দুই চাকার দিনলিপি- ১ (ট্যুর ডি কুয়াকাটা)

১.
সিদ্ধান্তটা নেয়া হলো হুট করেই। শহীদুল্লাহ হলের পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে প্রাত্যহিক রুটিনের অংশ হিসেবে আমরা ফুচকা খাচ্ছিলাম। আমরা বলতে আমিন ভাই, এহসান ভাই, ইমতিয়াজ, জামান এবং আমি। ঈদের ছুটি তখন আসি আসি করছে, আর মাত্র কয়েকদিন। আমিন ভাই খেতে খেতে হঠাৎ বলে উঠলো – “ধূর মিয়া, তোমাদের দিয়া কিছু হইবোনা।” আমাদের দিয়ে কিছু হবেনা এটা নতুন কোন বিষয় নয়। কিন্তু ফুচকা খেতে খেতে চিরন্তন এ সত্যবচন আমিন ভাইয়ের হঠাৎ কেন মনে পড়ে গেল সেটা একটা বিষয় হতে পারে অবশ্যই। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম তার দিকে। এরপর আমিন ভাই নিজে থেকেই বললেন: “কতদিন ধরে একটা ঘোরাঘুরির প্ল্যান করতে বলতেসি, কেউ কিছু করতেসোনা।” শুনে বললাম- “ভাই, এইটা কোন ব্যাপার। চলেন এই এক তারিখেই যাই।” আমিন ভাই প্রশ্ন ফরমাইলেন – “কোথায়?” আমি চিন্তা ভাবনা না করেই বললাম, “কুয়াকাটা যাই চলেন। একবছর ধরে বরিশাল – কুয়াকাটা সাইকেল ট্যুর দেয়ার প্ল্যান করতেসি কিন্তু যাওয়া হচ্ছেনা। চলেন এই ধাক্কায় চলে যাই।” আমার কথা শুনে আমিন ভাই ফুচকা খাওয়া থামিয়ে তার ট্রেড মার্ক স্টাইলে মাথা হালকা কাত করে ন্যানোসেকেন্ডের ব্যবধানে জটিল সব হিসাব সম্পন্ন করে আবার ফুচকা খাওয়া শুরু করলেন। তারপর বললেন – “হুঁ যাওয়া যায়।” আমিন ভাইয়ের গ্রীণ সিগন্যাল পাওয়ার পর জামান, ইমতিয়াজ, এহসান ভাইও খানিক চিন্তা করে রাজি হয়ে গেল। তবে কবে যাবো সেটা নিয়ে কিছুক্ষণ কথা চললো। শেষমেষ ঠিক হলো ২৯ তারিখ রাতে যাবো, এক তারিখে না। ডিপার্টমেন্টে ফিরে হয়রান আবীর কে জানানো হলো। প্রথমে শুনে তার চেহারা ২০০ পাওয়ারের বাত্তির মত দপ করে জ্বলে উঠলেও সেটা নিভে যেতেও সময় লাগলোনা। সে তার লেজ সামিয়া হোসেনকে ছাড়া যেতে পারবেনা, কিছুতেই না। অগত্যা কী আর করা, বিবাহিত মানুষ, কিছুতো বলাও যায়না। এরপর বলা হলো ডিপার্টমেন্টের সানী ভাইকে। সে যেতে রাজি হলেই আমাদের ছয়জনের দল হয়ে যায়, তিনটা কেবিন নিলে একদম খাপে খাপে মিলে যাবে সব কিছু। তাকেও বহুত তেল দেয়া হইলো, কিন্তু সেও কিছুতেই রাজি হলোনা। হলোনা তো, হলোইনা। আমরা পাঁচজন মিলে যে পরিমাণ চেষ্টা করলাম তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য, সমপরিমাণ শ্রম কোন মেয়ের পিছনে দিলে সিংগেল জীবনের নির্ঘাত একটা গতি হয়ে যেত। কিছুটা হতাশ এবং অনেকখানি রাগান্বিত হয়ে ঠিক করলাম আমরা পাঁচজনই যাবো, একটা বেড খালি যাবে। পরদিন “এমভি বাঙালি”তে তিনটা কেবিন বুকিং দিয়ে আসলাম আমরা চারজন বাদামতলী গিয়ে। আপদকালীন সময় ট্যাকল দেয়ার জন্য সাইকেলের আনুসঙ্গিক জিনিসপত্র কেনাকাটা করলাম সবাই মিলে মহা উৎসাহে। সকল কিছু প্রস্তুত। এরপর শুরু হলো ২৯তারিখের জন্য অপেক্ষা। ট্যুরের কথা ভেবে মনে মনে উত্তেজনাও লাগে, আবার ডরও লাগে। এর আগে একদিনে সর্বোচ্চ সাইকেল চালিয়েছি ১০০কিমির মত। এবার ১১০+কিমি চালাতে হবে। পারবো তো? মাঝপথে গিয়ে যদি বাসের ছাদে সাইকেল তুলে কুয়াকাটা যাওয়া লাগে তাহলে হারিকিরি করে সম্মান রক্ষা করা ছাড়া গত্যন্তর থাকবেনা।

২.
