৩১ অগাস্ট, ২০১৭

গতবছর ছোট ঈদের পর থেকে সময়ে অসময়ে এক মায়ের কথা আমার প্রায়ই মাথার ভেতর ঘুরপাক খায়। ঝর্না রাণী নামের সেই মা ঈদের সকালে সেমাই রেঁধে অপেক্ষায় ছিলো কখন তার ছেলে বাড়ি ফিরবে। ছেলে তার বাড়ি ফিরেছিলো ঠিকই, কিন্তু মায়ের হাতের সেমাই আর খাওয়া হয়নি। শোলাকিয়ার ঈদগাহ মাঠের আশেপাশে কোন এক টিনের ঘরের ভেতর অপেক্ষায় থাকা মায়ের মাথা ভেদ করে চলে গিয়েছিলো জঙ্গীর বন্দুক থেকে ছোড়া বুলেট। আমি মাঝে মাঝেই পুরো দৃশ্যটা কল্পনা করার চেষ্টা করি। কল্পনার ভেতরে ঝরনা রাণীর মুখ কখন নিজের মায়ের মুখ হয়ে যায় নিজেও টের পাইনা। মাসখানেক আগে শোলাকিয়ায় যাওয়া হয়েছিলো। এবড়ো থেবড়ো পথে রিকশার ঝাকি খেতে খেতে চারপাশে অজান্তেই চোখ বুলিয়েছি কিছু একটা খোঁজার আশায়। টিনের ঘর চোখে পড়লেই মনে মনে ভেবেছি হয়তো ওটাই সেই মায়ের ঘর। ঝরনা রানী নামে সেই মায়ের মুখ এভাবেই গত একটা বছর ধরে আমার মাথার ভেতর ঘুরপাক খায় কারণে অকারণে।

গত দু’দিন ধরে ‘রুপা’ নামের আরো একটা বিগত হয়ে যাওয়া মানুষের নাম মাথার ভেতরে হুট করে ফ্ল্যাশব্যাকের মত একটু পর পর মনে পড়ে যাচ্ছে। কিছুতেই সরাতে পারছিনা। আজকের পত্রিকার প্রথমপাতা জুড়ে বড় বড় করে অসি বধের আনন্দের খবর। সাকিব আল হাসানের হাস্যোজ্জ্বল মুখচ্ছবি। কিন্তু ডানে কোণায় ছোট করে আসা রুপার ছবির দিকে ভুল করে একপলক নজর চলে গেলেই সব আনন্দ কর্পূরের মত উবে যাচ্ছে মুহুর্তেই।

পত্রিকার পাতায় প্রতিদিন কত শত নৃশংস,বেদনাময় প্রস্থানের খবর আসে। এসব দেখে অভ্যস্ত নির্বিকার চোখ কিংবা মন কেন একজন ঝরনা রাণী কিংবা রুপার কথা আলাদা করে ভাবে সেই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছি গত দু’দিন ধরে, কিন্তু খুঁজে পাচ্ছিনা।

ছোট বেলায় ভাবতাম বড় হলে সব প্রশ্নের উত্তর জানা যায়। আমার বোধহয় বড় হবার এখনো ঢের বাকি।

Advertisements
Posted in দিন লিপি | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

২৯ অগাস্ট, ২০১৭

কাল বাড়ি চলে যাচ্ছি। সৌভাগ্যবশত এবার একটা ট্রেনের টিকিট পেয়েছি শম্পার কল‍্যাণে। এর আগে ঈদের সময় কখনোই ট্রেনে যাওয়া হয়নি। কিভাবেই বা যাব। ঈদের আগে অনলাইনে ট্রেনের টিকেট পাওয়া আর লটারিতে 40 লাখ টাকা পাওয়া একই কথা। বড় ঈদটা আমার কখনোই ভালো লাগে না। ছুটিতে গেলে বাসার মানুষদের সাথে কয়েক দিন থাকা হবে এটাই বড় ঈদের বড় কথা। কাল রাতে লাল বোতাম থেকে ফেরার পর মনটা হুট করে কেন যেন ভীষন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। অনেকদিন এত বেশি মন খারাপ হয় না। তারপর ঘুমহীন চোখে অনেকটা সময় ধরে জানলার বাইরের আকাশটা দেখলাম। দেখতে দেখতে কখন ঘুমিয়ে গিয়েছি টের পাইনি। তারপর সকালবেলা উঠে উপলব্ধি করলাম রাতের বেলা জমে থাকা মন খারাপের মেঘ ভোরের সূর্য উঠতে উঠতে অনেকটাই কেটে গিয়েছে। সাইন curve এর মত অনুভূতির এই ওঠানামা সারা জীবনই বোধহয় চলতেই থাকবে।
বিকেলবেলা শুনলাম প্রীতমের বোন সুইসাইড করেছে। আমি না হয় এক রাতের ঘুমে অনুভূতিগুলো আবার রিসেট করে ফেলেছিলাম। মেয়েটা আর সেই ঝামেলায় যায়নি। একজন মানুষের মনে ঠিক কতটুকু কষ্ট জমা হলে নিজেকে স্বেচ্ছায় শেষ করে দেয়া যায় এই এক জীবনে হয়তবা সেটা কখনোই জানা হবে না, বোঝা হবে না।

