২০ অগাস্ট, ২০১৭

আজকের দিনটা খুব বাজে গেল। সকাল বেলায় ঘুম থেকে উঠেই মনে হচ্ছিল আজকের দিনটা আমার জন্য নয়। আর এখন রাতের বেলায় ঘুমোতে যাবার আগে মনে হচ্ছে আমি তখন ভুল কিছু ভাবিনি। বিশ্রী রকমের depressing একটা দিন গেল। সারাটা দিন ব্যাকগ্রাউন্ডে মন খারাপের গান। বহুদিন পর আবার পুরনো দিনের মতো একটা অভিজ্ঞতা হলো। আজকে বেশ কয়েকটা কাজ করার কথা ছিল কিন্তু ডিপ্রেশনের পাল্লায় পড়ে কিছুই করা হয়নি। বিকেল বেলা বাসায় ফিরে ফেসবুকে ঢুকে দেখি আনিস ভাই মারা গেছেন। তার পরপরই আবার পৃথা মেসেঞ্জারে নক করে বলল ওর বন্ধু জয়ী আবার ভীষণ অসুস্থ। ওর ভাষায় – terminally ill. এরকম পরপর দুটো সংবাদের ধাক্কায় বুকের ভেতরটা হুট করে একদম ফাঁকা হয়ে গেল। জীবন নিয়ে মাথার ভেতরে ঘুরতে থাকা অন্যমনস্ক, চিরাচরিত প্রশ্নগুলো বর্ষার কালো মেঘের মত আকাশ ভারী করে জেঁকে বসলো আবার। কি অদ্ভুত একটা জীবন আমাদের। সামনে যত এগোই চলে যাওয়া মানুষের লিষ্টি কেবলই দীর্ঘ হচ্ছে। গত দু’বছরে জীবন থেকে খুব কাছের কিছু মানুষের চলে যাওয়া দেখতে হয়েছে। পার্থিব মোহ তবুও যে কেন ছেড়ে যেতে যেতে যায়না। মনটা এতো বেশি স্বার্থপর! স্বার্থপর বলেই হয়তো প্রতিদিন একশো বার করে মরে যেতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত আরো একটা দিন বেশি বেঁচে থাকা হয়। জীবনটা যে আসলে কি মরে যাওয়ার আগে পর্যন্ত হয়তো কখনোই জানা হবে না।

জীবন, তুমি বড় অদ্ভুত। মরণের চেয়েও।

Posted in Uncategorized | মন্তব্য দিন

১৮ অগাস্ট, ২০১৭

আজ সারা রাত ঘুমটা কেমন ছাড়া ছাড়া হল। স্বপ্ন আর বাস্তবতা সব সময় যেন চোখের পাতায় জড়াজড়ি করে ছিল। একবার মনে হয় জেগেই আছি তো আরেকবার মনে হয় স্বপ্নের দেশে। চোখের পলকে রাতটা কেটে গেল। কিন্তু ভালো ঘুম হলে মনের ভেতরে কিংবা শরীরে যে শান্তি শান্তি ভাব আসে সেটা ছিল কোন দূরের দেশে। flashback এর মতো ছেঁড়া ছেঁড়া দৃশ্যকল্প মাথার ভেতরে ঘুরে বেরিয়েছে সারারাত। আমি বিছানায় এপাশ করি,ওপাশ করি, তবুও সে সব দৃশ্যকল্প আমাকে ছেড়ে গেল না। এরকম একটা রাত পার করার পর যা হয়, সকাল বেলা নিজেকে একজন বিকারগ্রস্ত মানুষের মত লাগে। অথচ রাত একটা কখন সকাল সাড়ে নয়টা হয়ে গেছে তার কিছুই বুঝতে পারিনি।
ঘুম হোক কিংবা জাগরণ, সময়গুলো কেমন দৌড়ে দৌড়ে চলছে। মাথার ওপরে ঘুরছে deadline, অথচ সেই কাজগুলো শেষ করার আগ্রহ পাচ্ছি না। এই বয়সেই যদি জীবনের উপর এমন বৈরাগ্য এসে পড়ে তাহলে তো মুশকিলের কথা!

Posted in Uncategorized | মন্তব্য দিন

১৭ অগাস্ট, ২০১৭

একটা মজার ব্যাপার হয়েছে। gboard নামে একটা android keyboard আছে। সেটা দিয়ে রীতিমতো ভয়েস টাইপিং করে বাংলা লেখা যাচ্ছে গতকাল থেকে। আজ সকাল বেলা যখন এই এপটার খোঁজ পেলাম এটার একুরেসি দেখে ভীষন অবাক হয়েছি। সাথে সাথে মনে হল আমার মত অলস মানুষদের জন্য এটা একটা চমৎকার উদ্ভাবন। এখন চাইলেই রাতের বেলা ঘুম না আসলে বিছানায় শুয়ে শুয়ে সারাদিনের দিনলিপি লিখে ফেলা যাবে। আর সেই প্রচেষ্টাতেই এখন শুয়ে শুয়ে আজকের দিন লিপি লিখছি।

গত কয়েক দিনের মত আজ সকালে বৃষ্টি হয়নি। সকালবেলা বেরোনোর আগে আকাশের এক কোনায় হালকা একটু মেঘ জমেছিল। কিন্তু ঠিক মত জমে ওঠার আগেই মেঘ গুলো কোথায় যেন আবার চলেও গেল। অনেক দিন ভোর বেলায় ওঠা হচ্ছে না। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এলার্ম বন্ধ করে দিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়েছি।

আজকাল ক্যাম্পাসে যাওয়ার পথে ভীষণ বিরক্তিকর জ‍্যাম পরে। মাঝে মাঝে মনে হয় সাইকেল ছাড়া গেলে মন্দ হত না। কিন্তু যখন এত ভিড়বাট্টা চোখে পড়ে তখন জ্যামের কথা চিন্তা করে সে চিন্তা মাথা থেকে চলে যেতে বেশি সময় লাগে না। তবে আজকাল সাইকেল চালাতে গিয়ে কোন অনুভূতি কাজ করে না। ট্র্যাফিক জ্যাম যতই হোক না কেন মোটামুটি autopilot মোডে এখন সাইকেল চালাতে পারি। কারওয়ান বাজারের রাস্তায় ছয় নম্বর বাসের পাশাপাশি সাইকেল চালাতে চালাতে মাথায় হয়তো ঘুরে ফেরে জীবনানন্দ অথবা রবীন্দ্রনাথ। এটা পড়ে কেউ হয়তো ভাবতেই পারে কি বিপদ জনক কথাবার্তা বলছি। কিন্তু আদতে ব্যাপারটা আসলে এমন কিছু নয়। সাইকেল চালাতে চালাতে এমন একটা অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে যে সাইকেলটাকে এখন নিজের শরীরের অংশ বলেই মনে হয়।