২৯ তারিখ আসলো অবশেষে, লঞ্চ যাত্রার সময় সাড়ে আটটায়। আমরা বিকেলের দিকে সবাই ডিপার্টমেন্টে চলে আসলাম। রওনা দিলাম সাতটার দিকে। পুরান ঢাকা আমার কাছে বরাবরই এক বিপন্ন বিস্ময়ের নাম। সন্ধ্যা বেলায় পিক আওয়ারে পুরান ঢাকার রাস্তা দিয়ে সাইকেলে যাতায়াত করা আর পুলসিরাত পার হওয়ার ডিফিকাল্টি লেভেল অন্তত আমার কাছে মোটামুটি সমপর্যায়ের। কিন্তু যেতে তো হবেই। হেলিকপ্টার যেহেতু নাই, সাইকেলে করেই রওনা দিলাম আল্লাহর নাম নিয়ে। পরবর্তী চল্লিশমিনিটের বর্ণনা না দেই। তবে ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে যখন সদরঘাট টার্মিনালের সামনে নিজেকে আবিস্কার করলাম, আবেগে চোক্ষে পানি এসে পড়লো। একটু পরে অবশ্য বুঝতে পারলাম ওটা কপাল গড়িয়ে পড়া ঘাম ছিলো। টার্মিনালে গিয়ে সাইকেল ঢোকানো নিয়ে আবার একদফা মুলামুলি চললো। তবে শেষমেষ সবকিছু ভালোয় ভালোয় সম্পন্ন হলো। মিনিট পনেরো পরেই আমরা এমভি বাঙালির ডেকে আরামসে বসে ফেসবুকে চেকইন দেয়ার ফুরসত পেলাম। বরিশালে যাত্রা পর্বের এই অংশটুকু আমার কাছে সবসময়ের জন্যই ফেবারিট। লঞ্চ ছেড়ে দিলে খোলা ডেকে বসে বহু রাত অবধি আড্ডা হয়। এবারও ব্যাতিক্রম হলোনা। লঞ্চ ছাড়তেই আমরা ডেকে চলে আসলাম। এমভি বাঙালি তখন এগিয়ে চলছে তুমুল বাতাস কেটে, সে বাতাস জীবন থেকে সকল দু:খ, বেদনা, হতাশা উড়িয়ে নিয়ে যাবে পরবর্তী কয়েক ঘন্টার জন্য। দুই পাড়ের জীবন চাঞ্চল্য শত শত আলোর ফোঁটা হয়ে নেচে বেড়াচ্ছে তখন নদীর জলে। আমরা সে নাচন দেখতে দেখতে বাতাসের শব্দ শুনি, আর নিজেদের ভেতর এ টু জেড সকল কিছু নিয়ে কথা চলতে থাকে সমান তালে। তারপর রাত আরেকটু গড়ালে কেবিনে চলে যাই ঘুমুতে। পরদিন পুরো সময় জুড়ে দুই চাকায় সওয়ার থাকতে হবে, বিশ্রামটুকু তাই অতি প্রয়োজনীয়। ভোরবেলা ঘুম ভাঙে দরজায় আমিন ভাইয়ের ধাক্কার শব্দ শুনে। উঠে দেখি বরিশাল পৌঁছে গেছি। ঘড়িতে তখন ছয়টা বাজে। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়ি সবাই, রোদ ভালোমত উঠে যাওয়ার আগেই যতদূর চলে যাওয়া ততই ভালো। লঞ্চ টার্মিনালে নামতেই হেলমেট, গ্লাভস পড়া সাইক্লিস্ট আর গীয়ারঅলা সাইকেল দেখে অনভ্যস্ত চোখের অনুসরণ শুরু হলো। সবার চোখে কৌতূহল, এই পাঁচজন আজব চিড়িয়া কোত্থেকে উদয় হলো। মানুষজনের এই কৌতূহল আর আগ্রহ ছিলো পুরো ট্যুর জুড়েই।

৩.