শুধু প্রার্থনা করতে পারি- জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

২৭ অগাস্ট, ২০১৭

রাত বাজে সাড়ে তিনটা। অথচ আমার ছোট্ট অন্ধকার রুমটাতে ঘুম বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই। বাইরে অনেকক্ষণ ধরে বৃষ্টি হচ্ছে। গত কয়েক ঘণ্টা ধরে বৃষ্টির গতি একই রকম। কিছু কিছু বৃষ্টি আছে একনাগাড়ে যার শব্দ শুনলে বুকের ভেতরটা শান্ত দিঘির মত টলমল করে ওঠে। এই বৃষ্টিটা ঠিক সেইরকম। মনের সব অস্থিরতা কিছু সময়ের জন্য ছুটি নিয়ে চলে গেছে। ঘুম টাও সাথে চলে গেছে। পেছনে পড়ে রয়েছে শুধু সজাগ দুটো চোখ। গত কয়েকদিন ধরে চোখমুখ বুজে যে পরিমান কাজ করেছি গত কয়েকমাস মিলিয়েও সম্ভবত সেই পরিমান কাজ করি নি। একটু ক্লান্তি এসেছে কিন্তু তার সাথে এসেছে এক রকম পরিতৃপ্তিও। সামনে আরও কয়েক মাসে রকম চোখ মুখ গুঁজে কাজ করে যেতে হবে। ফেব্রুয়ারি-মার্চের ভেতরে যে করেই হোক পিএইচডির নাটাই গুটিয়ে ফেলতে হবে। তারপর কি করব বা কি হবে জানা নেই। আপাতত জানার প্রয়োজন বোধ করছি না। Que sera sera.

জি বোর্ডে ভয়েজ টাইপ করার জন্য একই কথা বেশ কয়েকবার বলতে হচ্ছে। এইটাও মনে হয় বৃষ্টির শব্দ শুনে উদাস হয়ে আছে। technology গত কয়েক বছর ধরে এত দ্রুত গতিতে আগাচ্ছে যে যদি সত্যি সত্যি
উদাসও হয় তাতে অবাক হবার কিছু নেই।

রনি ভাই আজ বাসায় এসেছিল সন্ধ্যার দিকে। বেশ অনেকক্ষণ তিনজন মিলে গল্প করলাম। তারপর একসাথে খেতে বেরোলাম। কোথায় খেতে যাওয়া যায় সেই নিয়ে অনেক জল্পনা-কল্পনার পর ঠিক হলো চায়নিজ খেতে যাব। এ এলাকায় বেশ কয়েকটা চায়নিজ রেস্টুরেন্ট আছে কিন্তু কোনোটাতেই আমরা যাইনি। আর এজন্যই ঠিক করলাম যে আজ ট্রাই করে দেখি কোন টা। প্রথম যেটাতে গেলাম সেটায় সম্ভবত হলুদের একটা অনুষ্ঠান চলছিল। শব্দ বেশি থাকার কারণে কিছুক্ষণ বসার পরেই আবার উঠে বেরিয়ে এলাম। দ্বিতীয়টাতে ঢুকে দেখি চারপাশ কেমন আলো-আঁধারিময়। কিছুক্ষণের জন্য মনে হল ভুল করে কোন বারে এসে পড়লাম কিনা। তবে চারপাশ একটু চোখ বুলাতেই মনে হল এমন মধুর ভুল হবার কোন সম্ভাবনা নেই। বারে আর যাই হোক এত মেয়ে কাস্টমার থাকবে না। আমরা দেখেশুনে কোনার একটা টেবিলে বসলাম। রেস্টুরেন্টের নাম ইয়ান তুন। যে পরিমান খাবার দিয়েছিল তা দিয়ে চারজনের বেশ ভালো মতো ভরে যাওয়ার কথা। আমরা তিনজন তাই সব শেষ করতে পারলাম না। খাবারের স্বাদ খুব ভাল না হলেও বেশ ভালো। এখন থেকে হয়ত মাঝে মাঝে যাব।