বিকেলবেলা পৃথা আর শান্ত ভাইয়ের জন্য আইসিএসএফ এর একটা গেট টুগেদার ছিল। ঢাকার প্রায় সবাই এসেছিলেন। ধানমন্ডিতে “উঠান” নামে একটা restaurant আছে। আমরা সবাই সেখানে জড়ো হয়েছিলাম। আমি ক্যাম্পাস থেকে যাওয়ার পথে ভুল করে প্রায় আসাদ গেট পর্যন্ত চলে গিয়েছিলাম। তারপর gps যখন আমাকে বলল সেই কথা আমি তখন আবার পিছন ফিরে ধানমন্ডি সাতাশ এর দিকে যেতে লাগলাম। সাড়ে পাঁচটায় উঠানে পৌঁছে দেখি প্রায় সবাই চলে এসেছে। আজকের গেট টুগেদারটা ছিল মূলত দুই পৃথা আর শান্ত ভাই এর জন্য। বড় পৃথা আপু আজ রাতেই uk চলে যাচ্ছে। ছোট পৃথারা যাবে আটাশ তারিখে। আন্দালিব ভাইএর সাথে বেশ অনেকদিন পর আড্ডা হল। পৃথার সাথেও। ওর সাথে আমার সব সময় অনলাইনে কথা হতো। সেদিকটা ভাবলে ও কানাডা চলে যাওয়ার পরও ওর সাথে কথা হওয়ার কথা ছিল ‌। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ও কানাডা চলে যাওয়ার পর ওর সাথে কথাও কমে গেছে। আপাতদৃষ্টিতে যদিও মনে হয় দূরত্ব তেমন কোনো প্রভাব ফেলে না কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ভিন্ন কিছু। যাই হোক আজকের বিকেলটা বেশ ভালোই কাটলো সবার সাথে। আড্ডা শেষে আমি, নাবীল ভাই,সুমন ভাই আর বীনা আপু চার জন মিলে গেলাম নতুন একটা বইয়ের দোকানে। দোকানের নাম হলো “নোকতা”। মালিকের সাথে কথা বলে বেশ ভালো লাগলো। শিল্পী মানুষ। ইবুক আর কিন্ডলের যুগেও লোকটার মনে কাগজের বইয়ের দোকান দেয়ার স্বপ্ন। এমন স্বপ্ন দেখতেও আজকাল অনেক সাহস লাগে। দোকানটা officially এখনো শুরু করেনি। বললেন আরও সপ্তাহ খানেক মত লাগবে। এখনো সব বই চলে আসে নি। তবে দোকান টা একটু ভেতরের দিকে পড়ে গেছে। আগে থেকে না জানা থাকলে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। দোকানটাতে visual art এবং ছোটদের বই বেশি। অবশ্য মালিক নিজেও বললেন তাদের এ দুটোর ওপরেই জোর দেয়ার ইচ্ছে। যেটাই হোক এই ছন্নছাড়া শহরে আরো একটা বইয়ের দোকান বাড়লো এটাই বড় কথা।

বই দেখে টেখে বাড়ির পথে রওনা দিলাম আটটার দিকে। বাসায় এসে জামান এর সাথে কথা হলো।আজ রব্বানী স্যার ও জামানের জুনায়েদ আহমেদ পলকের সাথে দেখা করার কথা ছিল, আমাদের স্টার্টআপের বিষয়ে। জামান বলল মিটিং বেশ পজিটিভ ছিল। আমরা হয়তো একটা বড় অঙ্কের টাকা এবং একটা জায়গা পেয়ে যাব। যদিও সামনের দিকে তাকালে একটা অনিশ্চয়তার চাদর দেখতে পাই তারপরও আমাদের কয়েকজনের ভেতরে লালন করা স্বপ্নটা আস্তে আস্তে একটা বাস্তব রূপ পাচ্ছে মনে হচ্ছে। সেই স্বপ্ন শেষমেষ দেখা যাক কোথায় নিয়ে গিয়ে আমাদের দাঁড় করায়। দিনশেষে এই ছেঁড়া ছেঁড়া স্বপ্নগুলোইতো পরের দিনের সূর্য দেখতে চাওয়ার আকাঙ্খাটুকু জিইয়ে রাখে। তাই নয় কি?

Posted in Uncategorized | মন্তব্য দিন

২৭ জুন, ২০১৭

এখনকার ঈদগুলো রঙ হারাতে হারাতে এমন বিবর্ণ হয়ে গেছে! কে বলবে এই ঈদের জন্য, চাঁদ রাতে ঘুরে বেড়ানোর জন্য একসময় কী রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার প্রহর পার করতাম! গতকাল ঈদ গেল। ঈদের কথা ভাবতে গেলে প্রথম যেটা মনে ভেসে ওঠে সেটা হচ্ছে আব্বার সকাল বেলার ডাকাডাকি। ছোটবেলার বেশিরভাগ ঈদগুলো শীতের দিকে পেয়েছি বোধহয়। কারণ পেছনে ফিরে চাইলে যে দৃশ্যটা মনে পড়ে বেশি তা হচ্ছে আমি লেপমুড়ি দিয়ে শুয়ে আছি, গভীর ঘুমে মগ্ন। ব্যাকগ্রাউন্ডে আব্বার ডাকাডাকি শোনা যাচ্ছে না শোনার মত করে। আম্মাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলছে ঈদের সকালে এতক্ষণ ধরে কেন বিছানায় আমি। নামাযটা নির্ঘাত মিস করবো। এত অলস হয়ে জীবনে কী করবো। ইত্যাদি ইত্যাদি। গত দুবছর ধরে আব্বাও নেই, কোন ডাকাডাকিও নেই। বড় হবার পর আব্বার সেই ডাকাডাকিটুকু তবুও ঈদের আমেজটুকু ধরে রেখেছিল। এখন বলতে গেলে আর দশটা সাধারণ দিনের মতই লাগে। ছোটবেলার পূর্ণদৈর্ঘ্য রঙিন ছবি এখন একদম সাদাকালো।

ঈদের দিন সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই সুবর্ণ’র মুখোমুখি। বড় বড় চোখ দুটো গভীর চিন্তামগ্ন হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলো – “আচ্ছা মামা, পাখিদের কি কোন ঈদ নেই? ওরা ঈদের দিন কোন আনন্দ করেনা?” বরাবরের মতই ওর এই গভীর দার্শনিক প্রশ্ন আমার মুখে হাসি ফোটায়। আমি হেসে বলি – “না। ওদের জন্য সবদিনই ঈদের দিন। দেখোনা প্রতিদিন ওরা কী আনন্দ নিয়ে পুরো আকাশজুড়ে ঘুরে বেড়ায়?!”