খুব অল্প কিছু অংশ বাদ দিলে বরিশাল থেকে কুয়াকাটা যাওয়ার পথটুকু সাইক্লিংয়ের জন্য খুবই চমৎকার । কুয়াকাটার দিকে আমরা প্রথম ২৯ কিলোমিটার খুব দ্রুত পার হয়ে গেলাম। ঠান্ডা ঠান্ডা সকাল, হালকা হালকা কুয়াশা, শুনশান চারপাশ, কোন শব্দ নেই, কেবল আমাদের পাঁচজনের সাইকেলের হুইল ঘোরার খঁসখঁসে শব্দ, সে শব্দ কিছুক্ষণ টানা শুনলে কেমন নেশার মত লাগে। রাস্তার দুই পাশে বসত গড়ে তোলা মানুষজন তখন সবে ঘুম থেকে উঠে আড়মোড়া ভাঙছে। তাদের মধ্যে কেউ আমাদের দেখে ফেললে ঘুমভাঙা চোখে খানিকটা বিস্ময় নিয়ে অনুসরণ করছে যতদূর পর্যন্ত দৃষ্টিসীমায় থাকছে শহর থেকে সাইকেলে করে আসা আজব মানুষগুলো। গাড়ি ঘোড়া নেই বললেই চলে, পাকা রাস্তা, আর দুইপাশে ছায়া দিয়ে যাওয়া গাছের সারি। টানা চলতে চলতে একসময় দুমকি ফেরি ঘাটে পৌঁছে গেলাম। ফেরি পার হয়ে প্রথম হোটেলটাতেই বসে গেলাম নাশতা করতে, সকাল বেলা আমাদের প্রথম ব্রেক। সাইকেল ট্যুরে গেলে ব্রেকফাস্টটা সবসময়ই অমৃতের মত লাগে। প্রচন্ড ক্ষুধায় প্লেটের সবকিছু পেটে চালান হয়ে যায় নিমিষেই। অনেকটা কলেজে সকালবেলা পিটি শেষ করে এসে ডাইনিং হলে ব্রেকফাস্ট করার মত ফীলিংস পাওয়া যায় তখন। ব্রেকফাস্ট শেষে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার দু’চাকায় সওয়ার হলাম আমরা। রাস্তা তখনো আগের মতই সাপের বুকের মত মসৃণ, চমৎকার। সাইকেল ভ্রমণের সবচে সুন্দর ব্যাপার হচ্ছে চারপাশটা নিজের চোখ দিয়ে ভালোমত দেখে দেখে যাওয়ার সুযোগ থাকে। স্থানীয় মানুষজনের থাকা, খাওয়া, বসবাসের ধরণ সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণা পাওয়া যায়। যেমন যাওয়ার পথে রাস্তার পাশে যে বাড়িগুলো চোখে পড়লো তাদের বেশিরভাগের সাথেই লাগোয়া পুকুর। বেশিরভাগ পুকুরেই কম-বেশি শাপলা,পদ্ম ফুঁটে আছে যেটা ঢাকায় বাস করার মানুষের চোখে খুব সহজেই দৃষ্টি কাড়ে। কিছুদূর পরপর গড়ে ওঠা মসজিদ এবং স্কুলের পথে বেরোনো মেয়েদের বোরকা/হিজাব পড়ার হারও চোখে পড়ার মত। সাইকেলে চলতে চলতে এরকম নানা খুঁটিনাটি বিষয় দৃষ্টিগোচর হয়।