রনি ভাইয়ের সাথে দেখা হলেই মিরপুরে দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। সাথে স্বভাবতই মনে পড়ে রায়হান সামিয়ার কথা। আমরা আজ তিনজন কথা বলতে বলতে প্ল্যান করছিলাম আবার কোথায় সবাই একসাথে হওয়া যায়। ঘুরেফিরে nepal ভুটান আর সিঙ্গাপুরের কথাই আসলো। সামিয়াকে বাসায় ফিরে হ‍্যাংআউটে সে কথা বলতেই সেও খুব এক্সাইটেড হয়ে গেল। নিশ্চয়ই একদিন আমরা সবাই পৃথিবীর কোন এক প্রান্তে সেলিম এর চায়ের দোকানের সামনের আড্ডাটার মত একসাথে হব।

4:10 বাজে। এখনো নির্ঘুম। তবুও টাটা।

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

২০ অগাস্ট, ২০১৭

আজকের দিনটা খুব বাজে গেল। সকাল বেলায় ঘুম থেকে উঠেই মনে হচ্ছিল আজকের দিনটা আমার জন্য নয়। আর এখন রাতের বেলায় ঘুমোতে যাবার আগে মনে হচ্ছে আমি তখন ভুল কিছু ভাবিনি। বিশ্রী রকমের depressing একটা দিন গেল। সারাটা দিন ব্যাকগ্রাউন্ডে মন খারাপের গান। বহুদিন পর আবার পুরনো দিনের মতো একটা অভিজ্ঞতা হলো। আজকে বেশ কয়েকটা কাজ করার কথা ছিল কিন্তু ডিপ্রেশনের পাল্লায় পড়ে কিছুই করা হয়নি। বিকেল বেলা বাসায় ফিরে ফেসবুকে ঢুকে দেখি আনিস ভাই মারা গেছেন। তার পরপরই আবার পৃথা মেসেঞ্জারে নক করে বলল ওর বন্ধু জয়ী আবার ভীষণ অসুস্থ। ওর ভাষায় – terminally ill. এরকম পরপর দুটো সংবাদের ধাক্কায় বুকের ভেতরটা হুট করে একদম ফাঁকা হয়ে গেল। জীবন নিয়ে মাথার ভেতরে ঘুরতে থাকা অন্যমনস্ক, চিরাচরিত প্রশ্নগুলো বর্ষার কালো মেঘের মত আকাশ ভারী করে জেঁকে বসলো আবার। কি অদ্ভুত একটা জীবন আমাদের। সামনে যত এগোই চলে যাওয়া মানুষের লিষ্টি কেবলই দীর্ঘ হচ্ছে। গত দু’বছরে জীবন থেকে খুব কাছের কিছু মানুষের চলে যাওয়া দেখতে হয়েছে। পার্থিব মোহ তবুও যে কেন ছেড়ে যেতে যেতে যায়না। মনটা এতো বেশি স্বার্থপর! স্বার্থপর বলেই হয়তো প্রতিদিন একশো বার করে মরে যেতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত আরো একটা দিন বেশি বেঁচে থাকা হয়। জীবনটা যে আসলে কি মরে যাওয়ার আগে পর্যন্ত হয়তো কখনোই জানা হবে না।