নামায পড়তে গিয়ে দেখি ঈদগাহ মাঠের ডানের এক তৃতীয়াংশ ছায়াঢাকা। বাকিটুকুতে কটকটে রোদ। ধর্মপ্রাণ মানুষজনের সিংহভাগ রোদের অংশটুকু খালি রেখে কেবল ছায়ার অংশটুকুতে বসে আছে। দেখে আমার হাসি আসে। নাস্তেক বোলগার হলেও আমি রোদভরা অংশটুকুর দিকেই পা বাড়াই। দ্বিতীয় কাতারে বসে ইমাম সাহেবের বয়ান শুনি। রোযা না রাখলে কী কঠিন কঠিন সব অভিনব উপায়ে শাস্তি পেতে হবে সেসব বেশ গ্রাফিকাল ওয়েতে ইমাম সাহেব একের পর এক বর্ণনা করে যান। বলতে বলতে দেখি তার চোখমুখ কেমন টকটকে, কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সেটা রোদের তীব্রতায়, নাকি বেরোজদারদের প্রতি নাখোশ হবার কারণে, ঠিক বুঝতে পারিনা। আমি মাথা নিচু করে পিঠের ওপর থেকে নিচে নামতে থাকা ঘামের বিন্দুদের গভীর মনোযোগে অনুসরণ করতে থাকি মনে মনে।

নামায শেষ করে বাসায় এসে জামা কাপড় পরিবর্তন করে সরাসরি বিছানায় উঠলাম। সঙ্গী সেই পুরনো সুহৃদ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। পায়ের তলায় সর্ষের অনুভূতি নিতে নিতে কখন ঘুমিয়ে গেছি টের পাইনি। উঠে মোবাইল স্ক্রীণে তাকিয়ে দেখি আড়াইটা বেজে গেছে। আজকাল ঘুমোলেও মাথাটা ঠিক নির্ভার হচ্ছেনা। বরং কেমন ভারী হয়ে থাকে সবসময়। অনুভূতিটা খুব অস্বস্তিকর। পিএইচডির চিন্তা মাথায় বেশ ভালোভাবেই ভূতের মত চেপে আছে, বুঝতে পারছি। কিন্তু এটাকে কিভাবে চ্যাংদোলা করে মাথা থেকে নামানো যায় সে উপায় এখনো ভেবে বের করতে পারিনি। বিছানা থেকে উঠে হাতমুখ ধুলাম। নিচে নেমে খেয়ে ভাবতে লাগলাম কী করা যায় এরপর। ওদিকে আপু আমাকে সহ সুবর্ণ, আদীবাকে ঝাড়ি দিচ্ছে। ঈদের দিনে ঘরের ভেতর এরকম ঝিমাচ্ছি দেখে। আপু বললো পিচ্চিদের নিয়ে বাইরে থেকে ঘুরে আসতে। আমি রোবটের মত বললাম – আচ্ছা। তারপর বিকেলের দিকে আমরা চারজন বেরোলাম, আমি, ভাইয়া, সুবর্ণ, আদীবা। মাঝপথে সুবর্ণর বান্ধবী জারা জুটলো আমাদের সাথে। কলেজের পুকুরপাড়ে গিয়ে দেখি দুটো ইনফ্ল্যাটেবল নৌকা ভাসছে এককোণায়। আর তার কাছে পিচ্চিদের ভীর। লাইন ধরে দুইজন করে নৌকায় উঠছে, কিছুক্ষণ পুকুরের একপাশে এদিক ওদিক ভেসে থাকার পর পরের দুইজন উঠছে। প্রথমে ভাবলাম কেউ হয়তো টাকার বিনিময়ে করাচ্ছে ওসব। পরে জানা গেল বিদেশ ফেরত কেউ একজন ফেরার সময় রাবার বোট দুটো নিয়ে এসেছে। উনিই পিচ্চিদেরকে নৌকায় তুলে ঘুরাচ্ছেন। সুবর্ণ, জারা-কে দেখে বোঝা গেল তাদের উঠতে মন চাচ্ছে। ভাইয়া ওদেরকে নিয়ে গেল সামনে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর ওরাও নৌকায় উঠলো। দেখে বোঝা যাচ্ছিল বেশ মজা পাচ্ছে ওরা। যাক, অন্তত ওদের ঈদ আমার মত বোরিং হচ্ছেনা তাহলে একদম! নৌকাপর্ব শেষে কৃষিফার্মের দিকে এগুতে লাগলাম আমরা। পথে পিচ্চিদেরকে আইসক্রীম কিনে দেয়া হলে। সাথে আমাকেও! আমরা আইসক্রীম খেতে খেতে কৃষিফার্মের কোয়ার্টারের দিকে হাঁটতে লাগলাম। ওখানে আপুর এক কলিগ থাকেন কোয়ার্টারে। বাসার সামনে দোলনা আছে, খেলার মাঠ আছে। পিচ্চিরা দোলনায় চড়বে। তাই যাওয়া। আমার সরকারি সব কোয়ার্টারের মত এই কোয়ার্টারটাও ভালো লাগে। বারদুয়েক গিয়েছি আগেও। কোয়ার্টার এরিয়াতে ছিমছাম,সটান দাঁড়িয়ে থাকা লাল ইটের বিল্ডিং, বাধানো রাস্তা, মাঠে কলোনীর ছেলেমেয়েদের হৈচৈ – এই পরিচিত দৃশ্যগুলো দেখতে ভালো লাগে। চারপাশ বেশ শান্ত আর নির্ভাবনাময় একটা দৃশ্যকল্প ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে মনে হয়। ফাতেমা আপা দোলনাতেই বসে ছিলেন তার কয়েকমাসের পিচ্চিটাকে নিয়ে। নাম জিজ্ঞেস করলাম, বললেন আফরীন। বাবার নাম “আরিফ” এর সাথে মিলিয়ে রাখা। পিচ্চিটা গম্ভীর মুখে পৃথিবীর সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিল। মোটাসোটা, গোলগাল একটা নরোম বলের মত মানবশিশু। দেখে মনটা এমনিতেই হাসিহাসি হয়ে ওঠে। সুবর্ণরা দোলনায় দোল খাচ্ছিল, আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাঠে ছেলেদের ক্রিকেট খেলা দেখছিলাম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। শেষ কবে ক্রিকেট খেলেছি মনে করার চেষ্টা করলাম। উত্তর খুঁজে পাওয়ার আগেই সজোরে মারা একটা বল আমার দিকে আসতে লাগলো। আমি রিফ্লেক্স থেকেই পুরনো অভ্যাসে ক্যাচ ধরার চেষ্টা করলাম। বলটা হাত ফসকে বেরিয়ে গেল। কোন কারণ ছাড়াই বিব্রত লাগলো একটু। যখন খেলতাম তখন লং অনে ফিল্ডিং করেছি অনেক। হাই ক্যাচ বেশ ভালো ধরতে পারতাম। সেই পুরনো দিনের ক্ষিপ্রতা বা স্কিল দীর্ঘ দিনের অনভ্যাসে এতদিনে হারিয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু হয়তো মনের গভীরের কোন অংশ যুক্তিহীনভাবে আশা করছিল সবকিছু এখনো হারিয়ে যায়নি। সে ভুল ভাঙার বেদনা নিয়ে বলটা কুড়িয়ে আবার ফেরত পাঠালাম ফিরতি থ্রো তে। ততক্ষণে বেশ সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। চারপাশের আলো ঝুপ করে কমে যাচ্ছে। ফাতেমা আপার বড় ছেলে ক্রিকেট খেলা শেষে ফিরে এসেছে। ওর সাথে আগেও একবার দেখা হয়েছে, শেষবার যখন ওদের বাসায় এসেছিলাম। এবার চিনতে পারেনি। চেনার কথাও না অবশ্য। ছোটবেলার জগতের দৃশ্যপট খুব দ্রুত এক পর্ব থেকে আরেক পর্বে চলে যায়। ও ওর বন্ধুর সাথে একটা সেভেন আপের প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে ফুটবল খেলছিল রাস্তার ওপর। আমিও যোগ দিলাম এগিয়ে গিয়ে। তিনজন মিলে মিনিট পনেরো খেলেই একদম ঘেমে নেয়ে একাকার। ততক্ষণে সন্ধ্যা পুরোদমে হাজির হয়ে গেছে। রুবাইয়াতের বন্ধু বাসায় ফিরে গেল। সন্ধ্যার শেষ আবীরটুকুও মুছে যাচ্ছে, আমি ঘামে ভেজা হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি। পাশের পানির ট্যাপে হাত মুখ ধুয়ে নিলাম। তারপর তিনতলায় ফাতেমা আপার বাসায় গেলাম। আমার আগেই পিচ্চিরা চলে গিয়েছিল। আমি খেলার জন্য থেকে গিয়েছিলাম। তার আগে কিছুক্ষণ দোলনায় দোল দিয়েছি ওদেরকে। জারাকে দেখে বোঝা যাচ্ছিল সে খুব মজা  নিয়ে দোল খাচ্ছে দোলনায়। একটু পরপর দু বান্ধবী মিলে খিলখিল করে হাসছিল। পুরো বিকেল আর সন্ধ্যা তাদের বেশ ভালো কেটেছে। তাদের ছোটাছুটি, আর উচ্ছাসই বলে দিচ্ছিল সে কথা। ফেরার পথে একজন আরেকজনকে বলছিল – আজকের ঈদে খুব মজা হলো, তাইনা? আমি শুনে মনে মনে হাসলাম। ছোটবেলার চাওয়া পাওয়াগুলো কি সামান্য অথচ কত সহজেই না মন ভরিয়ে দেয়! আমি এই ছেলেবেলা, আর এইসব আনন্দময় সরলতা বহু আগেই পেছনে ফেলে এসেছি।