দুমকি থেকে আরো দশ-বারো কিলোমিটার যাওয়ার পর রাস্তার পাশে গ্রামীণ ব্যাংকের অফিস লাগোয়া একটা খোলা মাঠ দেখে আমরা সেখানে বিশ্রাম নেয়ার জন্য থামলাম। পুরো ব্যাংকে মাত্র একজন কর্মচারীর দেখা মিললো। আমরা সেখানে হাত-পা ভিজাই বাথরুমে গিয়ে, এহসান ভাই পুরো শরীরই ভিজিয়ে ফেললো। তার কথা হচ্ছে, শরীর ভেজা থাকলে ডিহাইড্রেশন কম হয়। আমরা তার কথা শুনে খানিকটা অনুপ্রাণিত হলাম, কিন্তু পুরো শরীর ভেজানোর ব্যাপারে কেউ আগ্রহী হলোনা। এভাবেই থেমে থেমে কুয়াকাটার দিকে মাইলের কাটা আস্তে আস্তে কমতে থাকে। ৫০ কিমি পার হওয়ার পর শরীরে ক্লান্তি এসে ভর করতে থাকে আস্তে আস্তে। ৬০ পেরনোর পর “আর সহ্য হচ্ছেনা” বলে রাস্তার পাশের একটা পুকুরে গোসল করতে নামলাম। আসল উদ্দেশ্য আসলে শরীর ভিজিয়ে একটু ঠান্ডা হওয়া, আকাশে তখন ভীষণ রাগী গনগনে একটা সূর্য। ঘাটের বাঁধানো সিঁড়িগুলো শ্যাওলা ধরে পিচ্ছিল হয়ে ছিলো। কেউ বেশিদূর নামার সাহস পেলনা। অন্যদের চে একটু ভালো সাঁতার জানি দেখে সাহস করে তবু শান্তিমত সাঁতার কাটলাম কিছুক্ষণ ।
পুকুর বাড়ির এক পিচ্চিও গোসল করতে নামলো আমাদের দেখাদেখি। ছেলেটা শান্ত, টুকটাক কথা হলো তার সাথে। তারপর ঘাটে উঠে ভেজা কাপড়ে বিশ্রাম এবং গল্প চললো বেশ কতক্ষণ। পুকুরবাড়ির মুরুব্বীও এসে যোগ দিল একসময়। মুরব্বিও কৌতুহলী হয়ে নানা বিষয়ে জিজ্ঞেস করলেন। যুবক বয়সে নিজে কীভাবে সাইকেল নিয়ে নানা জায়গায় ঘুরতে যেতেন সেই গল্পও শোনা হয়ে গেল আমাদের। যখন মনে হলো যথেষ্ট বিশ্রাম হয়েছে তখন সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। কিন্তু দশ কিলোমিটার যাওয়ার পর আমিন ভাইয়ের মাসল এ টান লাগলো। আমরা রাস্তার পাশে থেমে বসে পড়লাম। এবং আমিন ভাই শুয়ে পড়লেন।
৭০ কিমির মত চালানো হয়ে গেছে ততক্ষণে, সবাই কম বেশি ক্লান্ত। ততক্ষণে রাস্তার দুই পাশে দীর্ঘ ছায়াবৃক্ষগুলোর বদলে ক্রমশ জায়গা করে নিয়েছে ছোট ছোট ঝোপের মত গাছপালা। সীডরের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর কারণে সম্ভবত দৃশ্যপটের এরকম পরিবর্তন। সাইকেল চালাতে গিয়ে তাই এতক্ষণ যেমন ছায়া পাচ্ছিলাম সেটা ততক্ষণে গায়েব হয়ে গেছে। তখনও আর‌‌‌‌ও চল্লিশ কিলোমিটার পথ সামনে পড়ে আছে। দুপুরের খাওয়াও হয়নি। একবার থামলে শরীর নিয়ে আর নড়তে ইচ্ছা করছিলোনা। মনে হচ্ছিলো এখানেই থেকে যাই। :p তারপরও শরীর টেনে হিচড়ে রাস্তায় তুলতে হলো, রাস্তার পাশের ল্যান্ডমার্ক জানান দিচ্ছে কুয়াকাটা আরো ৩৭ কিমি দূরে। আমরা সাইকেল চালাচ্ছি তো চালাচ্ছি, কিলোমিটারগুলোও তখন কেমন যেন ধীরলয়ে পার হচ্ছে। কলেজে ক্রসকান্ট্রি দেবার সময় শেষের দিকে এসে শরীরে কোন অনুভূতি থাকতোনা,যন্ত্রের মত পা দুটো চলতো শুধু। অনেকটা তেমন লাগছিলো তখন।