জীবন, তুমি বড় অদ্ভুত। মরণের চেয়েও।

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

১৮ অগাস্ট, ২০১৭

আজ সারা রাত ঘুমটা কেমন ছাড়া ছাড়া হল। স্বপ্ন আর বাস্তবতা সব সময় যেন চোখের পাতায় জড়াজড়ি করে ছিল। একবার মনে হয় জেগেই আছি তো আরেকবার মনে হয় স্বপ্নের দেশে। চোখের পলকে রাতটা কেটে গেল। কিন্তু ভালো ঘুম হলে মনের ভেতরে কিংবা শরীরে যে শান্তি শান্তি ভাব আসে সেটা ছিল কোন দূরের দেশে। flashback এর মতো ছেঁড়া ছেঁড়া দৃশ্যকল্প মাথার ভেতরে ঘুরে বেরিয়েছে সারারাত। আমি বিছানায় এপাশ করি,ওপাশ করি, তবুও সে সব দৃশ্যকল্প আমাকে ছেড়ে গেল না। এরকম একটা রাত পার করার পর যা হয়, সকাল বেলা নিজেকে একজন বিকারগ্রস্ত মানুষের মত লাগে। অথচ রাত একটা কখন সকাল সাড়ে নয়টা হয়ে গেছে তার কিছুই বুঝতে পারিনি।
ঘুম হোক কিংবা জাগরণ, সময়গুলো কেমন দৌড়ে দৌড়ে চলছে। মাথার ওপরে ঘুরছে deadline, অথচ সেই কাজগুলো শেষ করার আগ্রহ পাচ্ছি না। এই বয়সেই যদি জীবনের উপর এমন বৈরাগ্য এসে পড়ে তাহলে তো মুশকিলের কথা!

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

১৭ অগাস্ট, ২০১৭

একটা মজার ব্যাপার হয়েছে। gboard নামে একটা android keyboard আছে। সেটা দিয়ে রীতিমতো ভয়েস টাইপিং করে বাংলা লেখা যাচ্ছে গতকাল থেকে। আজ সকাল বেলা যখন এই এপটার খোঁজ পেলাম এটার একুরেসি দেখে ভীষন অবাক হয়েছি। সাথে সাথে মনে হল আমার মত অলস মানুষদের জন্য এটা একটা চমৎকার উদ্ভাবন। এখন চাইলেই রাতের বেলা ঘুম না আসলে বিছানায় শুয়ে শুয়ে সারাদিনের দিনলিপি লিখে ফেলা যাবে। আর সেই প্রচেষ্টাতেই এখন শুয়ে শুয়ে আজকের দিন লিপি লিখছি।

গত কয়েক দিনের মত আজ সকালে বৃষ্টি হয়নি। সকালবেলা বেরোনোর আগে আকাশের এক কোনায় হালকা একটু মেঘ জমেছিল। কিন্তু ঠিক মত জমে ওঠার আগেই মেঘ গুলো কোথায় যেন আবার চলেও গেল। অনেক দিন ভোর বেলায় ওঠা হচ্ছে না। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এলার্ম বন্ধ করে দিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়েছি।

আজকাল ক্যাম্পাসে যাওয়ার পথে ভীষণ বিরক্তিকর জ‍্যাম পরে। মাঝে মাঝে মনে হয় সাইকেল ছাড়া গেলে মন্দ হত না। কিন্তু যখন এত ভিড়বাট্টা চোখে পড়ে তখন জ্যামের কথা চিন্তা করে সে চিন্তা মাথা থেকে চলে যেতে বেশি সময় লাগে না। তবে আজকাল সাইকেল চালাতে গিয়ে কোন অনুভূতি কাজ করে না। ট্র্যাফিক জ্যাম যতই হোক না কেন মোটামুটি autopilot মোডে এখন সাইকেল চালাতে পারি। কারওয়ান বাজারের রাস্তায় ছয় নম্বর বাসের পাশাপাশি সাইকেল চালাতে চালাতে মাথায় হয়তো ঘুরে ফেরে জীবনানন্দ অথবা রবীন্দ্রনাথ। এটা পড়ে কেউ হয়তো ভাবতেই পারে কি বিপদ জনক কথাবার্তা বলছি। কিন্তু আদতে ব্যাপারটা আসলে এমন কিছু নয়। সাইকেল চালাতে চালাতে এমন একটা অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে যে সাইকেলটাকে এখন নিজের শরীরের অংশ বলেই মনে হয়।

