ভালোবাসার রঙ টা সবুজ



– বুঝলা, যতদিন জুনিয়র আছো কখনো মাথা উঁচু করে হাঁটবানা। সবসময় মাথা নিচু। লুকডাউন পজিশন।
লকারের উপরের তাকে কাপড় গুছিয়ে দিতে দিতে ফাহিম ভাই কথাগুলো আমাকে বললেন।
– জ্বী আচ্ছা।
– তোমাকে না একটু আগে বললাম সিনিয়রের সাথে যে কোন কিছু বলার আগে কাইন্ডলি বলতে হবে।
ফাহিম ভাইয়ের কন্ঠে হালকা অসন্তোষের ছাপ। আমি মুখ কাঁচুমাচু করে ফেলি।
শুকনো গলায় বললাম – কাইন্ডলি জ্বী।

কলেজে সেদিনই মাত্র এসেছি। একাডেমী ব্লক থেকে ফাহিম ভাই আমাকে রিসিভ করে হাউসে নিয়ে এসে সব কিছু গুছিয়ে দিতে দিতেই কলেজে সারভাইভ করার প্রথম পাঠ শিক্ষা দিচ্ছিলেন। আমিও ছেলে হিসেবে বেশ বাধ্যগত টাইপের। সিনিয়রদের সাথে তো বটেই। ফাহিম ভাইয়ের কথাগুলো তাই মাথায় গেঁথে নেবার চেষ্টা করি… অলওয়েজ লুক ডাউন । মুখ খুললেই কাইন্ডলি জ্বী। হাউসের কাজ শেষে ফাহিম ভাইয়ের সাথে আবার একাডেমি ব্লকের দিকে পা বাড়াই। আমার প্যারেণ্টস সেখানে অপেক্ষা করছে। রুম থেকে বের হয়ে এবার আর ভুল করিনা। চিবুকটা একেবারে বুকে এসে ঠেঁকে। আমার দুনিয়ার আর কিছু দেখার দরকার নেই। কিছু জানার দরকার নেই। আমি আমার চারপাশটা এড়িয়ে শুধু পায়ের সামনের পথটুকু বুঝে বুঝে লুক ডাউন হয়ে হাঁটতে থাকি। পরবর্তী সাত দিনও তার ব্যত্যয় ঘটেনা। সময়ের কাঁটা থেমে থাকা সেই সাতটি দিনও কেমন কেমন করে যেন একসময় শেষ হয়ে যায়। ক্যাডেট লাইফের প্রথম ছুটিতে বাসায় গেলাম।

দুনিয়ার আর সব ভাল জিনিসের মত একুশ দিনের বড়সড় ছুটিটাও চোখের পলক ফেলার আগেই একসময় দেখতে দেখতে শেষ হয়ে গেল। ছুটি শেষে বাসা থেকে ফিরে আসার পর হাউসের পাশের রাস্তা দিয়ে যাবার সময় মনের ভুলে লুকডাউন না হয়ে ডানে তাকালাম। ভুলে যাবার জন্য একুশ দিন কম সময়তো নয়। এবং ডানে তাকিয়ে আমি বেশ বড় সড় সাইজের একটা ধাক্কা খেলাম। এত বিশাল একটা সবুজ ঘাসে মোড়া মাঠ আমাদের কলেজে আছে সেটা আমি সেই সাত দিন কলেজে থেকে একটুও টের পাইনি!!
কথাটা ফাহিম ভাই কোনদিন শুনে থাকলে নিশ্চিত ভাবেই খুশি হবেন। তার ফলোয়ার কেমন অক্ষরে অক্ষরে তার শেখানো নিয়মগুলো মেনে চলেছিল ভেবে। আর বাকি সবাই যে আমাকে বেকুব ভেবে মনে মনে হাসাহাসি শুরু করে দিয়েছেন সেটাও নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

সেই সাতটা দিনেই কেবল প্রথম এবং শেষবারের মত মাঠটাকে না দেখে থাকা। মাঠ নিয়ে সেদিনের সেই বিস্ময়বোধের জায়গাটুকু পরবর্তী ছয় বছরে কেবল ভালোবাসা দিয়ে পূর্ণ হয়েছে। সেভেনে থাকতে নভিসেস ড্রীল করতে করতে চোখে মুখে অনেক যন্ত্রণা নিয়ে মাঠটার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। সিনিয়র ক্লাসগুলো কি মজায়ই না গেমস করছে! আর ভাবতাম কবে নভীস থেকে পুরোপুরি ক্যাডেট হবো আর স্টাফের পশ্চাৎদেশে লাথি মারার চিন্তা বাদ দিয়ে ফুটবলের গায়ে লাথি মারতে পারবো। কষ্টকর সময়গুলো খুব দীর্ঘ হয়। কিন্তু সৌভাগ্যের কথা যে তাও একসময় শেষ হয়। নভিসেস ড্রিল শেষ করে একসময় পুরোদস্তুর ক্যাডেট হলাম। আমাদের প্রতি সিনিয়রের মনোভাবে যদিও তেমন কোন পরিবর্তন আসেনি। কিন্তু তাতে কি। তখন আমরা আর সবার মত সকালে উঠে পি টি করি। লেফট রাইটের ঝামেলা চুকিয়ে সাত পিরিয়ড ক্লাস করি। আর হ্যা… বিকেল বেলা গেমস আওয়ারে একটা ফুটবল এর পেছনে ব্যাচের তিপ্পান্ন জন মিলে দৌড়াদৌড়ি করি। আমরা এখন অন্যদের চে আলাদা কেউ নই।

সেই তখন থেকেই বিকেল বেলার গেমস আওয়ারের জন্য অপেক্ষা করতে করতে আমার প্রতিটি দিনের শুরু হতো। ক্লাস টুয়েলভে ঊঠতে উঠতে অনেক কিছুই বদলে গেছে। বদলায়নি শুধু অপেক্ষার বিষয়টি। সবসময় শুধু ছটফট করতাম গেমস আওয়ার কখন আসবে।

ক্লাস টেন পর্যন্ত গেমস আওয়ারের আগে তখন “ফার্স্ট প্রেপ” নামের একটা বস্তু পার করতে হত। আমার মনে হয় দুনিয়ার বোরিং জিনিসগুলোর টপ চার্ট করা হলে এই জিনিসটা আর সবকিছুকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে ফার্স্ট প্লেস দখল করে নিবে। ক্লাস এইটে এসে সেটাকেও আমরা রীতিমত এক্সাইটমেন্টে কনভার্ট করি আমি আর ইকবাল মিলে। ইকবাল আর আমার পাশাপাশি ডেস্ক ছিল। আমাদের ফার্স্ট প্রেপের পুরো সময়টুকু কাটতো গেমস আওয়ারে যার যার ফুটবল টিমের জন্য প্লেয়ার সিলেকশন আর স্ট্র্যাটেজি ঠিক করতে করতে। আমরা দুজন প্রেপ গার্ডের কাছ থেকে অনুমতি নিতাম ক্লাসমেটের কাছ থেকে পড়া বুঝে নেয়ার কথা বলে। আর তারপর সবার ডেস্কে ডেস্কে ঘুরতাম কার দল কত ভাল সেটা বুঝিয়ে ভালো প্লেয়ারগুলোকে ভুলিয়ে ভালিয়ে হাত করার ধান্দায়। মাঝে মাঝে বুঝানোর মাত্রা বোধহয় একটু বেশিই জোরে হয়ে যেত। ফলাফল হিসেবে তখন কেউ করিডোরে উঁকি মারলে মেরুন রঙ করা ডাস্টবিনের পাশাপাশি হ্যান্ডস ডাউন অবস্থায় আমাদের দুজনকেও আবিস্কার করতো।

ক্লাস নাইনে উঠে ফুটবল নিয়ে আমাদের মধ্যে নতুন ক্রেজের শুরু। আমরা ক্লাবের নাম নিয়ে ফুটবল ম্যাচ খেলা শুরু করলাম। আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে ম্যান ইউ ভার্সাস আর্সেনাল। পুরা সেইরকম ব্যাপার স্যাপার। তখন আর শুধু ফার্স্ট প্রেপেও কুলায় না। ঐ সময়টুকু যায় যার যার টীমের রণ কৌশল ঠিক করতে করতে। আর ইভনিং প্রেপ, নাইট প্রেপ যায় খেলা পরবর্তী উত্তেজনার রেশ সামলাতে সামলাতে। হারু পার্টিকে টীজ করতেও আমরা আমাদের পড়াশুনার সময়ের একটা বড় অংশ ব্যয় করি। ইট ইজ অলসো আ পার্ট অফ ট্রেইনিং!! সে এক কঠিন অবস্থা।

কলেজের বাকি সময়টুকুতেও খেলা নিয়েই মেতে থাকা হয়েছে বেশিরভাগ সময়। পড়াশুনা জিনিসটাকে কোনদিনই তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু হিসেবে ভেবে দেখা হয়নি। সবুজ মলাটে বাঁধাই করা তোফাজ্জল হোসেনের ফিজিক্স বইয়ের চেয়ে সবুজ ঘাসে মোড়া মাঠটার ভাষা আমি সবসময়ই ভাল বুঝতে পারতাম। বুকের একেবারে গভীরে কোথাও টান অনুভব করতাম। অপশনাল গেমসের দিনে কাঠফাটা রোদ দেখেও কখনো দুই বার চিন্তা করা হয়নি মাঠে নামবো কীনা। আর বেশির ভাগ সময়ই ফুটবল নিয়েই মেতে থাকা হতো। আমাদের ব্যাচটাকে ফুটবল ফ্রিক বললে বোধহয় খুব বেশি বলা হবেনা।

ক্লাস টুয়েলভে যখন কলেজকে শেষবারের মত বিদায় জানিয়ে ছুটিতে চলে আসার সময় হল আমার মনটা ভীষণ খারাপ থাকতো। যতটা না কলেজকে ছেড়ে যাবার কথা ভেবে তার চে বেশি আমার অতি অতি প্রিয় মাঠটাকে রেখে চলে যেতে হবে এটা ভেবে। বিকেল বেলা গেমস আওয়ার শেষে মাগরিব প্রেয়ারের জন্য রেডি হয়ে মাঠের পাশে কংক্রীটের বেঞ্চে বসে থাকতাম চুপচাপ। আমার ভালোবাসার মাঠটাকে সামনে রেখে। আমার তখন ক্লাস সেভেনের প্রথম সাতটা দিনের কথা মনে পড়তো। যে সাতটা দিন আমি এই মাঠকে না দেখেই কেমন অনায়াসে পার করে দিয়েছিলাম। মনে হতো পুরো ছয়টা বছরই যদি ভালোবাসার মাঠটাকে এভাবে চোখের আড়ালে রেখে পার করে দিতে পারতাম। চলে যাবার আগে তাহলে এতটা কষ্ট পেতে হতোনা।

সত্যি বলছি, অনেক কষ্ট হতো। এখনো হয়। সত্যিকারের ভালোবাসার অনুভূতিগুলো সবসময়ই বুঝি অনেক কষ্টের হয় …

Advertisements
This entry was posted in ক্যাডেট বেলা. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s