ঢিমেতালে হলেও দূরত্ব আস্তে আস্তে কমতে থাকে, ত্রিশ থেকে বিশ, বিশ থেকে দশ, আর দশ থেকে সে দূরত্ব একসময় তিনে এসে থামে। সেটা দেখতে পেয়ে ইমতিয়াজ সাইকেল চালানো থামিয়ে আবেগে ইমোশনাল হয়ে ঝটপট ল্যান্ডমার্কের পাশে পোজ দিয়ে দাঁড়ায়, ছবি তুলবে। এর আগের কয়েকটা ল্যান্ডমার্ক মিসিং ছিল, পরেও যদি না থাকে সেই ভয়ে তার এই তাড়াহুড়া। দুষ্টু লোকজন না হয় যদি পুরো ট্যুরকে ফটোশপ বলে বাতিল করে দেয়। থামার পর আবিস্কার করলাম আমার মাডগার্ডের স্ক্রু আসার পথে কখন কোথায় পড়ে গেছে টেরও পাইনি। শেষ পনেরো মিনিট ধাতব শব্দ কোথা থেকে হচ্ছিল সেই রহস্য বোঝা গেল তখন। এহসান ভাইকে ব্যাপারটা জানাতেই আমাদের সাইকেল এক্সপার্ট এহসান ভাই তার সবুজ রঙের যাদুর বাক্স থেকে জিনিসপত্র বের করে আমার সাইকেল ঠিক করায় ব্যস্ত হয়ে গেলেন। পনের মিনিটের ফটোসেশন আর সারাই কাজ সমাপ্ত করার পর এবার বাকি তিন কিলোমিটার পেরোতে রওনা দিলাম। সূর্যাস্তটা যদি বীচে গিয়ে দেখা যায় সে চিন্তায় আপনাতেই সাইকেল চালানোর গতি বেড়ে গেল সবার। আকাশ তখন লাল চাদর জড়িয়ে বসে আছে সন্ধ্যা নামলেই তাতে ডুব দেবে বলে। শুন্য কিলোমিটার পার হয়ে যখন আমরা বীচ দেখতে পেলাম ততক্ষণে কুসুমের মত সূর্যটা প্রায় পুরোটুকু সাগরে ডুবে গেছে, যতটুকু ছিলো ততটুকুই সাইকেল থেকে দেখতে দেখতে হোটেল সাগর কন্যার দিকে প্যাডেল মারতে থাকলাম। হোটেলের সামনের লনে সাইকেলগুলো থামিয়ে ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করলাম। এন্ডোমন্ডো তখন জানান দিচ্ছে সারাদিনে সাইকেল চালানো হয়েছে ১১২ কিলোমিটার, ফ্লুইড লস সাড়ে পাঁচ লিটারের মত। (এন্ডমন্ডো লিংক১ লিংক২) এটা দেখে ক্লান্তি আরো বেশি ভর করলো যেন। তারপরও শান্তি। আজকের দিনের মত আর সাইকেল চালাতে হবেনা ভাবতেই ভালো লাগছিলো। জিনিসপত্র রেখে বীচে গেলাম সবাই। আমি ছাড়া সবাই গোসল করতে নামলো। আমার নামতে ইচ্ছা করছিলোনা, পাড়ে রাখা জেলেদের একটা নৌকা ওঠানোর চাকার ওপর বসে থাকলাম বাকিদের গোসল শেষ না হওয়ার পর্যন্ত। গোসল আর সূর্যাস্ত দেখা শেষে হোটেলে ফিরলাম। এসে দেখি কারেন্ট নাই। গোসল করলাম মোমের আলোয়। তারপর বের হয়ে ডিনার করে এসেই ঘুম। এনাফ ফর টুডে।

৪।