বিকেলবেলা পৃথা আর শান্ত ভাইয়ের জন্য আইসিএসএফ এর একটা গেট টুগেদার ছিল। ঢাকার প্রায় সবাই এসেছিলেন। ধানমন্ডিতে “উঠান” নামে একটা restaurant আছে। আমরা সবাই সেখানে জড়ো হয়েছিলাম। আমি ক্যাম্পাস থেকে যাওয়ার পথে ভুল করে প্রায় আসাদ গেট পর্যন্ত চলে গিয়েছিলাম। তারপর gps যখন আমাকে বলল সেই কথা আমি তখন আবার পিছন ফিরে ধানমন্ডি সাতাশ এর দিকে যেতে লাগলাম। সাড়ে পাঁচটায় উঠানে পৌঁছে দেখি প্রায় সবাই চলে এসেছে। আজকের গেট টুগেদারটা ছিল মূলত দুই পৃথা আর শান্ত ভাই এর জন্য। বড় পৃথা আপু আজ রাতেই uk চলে যাচ্ছে। ছোট পৃথারা যাবে আটাশ তারিখে। আন্দালিব ভাইএর সাথে বেশ অনেকদিন পর আড্ডা হল। পৃথার সাথেও। ওর সাথে আমার সব সময় অনলাইনে কথা হতো। সেদিকটা ভাবলে ও কানাডা চলে যাওয়ার পরও ওর সাথে কথা হওয়ার কথা ছিল ‌। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ও কানাডা চলে যাওয়ার পর ওর সাথে কথাও কমে গেছে। আপাতদৃষ্টিতে যদিও মনে হয় দূরত্ব তেমন কোনো প্রভাব ফেলে না কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ভিন্ন কিছু। যাই হোক আজকের বিকেলটা বেশ ভালোই কাটলো সবার সাথে। আড্ডা শেষে আমি, নাবীল ভাই,সুমন ভাই আর বীনা আপু চার জন মিলে গেলাম নতুন একটা বইয়ের দোকানে। দোকানের নাম হলো “নোকতা”। মালিকের সাথে কথা বলে বেশ ভালো লাগলো। শিল্পী মানুষ। ইবুক আর কিন্ডলের যুগেও লোকটার মনে কাগজের বইয়ের দোকান দেয়ার স্বপ্ন। এমন স্বপ্ন দেখতেও আজকাল অনেক সাহস লাগে। দোকানটা officially এখনো শুরু করেনি। বললেন আরও সপ্তাহ খানেক মত লাগবে। এখনো সব বই চলে আসে নি। তবে দোকান টা একটু ভেতরের দিকে পড়ে গেছে। আগে থেকে না জানা থাকলে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। দোকানটাতে visual art এবং ছোটদের বই বেশি। অবশ্য মালিক নিজেও বললেন তাদের এ দুটোর ওপরেই জোর দেয়ার ইচ্ছে। যেটাই হোক এই ছন্নছাড়া শহরে আরো একটা বইয়ের দোকান বাড়লো এটাই বড় কথা।

বই দেখে টেখে বাড়ির পথে রওনা দিলাম আটটার দিকে। বাসায় এসে জামান এর সাথে কথা হলো।আজ রব্বানী স্যার ও জামানের জুনায়েদ আহমেদ পলকের সাথে দেখা করার কথা ছিল, আমাদের স্টার্টআপের বিষয়ে। জামান বলল মিটিং বেশ পজিটিভ ছিল। আমরা হয়তো একটা বড় অঙ্কের টাকা এবং একটা জায়গা পেয়ে যাব। যদিও সামনের দিকে তাকালে একটা অনিশ্চয়তার চাদর দেখতে পাই তারপরও আমাদের কয়েকজনের ভেতরে লালন করা স্বপ্নটা আস্তে আস্তে একটা বাস্তব রূপ পাচ্ছে মনে হচ্ছে। সেই স্বপ্ন শেষমেষ দেখা যাক কোথায় নিয়ে গিয়ে আমাদের দাঁড় করায়। দিনশেষে এই ছেঁড়া ছেঁড়া স্বপ্নগুলোইতো পরের দিনের সূর্য দেখতে চাওয়ার আকাঙ্খাটুকু জিইয়ে রাখে। তাই নয় কি?

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

২৭ জুন, ২০১৭

এখনকার ঈদগুলো রঙ হারাতে হারাতে এমন বিবর্ণ হয়ে গেছে! কে বলবে এই ঈদের জন্য, চাঁদ রাতে ঘুরে বেড়ানোর জন্য একসময় কী রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার প্রহর পার করতাম! গতকাল ঈদ গেল। ঈদের কথা ভাবতে গেলে প্রথম যেটা মনে ভেসে ওঠে সেটা হচ্ছে আব্বার সকাল বেলার ডাকাডাকি। ছোটবেলার বেশিরভাগ ঈদগুলো শীতের দিকে পেয়েছি বোধহয়। কারণ পেছনে ফিরে চাইলে যে দৃশ্যটা মনে পড়ে বেশি তা হচ্ছে আমি লেপমুড়ি দিয়ে শুয়ে আছি, গভীর ঘুমে মগ্ন। ব্যাকগ্রাউন্ডে আব্বার ডাকাডাকি শোনা যাচ্ছে না শোনার মত করে। আম্মাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলছে ঈদের সকালে এতক্ষণ ধরে কেন বিছানায় আমি। নামাযটা নির্ঘাত মিস করবো। এত অলস হয়ে জীবনে কী করবো। ইত্যাদি ইত্যাদি। গত দুবছর ধরে আব্বাও নেই, কোন ডাকাডাকিও নেই। বড় হবার পর আব্বার সেই ডাকাডাকিটুকু তবুও ঈদের আমেজটুকু ধরে রেখেছিল। এখন বলতে গেলে আর দশটা সাধারণ দিনের মতই লাগে। ছোটবেলার পূর্ণদৈর্ঘ্য রঙিন ছবি এখন একদম সাদাকালো।