জারার মা বারবার ফোন দিচ্ছিল ওকে বাসায় চলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ও চাচ্ছিল আরো কিছু সময় সুবর্ণর সাথে কাটাতে। শেষমেষ আপু ফোনে সে কথা বলে দিলো ফোনে জারার মা কে। দুজন মিলে বাসায় এসে দেখি কাপড় চোপড় খুলে খালি গায়ে হারমোনিয়াম নিয়ে বসেছে। একটু মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করে দেখলাম সুবর্ণ নির্ভুলভাবে সারেগামা বাজাচ্ছে। আপুকে জিজ্ঞেস করতে বললো আদীবা ওকে শিখিয়েছে। কয়েকবার দেখিয়ে দেয়ার পরেই নিজে থেকে সারেগামা বাজাতে পারে এখন। আমি আপুকে বললাম ওকে গানের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিতে। আপু বললো – দেখি। আমার কাছে মনে হয়েছে মিউজিক ব্যাপারটা ওর ভেতর সহজাত। একটু গাইডেন্স পেলে বেশ ভালো করবে গানে। দেখি আবার আপুকে বলে দেখবো পরে।

রাতের বেলা বাইরে একটু বৃষ্টির আভাস। বাইরে শব্দ পাচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিল বৃষ্টি নামবে জোরে জোরে যে কোন সময়। আমি বিছানায় তখন শুয়ে আছি। সুবর্ণ জানালার গ্রীলে গাল ঠেকিয়ে বাইরের অন্ধকারে তাকিয়ে আছে। শব্দের জের ধরে বৃষ্টিকে দেখার চেষ্টা বোধহয়। কিছুক্ষণ পরে আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে হঠাৎ বলে উঠলো – “মামা, তুমি কি বৃষ্টির গন্ধ বুঝতে পারো?” তারপর উত্তরের অপেক্ষা না করে নিজে নিজেই বলে উঠলো – “আমি পারি।” এই বলে পাশের রুমে চলে গেল।

আমি শব্দহীন হয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে তারপর বৃষ্টির গন্ধ বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম।

 

 

 

 

 

Posted in দিন লিপি | মন্তব্য দিন

২৫জুন, ২০১৭

বাসায় এসেছি ২২তারিখে।

বাসায় এসেছি লেখার পর মনে হলো এটাতো আসলে আমার আপুর বাসা। আব্বা থাকার সময় প্রতিবছর ঢাকা থেকে ঘাটাইলে যেতাম ঈদের সময়। সেটা বাসা ছিল। ঢাকার সীমানা পার হতে হতে মনে হতো আমি এখন নিজের বাসার সীমানার কাছাকাছি এগিয়ে যাচ্ছি। গত দু’বছর হলো আমার আর যাওয়ার বাসা নেই। ঢাকার বাসাটাই এখন নিজের বাসা হয়ে গেছে। বোঝা গেল দুটো বছরও নতুন করে বাসার ঠিকানা এডিট করার জন্য খুব কম সময়।