আমাদের পরিকল্পনা ছিলো কুয়াকাটা পৌঁছে দুইদিন বিশ্রাম নেয়ার। কিন্তু প্রথম দিনেই সবার ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। সাগরের কথা চিন্তা করলেই যেমন উথাল পাথাল ঢেউ আর সুকুমারীয় শনশনে বাতাসের কথা মাথায় আসে এবার কুয়াকাটা এসে তার ছিঁটেফোঁটারও দেখা মিললোনা। সাগর একদম শান্ত, অলস ঢেউগুলো গভীর সাগরে সম্ভবত গভীর ঘুমে মগ্ন, তীরে তাদের কোন দেখা নেই। আর আমাদের চারপাশ যে বায়ু দ্বারা বেষ্টিত সেটা নিয়ে রীতিমত সন্দেহে পড়ে গেলাম। তাপমাত্রা বরিশাল শহরের চেয়েও বেশি মনে হচ্ছিল, ভ্যাপসা গরমে ডিহাইড্রেটেড শরীরে কিছুই ভালো লাগছিলনা। ডাবের পানি, ড্রিংকস, স্যালাইন কিছুতেই সেই গরম কিংবা অস্বস্তি – কোনটারই সুরাহা হলোনা। এদিকে কারেন্ট চলে গেছে সেই সন্ধ্যেবেলায়, আর আসার নাম নেই। কারেন্টের আসা যাওয়ায় এত ক্লান্ত শরীর নিয়েও রাতে ঘুম হলোনা ঠিকঠাক। শেষমেষ বিরক্ত হয়ে মাঝরাতে আমি আর জামান বিছানা ছেড়ে বারান্দায় এসে শুলাম একটু বাতাসের আশায়। তাতে অবস্থার উন্নতি তো হলোইনা উল্টো বড় বড় মশার কামড় খেয়ে মিশন এবোর্ট করে আবার ব্যক টু দ্য প্যাভিলিয়ন। আমরা কি এমন বায়ুশূণ্য, কারেন্ট বিহীন, ঢেউ বিহীন কুয়াকাটা চেয়েছিলাম?

পরদিন সকালেও একই অবস্থা, আবহওয়ার কোন পরিবর্তন নেই। অবস্থা এতই করুণ যে আমরা তখন একটু বাতাসের আশায় নিজেদের সর্বস্ব বিকিয়ে দিতে পারি। এরমধ্যেই একটু এদিক ওদিক ঘুরলাম, রাখাইন পাড়া গেলাম, মাছ নিলামে তুলে কীভাবে বিক্রি হয় সেটাও দেখলাম কিছুক্ষণ, কিন্তু গরমকে কিছুতেই মন কিংবা দেহ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা যাচ্ছিলোনা। বাতাসের হাহাকার ভুলতে শেষমেষ ঠিক হলো তিনটা মটরসাইকেল নিয়ে বীচের এ মাথা, ও মাথা ঘুরে আসি বরং। গতির জোরে তবু যদি একটু বাতাস লাগানো যায় শরীরে।

বীচের একমাথা বরাবর ১৭-১৮ কিমি যাওয়ার পর আগুনমুখো নদীর মুখের দেখা মিললো। জায়গাটা খুব খুব সুন্দর। কোন মানুষজন নেই, কিছু জেলেদের দেখা পাওয়া গেল শুধু। আপনমনে জাল সারাইয়ের কাজ করছে। এবার কুয়াকাটায় এসে প্রথমবারের মত কোথাও এসে ভালো লাগলো। আমার মোবাইল তখন ডেড, ছবি তোলার সুযোগ পেলাম না। তবে ইমতিয়াজেরটা তখনো জীবন্ত, ছবি তোলার ভার এবার ওই নিয়ে নিলো। সেখানে কিছুসময় থাকার পর এবার বীচের উল্টোদিকে রওনা দিলাম। একটা জায়গায় এসে প্রচুর লাল কাঁকড়ার দেখা মেলে, স্থানীয়রা বলে লাল কাঁকড়ার দ্বীপ। মোটরসাইকেলের সাড়া পেয়ে কাঁকড়াগুলো পিলপিল করে গর্তে ঢুকে যায় নিমিষেই, সে দৃশ্যটাও দেখার মত। এহসান ভাইয়ের ইচ্ছে ছিলো কিছু কাঁকড়া ধরে নিয়ে যাবে, ঢাকায় এনে পালবে। তার জন্য কয়েকটা কাঁকড়া ধরে মিনারেল ওয়াটারের