ঈদের দিন সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই সুবর্ণ’র মুখোমুখি। বড় বড় চোখ দুটো গভীর চিন্তামগ্ন হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলো – “আচ্ছা মামা, পাখিদের কি কোন ঈদ নেই? ওরা ঈদের দিন কোন আনন্দ করেনা?” বরাবরের মতই ওর এই গভীর দার্শনিক প্রশ্ন আমার মুখে হাসি ফোটায়। আমি হেসে বলি – “না। ওদের জন্য সবদিনই ঈদের দিন। দেখোনা প্রতিদিন ওরা কী আনন্দ নিয়ে পুরো আকাশজুড়ে ঘুরে বেড়ায়?!”

নামায পড়তে গিয়ে দেখি ঈদগাহ মাঠের ডানের এক তৃতীয়াংশ ছায়াঢাকা। বাকিটুকুতে কটকটে রোদ। ধর্মপ্রাণ মানুষজনের সিংহভাগ রোদের অংশটুকু খালি রেখে কেবল ছায়ার অংশটুকুতে বসে আছে। দেখে আমার হাসি আসে। নাস্তেক বোলগার হলেও আমি রোদভরা অংশটুকুর দিকেই পা বাড়াই। দ্বিতীয় কাতারে বসে ইমাম সাহেবের বয়ান শুনি। রোযা না রাখলে কী কঠিন কঠিন সব অভিনব উপায়ে শাস্তি পেতে হবে সেসব বেশ গ্রাফিকাল ওয়েতে ইমাম সাহেব একের পর এক বর্ণনা করে যান। বলতে বলতে দেখি তার চোখমুখ কেমন টকটকে, কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সেটা রোদের তীব্রতায়, নাকি বেরোজদারদের প্রতি নাখোশ হবার কারণে, ঠিক বুঝতে পারিনা। আমি মাথা নিচু করে পিঠের ওপর থেকে নিচে নামতে থাকা ঘামের বিন্দুদের গভীর মনোযোগে অনুসরণ করতে থাকি মনে মনে।