ওকে, আপু বাসায় এসেছি ২২তারিখে। উপলক্ষ ঈদের ছুটি। ইনফ্যাক্ট যে কোন ছুটিছাটায় আমার যাওয়ার জায়গা হচ্ছে আপুর বাসা। নতুন বাসায় উঠেছে ও এবছরই। মাসখানেক হয়ে গেল। এ বাসাটা আমার বেশ পছন্দের। সবকিছুতেই নতুন বইয়ের মত আনকোরা এক গন্ধ। নতুন যে কোন কিছুই কার না ভালো লাগে। আমি আসলে আম্মার রুমটায় থাকি, আম্মার সাথে। প্রচুর আলোবাতাস খেলে রুমটাতে। বিছানায় শুয়ে দুপাশে আকাশ দেখা যায়, জানলার পাশে গাছের সবুজ সতেজ পাতাগুলো বাতাসে নুয়ে পড়ে হাই হ্যালো বলে নিয়ম করে। আমার বেশ ভালো লাগে এ রুমটা। এ রুমটায় অনেক আলো, বাতাস আছে। আর আছে আম্মা। আমি যত বড় হয়েছি আম্মার সাথে থাকার ফ্রিকোয়েন্সি ততই কমে এসেছে। অথচ মনে পড়ে, ক্যাডেট কলেজে যাওয়ার আগে প্রতিরাতে আম্মার সাথে জড়াজড়ি করে, একটা পা আম্মার ওপর না তুলে দিয়ে কখনো ঘুমাতে পারতাম না। আমার ঘুমের জন্য আম্মার গায়ের গন্ধ লাগতো, আম্মাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকা লাগতো। অথচ সময়ের সাথে সাথে আমার সে অভ্যাস কীভাবে একটু একটু করে পাল্টে গেছে, নিজেও বুঝে উঠতে পারিনি ঠিকঠাক।

২২তারিখ ঢাকার বাসা থেকে বের হয়েছি একটু দেরি করে। এনা’র কাউন্টারে এসে দেখি লাইন তখনো খুব বেশি বড় হয়নি। তাই দাঁড়িয়ে গেলাম পেছনে। বিশ পঁচিশ মিনিট অপেক্ষা করা যেতেই পারে। বাস ছাড়ার পরই আমি ঘুমিয়ে গেছি কখন টের পাইনি। যখন ঘুম ভেঙে গেল তখন গাজীপুর ছাড়িয়ে গেছে বাস। একটু সজাগ হতেই টের পেলাম বাস মোটামুটি উড়ে চলছে। নিজের অজান্তেই আমার পা দুটো সামনের সীটের পাদানি তে রাখলাম হঠা ব্রেক কষলে যেন সামলে নিতে পারি। ড্রাইভার সাহেব কোন কিছুরই তোয়াক্কা করছিলেন না, বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার, সামনে যা কিছু আসছিলো সবকিছু সাঁই সাঁই করে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিলেন। পাশ কাটানোর সময় যখন স্পীড বাড়িয়ে দিচ্ছিলেন পেটের ভেতর কেমন হালকা অস্বস্তিকর একটা অনুভূতি হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল গ্র্যাভিটির মান একটু খানেক কমে যাচ্ছে যেন। মাঝে নামলো বৃষ্টি। শঙ্কা বেড়ে গেল একটুখানি। তবু ভালোভালোয় একসময় ময়মনসিংহ পৌঁছলাম কোন অঘটন ছাড়া। ড্রাইভারের প্রিয় গান মনে হয় – মানুষ আমি আমার কেন পাখির মত মন?!

ময়মনসিংহ পৌঁছে সিএনজিতে উঠলাম জামালপুরে আসার জন্য। ময়মনসিংহ-জামালপুর রোডটা এই কয়মাসে জঘন্য হয়ে গেছে একদম। মুক্তাগাছায় পৌঁছে দেখি সেখানে ঢাকার মত বিশাল জ্যাম পড়ে গেছে। সিএনজি ড্রাইভার দুইনম্বরি করে ডাবল লাইনে না এগোলে বহুক্ষণ সেই জ্যামে বসে থাকতে হতো। অবশ্য ডাবল লাইনে এগোতে গিয়ে কমপক্ষে দুইবার ট্রাকের সাথে সংঘর্ষের একটা অবস্থা তৈরি করে ফেলেছিলেন ড্রাইভার সাহেব। ড্রাইভার লোকটা বেশ চিকন বুদ্ধির মানুষ। নিজে যখন ডাবল লাইনে এগোচ্ছিল তখন সেটা নিয়ে তার কোন বিকার নেই। আবার অন্য একজন যখন ডাবল লাইনে তাকে ক্রস করতে যাচ্ছিল, বেশ ইমোশনাল এংগেলে তাকে বেশ ধুইয়ে দিলো ড্রাইভার। আমি মনে মনে ভাবলাম – এরচে ভালো কোন উদাহরণ দিয়ে বাঙালির চরিত্র বোঝানো যাবেনা।

আমি বাসায় আসবো বলে সুবর্ণ আগের দিন থেকেই ফোন দিচ্ছিল বারবার কখন পৌঁছবো জানতে। আমি মোবাইল স্ক্রীনে আম্মার নাম দেখে ফোন ধরে বলি – হ্যালো, আম্মা। ওপাশ থেকে দাঁত পড়া চিকন সুরে শোনা যায় – আমি তোমার আম্মা না, আমি সুবর্ণ! এই পিচ্চিটা কখন যে আমার ওপর এত ন্যাওটা হয়ে গেছে নিজেই জানিনা। আমার বাসায় আসার কথা শুনলে সুপার এক্সাইটেড হয়ে যায়। আদীবা আমার এতটা ভক্ত কখনো ছিল বলে মনে পড়েনা। অবশ্য সুবর্ণ আদীবার থেকে সব কিছুথেকেই বিপরীত মেরুতে। আদীবা একটু চুপচাপ। সুবর্ণ অনেক ছটফটে, চঞ্চল। সারাক্ষণ কটকট করে কথা বলে সারা বাসা মাথায় তুলে রাখে। মাঝে মাঝে মনে হয় এই পিচ্চিগুলো যদি এই বয়সেই সারা জীবনের জন্য আটকে থাকতো! কিন্তু সে তো হবার নয়। চোখের সামনে ধেই ধেই করে বড় হয়ে যাচ্ছে। প্রতিবারই কয়েক মাস পর পর বাসায় এসে সে পরিবর্তন টের পাওয়া যায়। এবার এসে দেখি তার সামনের তিনটে দাঁত পড়ে গেছে। আসার সাথে সাথেই সে দাঁত পড়ার গল্প শোনালো আমাকে। দু’টো দাঁত এমনিতেই পড়ে গেছে কোন কিছু না করতেই, আর আরেকটা দাঁত নানুমণি তুলে দিয়েছে। আজ সকালে আমি মাত্র ঘুম থেকে উঠে সোফায় বসে ঝিমোচ্ছি, হঠাৎ টাইলস ফ্লোরের ওপর ধুপধাপ ধুপধাপ। সুবর্ণ সুপার এক্সাইটেড হয়ে রুমে ঢুকে ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বললো – “মামা দেখো, ভাত খেতে গিয়ে আমার আরেকটা দাঁত পড়ে গিয়েছে!” তাকিয়ে দেখি তার ডান হাতের মুঠোর ভেতর একটা নিরীহ দর্শন সদ্য ওঠা দাঁত ভাতের সাথে মাখামাখি হয়ে শুয়ে আছে!

