বৃষ্টি দিনের গল্প

হঠাৎ করেই বৃষ্টিটা নামলো। আষাঢ়ে ঝুম বৃষ্টি। অফিসে যাবো বলে নিচতলায় দাঁড়িয়ে ড্রাইভারের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। রহমান মিয়া মাত্র দু মাস আগে কেনা গাড়িটা গ্যারেজ থেকে বের করে এনে নিঃশব্দে আমার সামনে এনে দাঁড় করালো। গাড়ির দরজা খুলে পাশে দাঁড়িয়ে রইলো মুখ নিচু করে। রহমান মিয়া আমার দিকে কখনো চোখ তুলে তাকিয়ে কথা বলেনা। সে আমাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে। এবং সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার আমাকে সে বেশ ভয়ও পায়। ব্যাপারটা খুব ইন্টারেস্টিং। একটা বড় সড় গোছের চাকরিই করি। অধঃস্তন কর্মচারীরা আমাকে দেখে ভয় পাবে,একটু ভুরু কুচকে চাইলেই তোতলানো শুরু করবে;এসির হিমহিমে ঠান্ডা রুমে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে টেনশনে জমে ওঠা কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছবে- এমন কিছু হওয়া আশ্চর্যের নয়।বরং খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু সেরকম ভয়াবহ দর্শন বস হয়ে ওঠা হলোনা এখনো।কর্মচারীরা আমাকে যথেষ্টের চেয়েও বেশি সমীহ করে চলে। আমি যখন কোন কাজের কথা বলি কিংবা অফিসে ডেকে এনে প্রয়োজনীয় কোন নির্দেশ দেই তারা সেটা মাথা নিচু করেই শোনে। তাদের এই নিঃশর্ত আনুগত্য যত না ভয়ের ফসল তারচে বেশি শ্রদ্ধায় নুয়ে থাকে। অফিসের কেউ কখনো আসগার মাহমুদকে কারো দিকে চোখ রাঙিয়ে কথা বলতে দেখেনি। দেখেনি রহমান মিয়াও। দুদিন আগে আমার দশ বছরের ছোট মেয়ে রুপকথা খোঁচা দিয়ে বলছিল
-বাবা,তুমি এমন বোকা কেন? ঠিক মত বকাও দিতে পারোনা। অথচ বিথির আব্বুকে দেখ। কথা বলার জন্য মুখ হা করার আগেই বিথি কেমন ভয়ে চুপসে যায়। ওর বাবার মত তুমিও নাকের নিচে একটা গোঁফ লাগাও। তাহলে আমিও তোমাকে ভয় পাবো।
বলেই ফিক করে হেসে দেয় পিচ্চুনিটা। বোধহয় গোঁফ সুদ্ধ আমার চেহারা কেমন হবে সেটার কথা ভেবেই। আমিও বোকা বোকা মুখ করে ওর সাথে হাসিতে যোগ দেই।

ভাবতে ভাবতে আমি গাড়িতে উঠে বসি। রহমান মিয়া গাড়ি স্টার্ট দেয়।

গাড়িটা গেট পেরিয়ে মাত্র কিছুদূর গিয়েছে । ঠিক তখনই হুড়মুড় করে নামলো। উইন্ড স্ক্রীন আড়মোড়া ভেংগে নড়তে শুরু করার আগেই বৃষ্টির বড় বড় ফোটার আড়ালে সামনের দৃশ্যগুলো ঝাপসা হয়ে এলো। আমি কোন কিছু না ভেবেই বললাম-
-রহমান মিয়া,গাড়ি ঘোরাও।

সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে হঠাৎ করে নিজের এমন আচরণের কথা ভেবে অবাক হচ্ছিলাম। ড্রয়িং রুমে ব্রিফকেসটা রেখে যখন জানলার পাশে এসে দাঁড়ালাম তখনো ভাবনাটা গেলনা। এটা ঠিক,বৃষ্টি আমাকে অনেক বেশি টানে। কিন্তু সেটা কখনো অফিসের রাস্তা থেকে হুট করে এভাবে বাসায় টেনে নিয়ে আসেনি। জানলা থেকে নিচের দিকে দৃষ্টি গেল। আমাদের বিল্ডিং এর দেয়াল ঘেষে শ্যাওলার মত বেড়ে ওঠা বস্তির উঠোনে দুটো ছেলে মেয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে। বোধহয় ভাইবোন হবে। মাঝবয়েসী এক মহিলা পাশের রান্নাঘরে চুলোর আগুনে ফুঁ দিচ্ছে। আর মাঝে মাঝে তাকিয়ে ওদের কান্ড দেখে প্রশ্রয়ের হাসি হাসছে। হঠাৎ কি মনে হল ছোট ছেলেটি এক দৌড়ে রান্নাঘরের ভেতরে ঢুকে মহিলাটার আঁচল ধরে টানতে লাগলো। তিনতলা থেকে ঠিকমত ঠাহর করা যায়না।কিন্তু ছেলেটা কি বলতে চাচ্ছে বুঝতে কষ্ট হলোনা। মহিলাটা,বোধহয় ওদের মা,প্রথমে কয়েকবার মাথা নেড়ে না করলো। কিন্তু শেষমেষ ছেলের চাপাচাপির সাথে পেরে না উঠে বাইরে বেরিয়ে এল।সব দেখে মেয়েটা আনন্দে হাততালি দিয়ে ওঠে। বৃষ্টির তেজ ততক্ষণে আরো বেড়ে গেছে। ওরা মহানন্দে বৃষ্টিতে ভিজতে লাগলো। ছোট্ট একচিলতে ঘিঞ্জি উঠোনে তিনজন মানুষের আঁকা দৃশ্যটা দেখতে দেখতে হঠাৎ কেন যেন আমার প্রচন্ড হিংসা হতে লাগলো। কতদিন এভাবে বৃষ্টিতে ভেজা হয়না!