নামায শেষ করে বাসায় এসে জামা কাপড় পরিবর্তন করে সরাসরি বিছানায় উঠলাম। সঙ্গী সেই পুরনো সুহৃদ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। পায়ের তলায় সর্ষের অনুভূতি নিতে নিতে কখন ঘুমিয়ে গেছি টের পাইনি। উঠে মোবাইল স্ক্রীণে তাকিয়ে দেখি আড়াইটা বেজে গেছে। আজকাল ঘুমোলেও মাথাটা ঠিক নির্ভার হচ্ছেনা। বরং কেমন ভারী হয়ে থাকে সবসময়। অনুভূতিটা খুব অস্বস্তিকর। পিএইচডির চিন্তা মাথায় বেশ ভালোভাবেই ভূতের মত চেপে আছে, বুঝতে পারছি। কিন্তু এটাকে কিভাবে চ্যাংদোলা করে মাথা থেকে নামানো যায় সে উপায় এখনো ভেবে বের করতে পারিনি। বিছানা থেকে উঠে হাতমুখ ধুলাম। নিচে নেমে খেয়ে ভাবতে লাগলাম কী করা যায় এরপর। ওদিকে আপু আমাকে সহ সুবর্ণ, আদীবাকে ঝাড়ি দিচ্ছে। ঈদের দিনে ঘরের ভেতর এরকম ঝিমাচ্ছি দেখে। আপু বললো পিচ্চিদের নিয়ে বাইরে থেকে ঘুরে আসতে। আমি রোবটের মত বললাম – আচ্ছা। তারপর বিকেলের দিকে আমরা চারজন বেরোলাম, আমি, ভাইয়া, সুবর্ণ, আদীবা। মাঝপথে সুবর্ণর বান্ধবী জারা জুটলো আমাদের সাথে। কলেজের পুকুরপাড়ে গিয়ে দেখি দুটো ইনফ্ল্যাটেবল নৌকা ভাসছে এককোণায়। আর তার কাছে পিচ্চিদের ভীর। লাইন ধরে দুইজন করে নৌকায় উঠছে, কিছুক্ষণ পুকুরের একপাশে এদিক ওদিক ভেসে থাকার পর পরের দুইজন উঠছে। প্রথমে ভাবলাম কেউ হয়তো টাকার বিনিময়ে করাচ্ছে ওসব। পরে জানা গেল বিদেশ ফেরত কেউ একজন ফেরার সময় রাবার বোট দুটো নিয়ে এসেছে। উনিই পিচ্চিদেরকে নৌকায় তুলে ঘুরাচ্ছেন। সুবর্ণ, জারা-কে দেখে বোঝা গেল তাদের উঠতে মন চাচ্ছে। ভাইয়া ওদেরকে নিয়ে গেল সামনে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর ওরাও নৌকায় উঠলো। দেখে বোঝা যাচ্ছিল বেশ মজা পাচ্ছে ওরা। যাক, অন্তত ওদের ঈদ আমার মত বোরিং হচ্ছেনা তাহলে একদম! নৌকাপর্ব শেষে কৃষিফার্মের দিকে এগুতে লাগলাম আমরা। পথে পিচ্চিদেরকে আইসক্রীম কিনে দেয়া হলে। সাথে আমাকেও! আমরা আইসক্রীম খেতে খেতে কৃষিফার্মের কোয়ার্টারের দিকে হাঁটতে লাগলাম। ওখানে আপুর এক কলিগ থাকেন কোয়ার্টারে। বাসার সামনে দোলনা আছে, খেলার মাঠ আছে। পিচ্চিরা দোলনায় চড়বে। তাই যাওয়া। আমার সরকারি সব কোয়ার্টারের মত এই কোয়ার্টারটাও ভালো লাগে। বারদুয়েক গিয়েছি আগেও। কোয়ার্টার এরিয়াতে ছিমছাম,সটান দাঁড়িয়ে থাকা লাল ইটের বিল্ডিং, বাধানো রাস্তা, মাঠে কলোনীর ছেলেমেয়েদের হৈচৈ – এই পরিচিত দৃশ্যগুলো দেখতে ভালো লাগে। চারপাশ বেশ শান্ত আর নির্ভাবনাময় একটা দৃশ্যকল্প ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে মনে হয়। ফাতেমা আপা দোলনাতেই বসে ছিলেন তার কয়েকমাসের পিচ্চিটাকে নিয়ে। নাম জিজ্ঞেস করলাম, বললেন আফরীন। বাবার নাম “আরিফ” এর সাথে মিলিয়ে রাখা। পিচ্চিটা গম্ভীর মুখে পৃথিবীর সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিল। মোটাসোটা, গোলগাল একটা নরোম বলের মত মানবশিশু। দেখে মনটা এমনিতেই হাসিহাসি হয়ে ওঠে। সুবর্ণরা দোলনায় দোল খাচ্ছিল, আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাঠে ছেলেদের ক্রিকেট খেলা দেখছিলাম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। শেষ কবে ক্রিকেট খেলেছি মনে করার চেষ্টা করলাম। উত্তর খুঁজে পাওয়ার আগেই সজোরে মারা একটা বল আমার দিকে আসতে লাগলো। আমি রিফ্লেক্স থেকেই পুরনো অভ্যাসে ক্যাচ ধরার চেষ্টা করলাম। বলটা হাত ফসকে বেরিয়ে গেল। কোন কারণ ছাড়াই বিব্রত লাগলো একটু। যখন খেলতাম তখন লং অনে ফিল্ডিং করেছি অনেক। হাই ক্যাচ বেশ ভালো ধরতে পারতাম। সেই পুরনো দিনের ক্ষিপ্রতা বা স্কিল দীর্ঘ দিনের অনভ্যাসে এতদিনে হারিয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু হয়তো মনের গভীরের কোন অংশ যুক্তিহীনভাবে আশা করছিল সবকিছু এখনো হারিয়ে যায়নি। সে ভুল ভাঙার বেদনা নিয়ে বলটা কুড়িয়ে আবার ফেরত পাঠালাম ফিরতি থ্রো তে। ততক্ষণে বেশ সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। চারপাশের আলো ঝুপ করে কমে যাচ্ছে। ফাতেমা আপার বড় ছেলে ক্রিকেট খেলা শেষে ফিরে এসেছে। ওর সাথে আগেও একবার দেখা হয়েছে, শেষবার যখন ওদের বাসায় এসেছিলাম। এবার চিনতে পারেনি। চেনার কথাও না অবশ্য। ছোটবেলার জগতের দৃশ্যপট খুব দ্রুত এক পর্ব থেকে আরেক পর্বে চলে যায়। ও ওর বন্ধুর সাথে একটা সেভেন আপের প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে ফুটবল খেলছিল রাস্তার ওপর। আমিও যোগ দিলাম এগিয়ে গিয়ে। তিনজন মিলে মিনিট পনেরো খেলেই একদম ঘেমে নেয়ে একাকার। ততক্ষণে সন্ধ্যা পুরোদমে হাজির হয়ে গেছে। রুবাইয়াতের বন্ধু বাসায় ফিরে গেল। সন্ধ্যার শেষ আবীরটুকুও মুছে যাচ্ছে, আমি ঘামে ভেজা হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি। পাশের পানির ট্যাপে হাত মুখ ধুয়ে নিলাম। তারপর তিনতলায় ফাতেমা আপার বাসায় গেলাম। আমার আগেই পিচ্চিরা চলে গিয়েছিল। আমি খেলার জন্য থেকে গিয়েছিলাম। তার আগে কিছুক্ষণ দোলনায় দোল দিয়েছি ওদেরকে। জারাকে দেখে বোঝা যাচ্ছিল সে খুব মজা  নিয়ে দোল খাচ্ছে দোলনায়। একটু পরপর দু বান্ধবী মিলে খিলখিল করে হাসছিল। পুরো বিকেল আর সন্ধ্যা তাদের বেশ ভালো কেটেছে। তাদের ছোটাছুটি, আর উচ্ছাসই বলে দিচ্ছিল সে কথা। ফেরার পথে একজন আরেকজনকে বলছিল – আজকের ঈদে খুব মজা হলো, তাইনা? আমি শুনে মনে মনে হাসলাম। ছোটবেলার চাওয়া পাওয়াগুলো কি সামান্য অথচ কত সহজেই না মন ভরিয়ে দেয়! আমি এই ছেলেবেলা, আর এইসব আনন্দময় সরলতা বহু আগেই পেছনে ফেলে এসেছি।