এবার এসে সুবর্ণ সংক্রান্ত আরো নতুন কয়েকটা জিনিস আবিষ্কার করলাম। একটা একটা করে বলি।

গতকাল সন্ধ্যায় দেখি সুবর্ণ বিছানার ওপর বসে বসে কাঁচি দিয়ে পেপার কাটছে। একটু কাছে এসে দেখি প্রথম আলোর ঈদ সংখ্যা থেকে তারকাদের ছবি কাটছে। জিজ্ঞেস করলাম কেন কাটছো। বললো – এমনি, কাটতে ভালো লাগে। একটু পর অবশ্য বললো – এগুলো আপুকে দেব, আপু খুশি হবে! আমি ভাবলাম -হুম! একটা ছেলের ছবি কাটতে কাটতে বললো – মামা, জানো এই ছেলেটা ইংরেজি গান করে। আমি একটু ভালোমত তাকিয়ে দেখি সেটা ওয়ান ডিরেকশনের জেইন মালিকের ছবি! প্লে তে পড়া পিচ্চি জেইন মালিককে কীভাবে চেনে জিজ্ঞেস করতেই বলে – “উটুব!” ইন্টারনেট এর দৌড় কতদূর চলে গেছে! তার এসব কাটাকাটি দেখে আমি তার মাথায় আরেক ভূত চাপিয়ে দিলাম। ওকে বললাম ছোট থাকতে আমিও পছন্দের মানুষের ছবি কেটে একটা সাদা খাতায় আঠা দিয়ে সাঁটিয়ে রাখতাম, সেটাকে স্ক্র্যাপবুকিং বলে। ব্যাপারটা সম্ভবত তার বেশ পছন্দ হয়েছে। আজকে সকালে দেখি তার বাবার কাছে গিয়ে বাসায় আঠা আছে কীনা জিজ্ঞেস করছে। শেষখবর পাওয়া পর্যন্ত সে একটা ডায়রী ম্যানেজ করেছে, কিন্তু আঁঠা এখনো খুঁজে পায়নি।

আরেকটি বড়সড় ঘটনা হচ্ছে সুবর্ণ এখন বানান করে বেশ পড়তে পারে। কেন্দ্রের ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী থেকে ইস্যু করে আনা উপেন্দ্রকিশোরের হাসির গল্প এবার এসে দেখি সে বিছানায় শুয়ে শুয়ে বানান করে করে পড়ছে। আপুকে জিজ্ঞেস করলাম ঘটনা কী। বললো এটাই তার বানান করে পড়া প্রথম বই হতে যাচ্ছে। আমি দেখে বেশ পুলকিত এবং আনন্দিত। এতদিন বই পড়ে শোনানোর জন্য আম্মা আর আপুর কাছে ঘ্যান ঘ্যান করতো। এখন নিজেই বেশ গাম্ভীর্য নিয়ে নিজের বই পড়ছে। দৃশ্যটা অভূতপূর্বতো বটেই, মজারও! যুক্তবর্ণগুলো এখনো ঠিকঠাক বাগিয়ে নিতে পারেনি, তবে খুব বেশি সময় লাগবেনা মনে হচ্ছে। আমার দুই ভাগ্নীই বেশ মনোযোগী পাঠক হয়ে গেছে এরমধ্যেই, এই ব্যাপারটা আমার বেশ ভালো লাগে। ছোটবেলা থেকেই ওদের জন্য বইই কিনে নিয়ে আসতাম বেশি অন্য কোন শিশুতোষ খেলনার চেয়ে। এখন মনে হচ্ছে সেটা বেশ ভালো কাজে দিয়েছে।

আরেকটা ঘটনা যেটা এবার এসে খেয়াল করলাম সেটা হচ্ছে সুবর্ণ বেশ কয়েকটা শব্দে এ কার এর বদলে ই-কার দিয়ে বলে। যেমন: টেবিল কে বলে টিবিল, লেবুকে লিবু, বেগুন কে বিগুন! শুনতে খুউব মজা লাগে। কেউ শুদ্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করেনা অবশ্য! বলুক না। বড় হয়ে গেলে এই ই-কারময় ঘটনাগুলোইতো মধুমাখা হয়ে থাকবে স্মৃতিতে।

সুনীলের “পায়ের তলায় সর্ষে” পড়া শুরু করেছি। পড়তে পড়তে এক জায়গায় এসে জানতে পারলাম “সুবর্ণরেখা” নামে এটা নদীও আছে। এতদিন শুধু ঋত্বিক ঘটকের সিনেমার নাম হিসেবেই জানতাম। তবে নামটা যে ভীষণ সুন্দর সেটা বহু আগে থেকেই জানা হয়ে গেছে!

 

 

 

Posted in Uncategorized | মন্তব্য দিন

আবারও

পৃথিবীর কত কিছু বদলে গেল। জাস্টিন বিবারও দেখতে দেখতে পিচ্চি থেকে বড় হয়ে গেল। অথচ আমার অভ্যাস আর বদলালোনা। কাজ করার চাপ যখন অনেক অনেক বেশি, তার সাথে পাল্লা দিয়ে আসল কাজ ছাড়া যে কোন কিছু করার জন্য মন খালি ছটফট করে। আজকে নিয়ে পরপর তৃতীয় দিনের মত কিছু একটা লিখছি! ভাবা যায়?! হে জিহাদ, তুমি কবে মানুষ হবে।

গত দুইদিন আমি আমার পুরনো ব্লগগুলো বসে বসে পড়লাম। পড়তে পড়তে হাসলাম কখনো হাহাহিহি করে।  কিছু লেখার হাত ধরে পুরনো অনেক স্মৃতি মনিটর ফুঁড়ে এসে হাই হ্যালো বলে গেল। আবার অনেক লেখা পড়ে মনে হলো কত ছেলেমানুষ ছিলাম! কে জানে দশ বছর পর এই ব্লগ পড়ে নিজেকে কী মনে হবে। সময় কী যে দ্রুত চলে যাচ্ছে। ব্যাপারটা খুবই ডিপ্রেসিং। এই কদিন আগেই মনে হলো ২০১৫ এসে গুডমর্নিং বললো। আর দুইমাস পড়েই সে নাকি গুডনাইট বলে ঘুমিয়ে পড়বে। কে বলবে এত দ্রুত আটমাস চলে যেতে পারে! অথচ এই আটমাস এ মনে রাখার মত কী করেছি চিন্তে করতে গেলে অনেকক্ষণ ধরে স্মৃতির বাক্সো খুঁজেও কিছু পাওয়া যায়না। কী বাজেভাবেই না সময় গুলো পার করছি। একটাই তো জীবন, তারও কি নিদারুণ অনর্থক অপচয়! 😦

জুবায়েরের বিয়ের কথা হচ্ছে। ছেলেটা খুব সিরিয়াস ভঙিতে তার বিয়ে সংক্রান্ত নানা জটিলতার কথা হাত পা নেড়ে নেড়ে বর্ণনা করে যায়। অথচ আমাদের শুনে মনে হয় মিরাক্কেলের স্ট্যান্ডআপ কমেডি শুনছি। এই সুযোগে এরেঞ্জড ম্যারিজের টিপিক্যাল জটিলতাগুলো জানা হচ্ছে। জানার কোন শেষ নাই, বলে গেছেন সুকুমার ভাই।

আজকে শেষ রাতের দিকে কেমন হালকা ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছিলো। কাঁথামুড়ি দিয়ে একটা আরামের ঘুম হলো। এবারের বর্ষা কেমন নাছোড়বান্দা আর অভিমানী মেয়ের মত। কিছুতেই আকাশের দরজা ছেড়ে চলে যেতে চাচ্ছেনা। আজকে রাতের হালকা হিমহিমে ঠান্ডায় মনে হলো অভিমানী মেয়ের রাগ ভাঙবে বুঝি অচিরেই। তবে এবারের শীতটা কেমন যাবে জানিনা। গত শীতে ঢাকার আশেপাশে অনেকগুলো সাইকেল ট্যুর দেয়া হয়েছিলো। এবার ইমতিয়াজ কানাডা, আমিন ভাই হাঁটু ভেঙে বিছানায় শুয়ে বসে এপাশ ওপাশ করছে। সাইকেলে কবে চড়তে পারবে আবার তার কোন ঠিক নেই। এহসান ভাইকে ট্যুরে যাওয়ার জন্য গুতালে এহসান ভাই গম্ভীর মুখ করে বোঝানোর চেষ্টা করেন তার বয়স হয়ে যাচ্ছে। সবকিছুই কেমন যেন বেঠিক এবার। সাইকেল ট্যুর না হলে ব্যাপারটা খুব খারাপ হয়ে যাবে। দৌড়ে দৌড়ে বেড়ে যাওয়া বয়েস, কিংবা রেসপন্সিবিলিটি অথবা সামাজিকতার ভুত – এগুলোকে বুড়ো আঙুলখানা দেখিয়েই যেতে হবে যতদিন বেঁচে আছি।

আজকে দুপুরে আরিফ ভাই বেশ সিরিয়াস ভঙিতে এসে জিজ্ঞেস করলো – ভাই, আজকে দুপুরে কী খেতে চান। আমি ততোধিক সিরিয়াস একটা লুক নিয়ে কয়েক সেকেন্ড ভেবে বললাম – খিচুড়ি? আরিফ ভাই, পুতিনের মত আশ্বাসী একটা লুক দিয়ে বললো – ওকে। ঘন্টাখানেক পর খেতে গিয়ে দেখি টেবিলে সায়েন্স ক্যাফেটেরিয়ার বিশ টাকার ভাত, ডালের মত তরকারি কিংবা তরকারি মত ডাল, সাথে যমজ আলুভর্তা। নিজেকে তখন কেমন সব হারিয়ে সর্বস্বান্ত মনে হলো। ফুক ইউ, আরিফ ভাই।

টিপু নতুন একটা সাইকেল কিনেছে। ফনিক্স, দাম উনিশ হাজার পাঁচশত টাকা মাত্র । উচ্চারণটা আসলে ফিনিক্স। কিন্তু ছোট বেলায় ফনিক্স বলে বলেই বড় হইসি। ফনিক্স শব্দটার উপর তাই মায়া পড়ে গেছে। শৈশবের এতটুকু ভুলও কত প্রিয় এখনো।

জামান আজকে উইন্ডোজ টেন ক্লিন ইন্সটল দিলো। এতদিন উইন্ডোজ সেভেন ইউজ করলো। টেনে এসে তার অবস্থা রিকশাওয়ালার হঠাৎ করে শেরাটনে ব্যুফে খেতে যাওয়ার মত হইসে। যা দেখে তাই ভালো লাগে সিন্ড্রোম। তবে উইন্ডোজ টেনটা আসলেই পুরা মাক্ষন বানাইসে। নো ডাউট এবাউট দ্যাট।

১৬,১৭,১৮ তারিখে লালন মেলা কুষ্টিয়াতে। লাফাতে লাফাতে গ্রুপে গিয়ে পোস্ট করলাম সানী ভাইকে মেনশন করে, যাবে কীনা। সে আমাকে শুক্রবারের হাইকোর্ট দেখায়ে প্রত্যাখ্যান করলো। নালায়েক সানী ভাই। তারপর সাজ্জাদকে নক দিলাম। সে ছুটি পাবেনা মর্মে একটা স্যাড স্মাইলি পাঠালো ফেসবুকে। মিস্টারকেও বলবো। তবে খুব একটা আশা দেখছিনা। সে সেলফি তুলে সময় পাচ্ছেনা আজকাল। কুষ্টিয়া সে তো বহুত দূরের পথ। লালনের আকাশে আজ শুধুই দুর্যোগের ঘনঘটা। যাওয়া বোধহয় হচ্ছেনা।

সন্ধ্যেবেলা গেলাম বাটার কিনতে। বাসার পাশে নতুন হওয়া পে লেটার শপে ঢুকলাম। যে কনফেকশনারি থেকে সাধারণত জিনিস কিনি সেই ছেলেটা বাটার নেই বলে না করলো, তাই ওই দোকানে যাওয়া। বাইরে থেকে দেখতে ছোট মনে হয় দোকানটা। এই ক’দিন দেখে টেখে ভাবছিলাম কী দোকান বানাইসে এইটা। মুদির দোকানও তো এর চে বড়। কিন্তু আজকে ঢুকে দেখলাম ভেতরের দিকেও বেশ জায়গা আছে। বাচাল সেলসম্যানের বদৌলতে জানা হলো দোতালায়ও এক্সটেন্ড করবে। সম্ভবত এখনো খুব বেশি কাস্টোমার হয়না। সেলসম্যান দুইজন আমাকে পেয়ে তাই তাদের মনে জমে থাকা সকল কথা প্রথম থেকে বলা শুরু করলো। একবার মনে হচ্ছিল মুখের ওপর বলি – ভাই থামেন। এত কথা বলে কেনার বদলে মেজাজ আরো বেশি খারাপ করতেসেন। কিন্তু তা আর বলা হয়নি শেষমেষ, বলাই বাহুল্য। মানুষ হয়ে জন্মানোর কুফল। কুকুর হয়ে জন্মালে ঘেউ ঘেউ করে দুই বেকুবকেই থামায়ে দিতাম নিশ্চিত।