জানলা দিয়ে বৃষ্টির ছাঁট আমার গায়ে এসে লাগছে। তবু সেখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি। আর ভাবতে থাকি। দমকা হাওয়ায় পুরোনো স্মৃতিগুলোর পাতা একটার পর একটা উলটে যায়।

আমার ছোট বেলার কথা মনে পড়ে। ঝুম বৃষ্টিতে গ্রামের রাস্তায় কাদামাটি মেখে হাডুডু খেলতে থাকা ছোট খাটো ছেলেটা ধীর পায়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। কিংবা সেই ছেলেটা, বৃষ্টি মাথায় চাচাতো ভাইবোনের সাথে বাড়ির পেছনের ক্ষেতে জমে ওঠা বর্ষার থই থই পানিতে ডিংগি নৌকা নিয়ে যে সব বারণ ভুলে বেরিয়ে পড়তো। ওদের দেখাদেখি সন্ধ্যার অন্ধকার ছেড়ে কাঁচুমাঁচু মুখে বেরিয়ে আসলো ঐ ছেলেটাও,ঝড়ের মধ্যে যে কাউকে না বলে চুপি চুপি আমতলার দিকে পা বাড়াচ্ছে আর বারবার পেছন ফিরে তাকাচ্ছে কেউ দেখে ফেললো কীনা। এত বছর পরেও ওদেরকে ঠিকঠাক চিনতে পারলাম। থাই এলুমিনিয়ামের আবছায়ায় যে মানুষটার প্রতিবিম্ব হাই পাওয়ারের চশমার আড়ালে দাঁড়িয়ে আমার দিকে চেয়ে আছে তাকেই বরং ঘষা কাঁচের মত অস্পষ্ট আর অচেনা লাগে।

ওদেরকে দেখতে দেখতে আমি বৃষ্টি দেখতে থাকি। আরো অনেক স্মৃতি কাকভেজা হয়ে বেরিয়ে আসে। বিথির সাথে পরিচয়ের প্রথম দিনটার কথাও আমার মনে পড়ে।

আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের থার্ড ইয়ারে পড়ি। টিউশনি শেষে সন্ধ্যার দিকে হন্তদন্ত হয়ে ফিরছি। আকাশ মন খারাপ করে ছিল সেদিন। কষ্ট সইতে না পেরে যে কোন সময় কান্নায় ভেংগে পড়বে। আমি মনে মনে ভাবছি- একটু রসো বাছা। এই মাঝপথে তোমার কান্না যেন শুনতে না হয়। আরেকটু সামলে রাখো।

আকাশটা যে আমার কথা একটুও মন দিয়ে শোনেনি সামনের গলির মোড় পার হবার আগেই সেটা বুঝিয়ে দিল। সবাই এদিক ওদিক দৌড়োচ্ছে মাথা বাঁচাতে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো রাস্তা ফাঁকা হয়ে গেল। শুধু আমি ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলাম মাঝ রাস্তায়। আর হ্যা,রাস্তার পাশের ইলেক্ট্রিক তারের উপর কয়েকটা কাকও বসে ছিল। আমি আর কাকগুলো মিলেমিশে ভিজতে লাগলাম।

– এই যে শুনছেন?

আমি শুনেও শুনলাম না।রিনরিনে চুড়ির মত কন্ঠটা জামালপুরের অজপাড়াগা থেকে উঠে আসা কোন বোকা সোকা মানুষকে শোনানোর জন্য নিশ্চয়ই বলা হয়নি। আমি চুপচাপ আবার কাকগুলোকে সঙ্গ দিতে লাগলাম।

এরপর মিনিট দুয়েক নীরবতা।আমার চারপাশের পৃথিবীটাকে দ্বিতীয়বারের মত ভুলে গিয়ে বৃষ্টির টুপ টাপ শব্দে ভিজতে লাগলাম।

-এই যে শুনছেন?