জারার মা বারবার ফোন দিচ্ছিল ওকে বাসায় চলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ও চাচ্ছিল আরো কিছু সময় সুবর্ণর সাথে কাটাতে। শেষমেষ আপু ফোনে সে কথা বলে দিলো ফোনে জারার মা কে। দুজন মিলে বাসায় এসে দেখি কাপড় চোপড় খুলে খালি গায়ে হারমোনিয়াম নিয়ে বসেছে। একটু মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করে দেখলাম সুবর্ণ নির্ভুলভাবে সারেগামা বাজাচ্ছে। আপুকে জিজ্ঞেস করতে বললো আদীবা ওকে শিখিয়েছে। কয়েকবার দেখিয়ে দেয়ার পরেই নিজে থেকে সারেগামা বাজাতে পারে এখন। আমি আপুকে বললাম ওকে গানের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিতে। আপু বললো – দেখি। আমার কাছে মনে হয়েছে মিউজিক ব্যাপারটা ওর ভেতর সহজাত। একটু গাইডেন্স পেলে বেশ ভালো করবে গানে। দেখি আবার আপুকে বলে দেখবো পরে।

রাতের বেলা বাইরে একটু বৃষ্টির আভাস। বাইরে শব্দ পাচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিল বৃষ্টি নামবে জোরে জোরে যে কোন সময়। আমি বিছানায় তখন শুয়ে আছি। সুবর্ণ জানালার গ্রীলে গাল ঠেকিয়ে বাইরের অন্ধকারে তাকিয়ে আছে। শব্দের জের ধরে বৃষ্টিকে দেখার চেষ্টা বোধহয়। কিছুক্ষণ পরে আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে হঠাৎ বলে উঠলো – “মামা, তুমি কি বৃষ্টির গন্ধ বুঝতে পারো?” তারপর উত্তরের অপেক্ষা না করে নিজে নিজেই বলে উঠলো – “আমি পারি।” এই বলে পাশের রুমে চলে গেল।

আমি শব্দহীন হয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে তারপর বৃষ্টির গন্ধ বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম।

 

 

 

 

 

Posted in দিন লিপি | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান