেন না তিনি। আমি নতুন “বড় বন্ধু”টার সাথে মহানন্দে মেলা ঘুরতে বের হলাম।
মেলায় ঢুকে ভাইয়ার সাথে এই দেখি সেই দেখি আর শুধুই অবাক হই। চারদিকের এত চকমকে আলোক ছটা, রং বেরং এর স্টল আর তারচেও চমকপ্রদ শহুরে মানুষগুলোকে আমি মফস্বলের প্রাইমারি স্কুলে পড়া অনভ্যস্ত ছেলের চোখে অবাক বিস্ময়ে আবিস্কার করতে থাকি। অনেকক্ষণ এভাবে দেখতে আমার হঠাৎ ভাইয়াকে দেখার কথা মনে পড়লো।পাশে ফিরে তাকিয়ে ভাইয়া নেই। He is gone!!
আমি সব রং ভুলে গেলাম। সব কিছু কেমন সাদা কালো লাগে।আমার খালি মনে হচ্ছিল এ জীবনে বুঝি আর বাবার সাথে দেখা হবেনা।চার দিকে এত্ত মানুষ আর এত্ত কিছু । আমি কই যাবো কি করবো বুঝতে না পেরে সেখানেই দাড়িয়ে রইলাম। কতক্ষন ওভাবে দাড়িয়েছিলাম ঠিক মনে নেই। হঠাৎ পেছন থেকে কাঁধের ওপর হাতের সাড়া পেয়ে তাকিয়ে দেখি ভাইয়া। তার চোখ মুখের দিকে তাকিয়ে আমি আমার কথা ভুলে গেলাম। বেচারা বাবাকে বলে কয়ে নিয়ে এসেছিল যে আমাকে সে দেখেশুনে রাখবে। এর মধ্যে আমাকে হারিয়ে ফেলে তার চেহারা একেবারে তব্দা খাওয়ার মত হয়ে গেছিল।
– জিহাদ, তুমি জানো তুমি আমারে কি টেনশনে ফেলসিলা? তুমি হারায় গেলে স্যাররে আমি কি জবাব দিতাম বল তো?
ভাইয়া এক নি:শ্বাসে গড় গড় করে বলে থেমে হাপাতে থাকে।
আমি প্রথমবারের মত কান্নাকাটি না করে এবার ফিক করে হেসে দেই। বাবার মুখ আবার দেখতে পাবো আমি তাতেই খুশি। কিন্তু বাসের কাছে এসেও আমি বাবাকে দেখতে পাইনা। তার বদলে বাকি সবাই অামার দিকে ছুটে আসে। আমি জিজ্ঞেস করি- বাবা কোথায়?

কেউ একজন বলে ওঠে বাবা আবার মেলার দিকে গেছে। মেলার ইনফরমেশন বুথে হারানো বিজ্ঞপ্তির নোটিশ দিতে।

তৃতীয়বার হারাতেও আমার বেশি সময় লাগলোনা। এবং সেটা তার এক বছরের মধ্যেই।

যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম তখন টিফিন টাইমের পাশাপাশি স্কুল ছুটির পরও বন্ধুরা মিলে অনেকক্ষণ ধরে খেলতাম। কাজেই স্কুল ছুটির পর কিছুটা দেরি করে গেলেও বাসায় সেটা নিয়ে তেমন চিন্তা করতোনা। বাবা মা জানতো তাদের এক মাত্র বিটলা পোলা ভালোই আছে, এবং খেলাধুলার মধ্যেই আছে। সেরকমই একদিন খেলা শেষ করার পর বাসায় ফিরে আসবো তার আগে আগে এক বন্ধু প্রস্তাব দিলো চল, আজকে তোকে আমাদের বাসায় নিয়ে যাবো। আমিও তেমন আগপাশ না ভেবে মাথা কাত করে সায় দিলাম। ভেবেছিলাম ওদের এখানে কিছুক্ষণ থেকে,আন্টি ভালমত যা খেতে দেবেন তা’ লাজুক লাজুক অস্বস্তি নিয়ে কিছুক্ষণ না না করে অত:পর সেটা খেয়ে চলে আসবো। কিন্তু হলো তার হিতে বিপরীত। আন্টির আদর আপ্যায়নের বহর দেখে আমার আগে করা প্ল্যানের কথা পুরোপুরি ভুলে গেলাম। শেষমেষ ঠিক হল দুপুরে ভাল মন্দ কিছু খেয়ে বন্ধুর সাথে আরো কিছুক্ষন খেলে টেলে বিকেলের দিকে আংকেল আমাকে বাসায় দিয়ে আসবেন। অামি তো মহানন্দে ওদের গাছ থেকে পাড়া একটা পেয়ারায় কামড় দেই তো পরমুহুর্তেই আবার বাটিতে বানানো মুড়ির দিকে চোখ বুলাই। ওদিকে বাসার টেমপারেচার একটু একটু করে বাড়ছে। স্কুল টাইম কবেই শেষ, দেখতে দেখতে দুপুরও বিকেলের দিকে হাঁটা দেয়।অথচ আমার তখনও কোন খোঁজ নেই। মার এমনিতেই টেনশনের ওপর পি এইচ ডি করা। এরকম উপযুক্ত পরিবেশ পেলে সেটা আরো ভালমত বোঝা যায়। বাবা অাবার মাইকের দোকানের দিকে দৌড়ুবেন কীনা ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। কারণ এর আগের দুইবার মাইক নিয়ে ছ্যাঁকা খাবার এক্সপেরিয়েন্স তার অলরেডী আছে । শেষমেষ উনি না গিয়ে আরো কিছুক্ষন অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