অনেক কিছু লিখে ফেললাম। নতুন শুরু হিসেবে চিন্তা করলে বেশ ভালো ব্যাপার। এবার টাটা, অন্যদিকে দিলাম হাঁটা ।

Posted in দিন লিপি | মন্তব্য দিন

দশ দশ পনেরো

আমি মানুষ। অন্যান্য মানুষদের মতই আমারও দুইখান হাত, দুইখান পা ইত্যাদি ইত্যদি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের পাশাপাশি স্বাভাবিক নিয়মে একখান মাথাও আছে। আর সেই মাথার উপর বর্তমানে একখানা বড়সড় আকৃতির পাহাড় উঠে বসে আছে। পাহাড়খানা কাজ দ্বারা নির্মিত । বড়ই নাছোড়বান্দা সেই পাহাড়। তবে আমিও কি কম যাই। পাহাড়টারে ঘাড় ধরে মাথা থেকে নামায়ে ব্লগ লিখতে বসলাম। কারণ হঠাৎ মনে হইলো আমার একখান ব্লগ লিখতে হবে। কেন লিখতে হবে সেই ব্যাপারে আমার একমাত্র মাথাকে জিজ্ঞেস করেও তেমন কোন সদুত্তর পাওয়া গেলোনা। তাই আমি ভাবলাম, উত্তর দিয়ে আর কী হবে, যাই বরং একখান ব্লগ লিখি।

পরসমাচার এই যে, এতটুকু লিখার পর আমার মনে হইতেসে, থাক, ব্লগ লিখার দরকার নাই। কিন্তু আসল কথা হইতেসে আমি চাইলেও কিছু লিখতে পারতেসিনা। একটা সময় ছিলো যখন কীবোর্ডখানা চিন্তা করার আগে আগে কতসব শব্দ টাইপ করে ফেলতো। এখন ঠেলেঠুলেও বাটনগুলারে দিয়ে কোন নতুন অক্ষর লিখানো যায়না। আমি যেমন অলস, আমার কীবোর্ডও তেমন কুড়ে। যেমন মালিক, তেমন ভৃত্য। যেমন কুকুর, তেমন মুগুর। নাহ, শেষ প্রবাদটা মনে হয় ঠিক হইলোনা। ঠিক হইলেই বা কী, বেঠিক হইলেই বা কী। তারচে বরং ব্লগ লিখায় মন দেই।

আচ্ছা, আবারো রিফ্রেশ মেরে শুরু করি। পরসমাচার এই যে, আমি ভালো আছি। ওহ ওয়েট, না, আমি আসলে ভালো নাই। কিংবা হয়তো সত্যিই ভালো আছি কিন্তু ব্যাপারটা ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারতেসিনা। কিংবা ভালো-মন্দ দুই মিলিয়েই আছি। আমি বরাবরই কনফিউজড মানুষ। পাখি পাকা পেপে খায়। পেঁপে পাকা পাখি খায়। আমি ভালো আছি, কিংবা আমি ভালো নাই। হোয়াটএভার। সবচে বড় ব্যাপার আমি বেঁচে আছি। আজকাল বেঁচে থাকাটাই বোধহয় ভালো থাকা।

আব্বা মারা গেছেন একমাস দুইদিন হলো। আমার আব্বা, হ্যা আমার আব্বাইতো। এমন একজন মানুষ যাকে নিয়ে কখনো খুব গভীরভাবে দুইমিনিট সময় আলাদা করে কিছু ভাবিনাই। আব্বা কিংবা আম্মা – এই দুইজন আমার কাছে শ্বাস প্রশ্বাস নেয়ার মত। সারাক্ষণই নিচ্ছি, কিন্তু সচেতনভাবে সেটা কখনো ভেবে দেখিনা। দেখিনাই। অথচ গত একমাস দুইদিন ধরে ভেবে টেবেও তাকে আর শ্বাস প্রশ্বাসের মতন স্বাভাবিক বিষয় মনে হচ্ছেনা। আমি ঠিকই অবচেতন মনে নিয়ম মেনে অক্সিজেন নিচ্ছি, আর কার্বনডাইঅক্সাইড ছাড়ছি। কিন্তু আব্বা নিচ্ছেন না। আব্বা চলে গেছেন। সূর্য পূর্ব দিকে উঠে, পশ্চিম দিকে অস্ত যায়। আমি দুই বেলা ভাত খাই, এক বেলা রুটি। ঠিক আগের মত করেই। শুধু মোবাইলে আব্বার নম্বর ডায়াল করলে আব্বাকে আর পাওয়া যায়না। কী অদ্ভুত ব্যাপার। অথচ আব্বা যেদিন মারা গেল সেদিন সবাই কাঁধে হাত দিয়ে বললো – এটাই নাকি স্বাভাবিক। এটাই মেনে নিতে হবে। এখানে অদ্ভুতুড়ে কিছু নাই। আমি মেনে নিতে নিতেও মেনে নিতে পারিনা। আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে আজকাল বড় বেশি। মনে পড়ে বিকেল বেলা আব্বার একটা অাঙুল ধরে কলেজ মাঠের দিকে ছোট ছোট পায়ে হেঁটে চলা সেই ছোট্ট ছেলেটার কথা। যে হঠাৎ করে না চাইতেও এখন বড় হয়ে গেছে। কিংবা হয়তো আরো আগেই বড় হয়ে গিয়েছিলো, টের পেলো মাত্র কিছুদিন হলো। কেননা, শেষ একটা বছর আব্বাই বরং আমার হাত ধরে চলাচল করতো বাইরে গেলে। আমি আব্বার হাত ধরে ধীর গতিতে তাল মিলিয়ে সামনে এগোতাম। হাঁটতে হাঁটতে ছোটবেলার সেই ছোট ছেলেটার কথা মনে পড়তো। বাবার একটা আঙুল ধরে হেঁটে চলা ছোট্ট ছেলেটা। যে ছেলেটা বড় হয়ে গিয়ে অনেকক্ষণ ধরে একটা ব্লগ লিখার চেষ্টা করতেসে। কিন্তু পারতেসেনা।

Posted in জঞ্জাল, দিন লিপি | মন্তব্য দিন