চুড়ির রিনরিনে স্বর এবার আমার একেবারে পাশে ফিসফিসিয়ে উঠলো। আমি শিউরে উঠলাম। কিছুটা মাত্র বয়ে যাওয়া ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটায় আর কিছুটা পাশে হঠাৎ করে আবির্ভূত হওয়া মেয়ে কণ্ঠের সাড়া পেয়ে।

পাশ ফিরে তাকাতেই দেখি একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে। মেয়ে না হলেই বরং ভড়কে যেতাম। এরকম সুরেলা কন্ঠ ছেলেদের হবার কথা নয়।
-জ্বী আমাকে বলছেন?
-না তো!!

বলে মেয়েটা জোর করে অবাক হবার ভান করে। আমি বিব্রত মুখে অচেনা মেয়েটার সামনে বোকা বোকা মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকি।

-এভাবে ক্যাবলার মত বৃষ্টিতে ভিজছেন ক্যানো? আমার সাথে চলুন।
মেয়েটা হাত তুলে রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বড়লোক বড়লোক গন্ধমাখা একটা বিল্ডিং এর দিকে ইশারা করে। আমি ইতঃস্তত করতে থাকি।

– না, ঠিক আছে। কোন সমস্যা নেই।
– এখানে দাঁড়িয়ে থাকার সুবিধাটা কোথায় বলুনতো একটু শুনি?

আমি সুবিধার খোঁজে মাথার এপাশ ওপাশ হাতড়াই। বৃষ্টি না থাকলে হয়তো এখন ঘামতে থাকতাম। আমার কেন যেন লজ্জা লজ্জা লাগছিল। অঝোর বর্ষণের চাদরে মুখটা যদি লুকাতে পারতাম। বৃষ্টিটা এত আস্তে পড়ছে ক্যানো?

আমার চেহারার এমন দুর্দশা দেখে বৃষ্টিকন্যা এবার বৃষ্টির মত কলকল করে হেসে ওঠে। সে শব্দ আমাকে বৃষ্টির শব্দের চেয়েও বেশি বিহবল করে দেয়।

আমরা দুজন বৃষ্টিতে ভিজতে থাকি।

সেই উদ্ভট এবং অদ্ভুত বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যার ঘটনার মধ্য দিয়ে বিথির সাথে আমার প্রথম পরিচয়।কথায় কথায় কিছুক্ষণের মধ্যেই জানতে পারলাম ও আমার ইউনিভার্সিটিতেই ফার্স্ট ইয়ারে এবার ভর্তি হয়েছে। এমন কাকতালীয়তায় আমি বেশ আশ্চর্য হই। নিজের অজান্তে বোধহয় একটু খুশিও হয়েছিলাম।

ভার্সিটিতে এরপর নিয়মিত ওর সাথে দেখা হতে থাকে। মাঝে মাঝে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ানোও হয়। এবং আজ পর্যন্ত যে সব রহস্যের সমাধাণ করতে পারিনি তাদের একটি হিসেবে কয়েকদিনের মধ্যে কেমন কেমন করে যেন আমাদের প্রেমও হয়ে যায়। বিথিরা অনেক বড়লোক ছিল।

-এই যে শুনছেন?!!

আমি চমকে পাশ ফিরে তাকাই। আমার বউ কখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে টেরই পাইনি।

-এত মনোযোগ দিয়ে কার কথা ভাবা হচ্ছে শুনি?

আমি কোন উত্তর দেইনা। বোকা বোকা হাসিটা আবার মুখে ঝুলিয়ে দেই।

-খুব বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করছে।ভিজবে?
– হুম্‌।

আমি ডানহাত বাড়িয়ে নিঃশব্দে বউয়ের কাঁধটা নিজের দিকে টেনে এনে ছাদের সিঁড়ির দিকে পা বাড়াই।

অনেক দিন পর আমি আর সুপ্তি ছাদের কার্নিশে ভিজতে থাকা কাকগুলোকে আবার সঙ্গ দিতে যাচ্ছি।

বিথির সাথে আমার এফেয়ারের দ্বিতীয় বছরের মাথায় অস্ট্রেলিয়ান প্রবাসী এক সুযোগ্য পাত্রের সাথে ওর বিয়ে হয়ে যায়।

যতদূর জানি নিজের সংসার নিয়ে ও বেশ সুখেই আছে। বোধহয় আমিও।

Advertisements
This entry was posted in গল্প. Bookmark the permalink.

One Response to বৃষ্টি দিনের গল্প

  1. অগ্নি বলেছেন:

    বা! ভালই তো লিখেছেন!!

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s