বাবার সিদ্ধান্তটা ঠিক ছিল। কিন্তু ভুল ডিসিশনটা নিলাম আমি।

বিকেলে ফেরার সময় যখন বন্ধুর বাবা আমাকে এগিয়ে দিতে চাইলেন অামি তখন সর্বশক্তিতে দুই দিকে ঘাড় নাড়ি। আমি এখন বড় হয়েছিনা, ক্লাস থ্রিতে পড়ি। এখনো যদি দিয়ে আসতে হয় সে তো বড় লজ্জার ব্যাপার। কাজেই আমি একাই বাসার দিকে রওনা হলাম।
বিকেলের দিকে বাসায় ফিরলাম। এবং ফেরার পর পরই সব খুলে বলার পর বাবার কাছ থেকে যে অভ্যর্থনা পেলাম তখন মনে হচ্ছিল না ফেরাটাই বোধহয় আরো ভালো ছিল।

এবার পরের এপিসোডে আসি। (খুব বেশি বোরিং লাগতেসে? কিন্তু কিছু করার নাই। শুরু যখন করেছি শেষ করেই উঠবো।)

সেকেন্ড ইয়ারের একেবারে প্রথম দিককার কথা। আই ইউ টি সাউথ হলের পাঁচতলার দুই ব্লকের মাঝামাঝি জায়গাটায়, যার ঠিক দুই তলার নিচ বরাবর দাঁড়িয়ে আমাদের কিংকর্তব্যবিমুঢ় ভাই দিন রাত ফোনে টাংকি মারতো, সেখানটায় দাঁড়িয়ে আমি ফোনে কথা বলছিলাম। রাত তখন দুইটা মতন বাজে। হঠাৎই ফোনের ওপাশ থেকে দ্বিধাগ্রস্ত কন্ঠ শুনি। আমতা আমতা করে বলে ওঠে-

– ইয়ে মানে…আমি না তোমাকে একটা কথা বলতে চাচ্ছিলাম।
– এক ঘন্টা ধরেতো পারমিশন ছাড়াই বলতেসো। এখন অাবার বলতে সমস্যা কি?
আমার নিজেরও তখন কেমন অস্বস্তি লাগা শুরু হয়। ওপাশ থেকে আর কোন কথা ভেসে আসেনা। মাঝে বোধহয় দ্রুত নি:শ্বাস পড়ার আওয়াজ শুনি কিছুক্ষন।
আমি আবার তাড়া দেই ওকে।
-হু, বলে ফেল। আমি অপেক্ষা করছি।

কিছুক্ষণ গুতোগুতির পর শেষমেষ ওর না বলা কথাগুলো এবার পাপড়ি মেলে।

– আমি না… আমি না তোমাকে…..

ওর বলা একসময় শেষ হয়।

শুনে আমার মনে হল জীবনে চতুর্থ বার এবং এখনো পর্যন্ত শেষবারের মত আমি কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম…….

Advertisements
This entry was posted in দিন লিপি. Bookmark the permalink.

3 Responses to একটি হারানো বিজ্ঞপ্তি

  1. রাশেদ বলেছেন:

    প্রথমগুলো পড়ে হাসি পাচ্ছিলো। আর লাস্টেরটা পড়ে হিংসা লাগছে। 🙂

  2. Zihad বলেছেন:

    vai hingsha tinghshar kisu nai. emni e valo asen.. onek valo 🙂

  3. রাশেদ বলেছেন:

    কে জানে কে ভালো আছে! 😦

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s