বোতলে ভরে দিলো আমাদের সাথে আসা গাইড। এত চঞ্চল কাঁকড়াগুলো কী অনায়াসেই না ধরে ফেললো সে! গাইডটা কথা বলতে খুব পছন্দ করে, তবে শুনতে বিরক্ত লাগছিলোনা। খুঁটিনাটি অনেক কিছুই জানা হলো কুয়াকাটার অনেক বিষয় নিয়ে। এদিকে আসার পথে জেলেপাড়া পার হয়ে আসতে হয়। পাড়ার ছোট ছোট পিচ্চিদের দেখলাম ভর দুপুরে সাগরে ঝাপাঝাপি করছে মনের আনন্দে। কিছু ছিলো একদম পিচ্চি, বয়স তিন কি চার হবে। কিন্তু সাগর নিয়ে এতটুকু ভীতি নেই কারো মধ্যে। মনের আনন্দে দাপাদাপি করে বেড়াচ্ছে যেন একেকজন দু:সাহসী হারকিউলিস। হতে পারে সাগরপারের এসব মানুষদের জীবন অনেক কঠিন, আলোর চেয়ে তাদের জীবনে অন্ধকারের দৌরাত্ন অনেক বেশি, তবু তাদের দেখে অসুখী মনে হয়না।একেকজনের হাস্যোজ্জ্বল, সপ্রতিভ চেহারা। প্রকৃতির কোলেপিঠে বড় হওয়া মানুষগুলোর মত করে আমাদের কৃত্রিম জীবনযাপনে অভ্যস্থ শহুরে মন কখনোই জীবনকে ততটা গভীরতা নিয়ে অনুভব করতে পারবেনা। বিষয়টা নিজে নিজে ভাবছিলাম আর সাগরপাড়ের এসব ধুলোবালি মাখা, অশিক্ষিত, মেটে শরীরের ছেলেমেয়েগুলোর ওপর দারুণ হিংসা হচ্ছিল। প্রকৃতিবিমুখ নাগরিক জীবনে স্বাচ্ছন্দ্যের কোন অভাব নেই, কিন্তু সুখের অভাব আছে বৈকি।
একঘন্টার সাইকেল ভ্রমণ শেষে যখন ফিরলাম, নেমেই আবার সেই অস্বস্তিকর গরমের মুখোমুখি হতে হল। রোদ তখন আগের চেয়ে নির্দয় হয়ে ছড়িয়ে আছে চারপাশে। আমিন ভাই হুট করে বলে উঠলেন, কুয়াকাটায় আর না। চলো বরিশাল ফিরে যাই। আমরা এতটাই বিতশ্রদ্ধ ছিলাম যে শোনার সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলাম। কিন্তু গতকাল এতদূর সাইকেল চালিয়ে এসে আজ আবার ফিরতি পথে সাইকেল চালিয়ে বরিশাল যাওয়া একরকম অসম্ভব ব্যাপার। ডিহাইড্রেশনের প্রভাব তখনো শরীরে পুরোমাত্রায় বর্তমান। তো ঠিক হলো এবার বাসের ছাদে সাইকেল তুলে রওনা দেই বরং, তবু এরকম হতাশাময় কুয়াকাটা শহরে আর একমুহুর্তও নয়। যেই ভাবা সেই কাজ, সাড়ে বারোটার বাসেই তল্পিতল্পা গুটিয়ে রওনা দিলাম বরিশাল শহরের দিকে। মনে মনে ভাবছি প্রিয় বরিশাল শহর নিশ্চয়ই কুয়াকাটার মত নিরাশ করবেনা।

৫।
কুয়াকাটা বরিশাল রুটে দ্রুতগামী বাস বলে কিছু নেই। যা আছে সব ধীরগামী বাস। এদের মধ্যে বিআরটিসির বাস আবার সবচে ধীরগামী। একবার পাক্কা সাত ঘন্টা লেগেছিলো কুয়াকাটা থেকে বরিশাল আসতে। এবার যেটাতে আসলাম সেটা বিআরটিসির তুলনায় অনেক দ্রুত আসলো, মাত্র পাঁচ ঘন্টায়। বাস থেকে যখন নামলাম বরিশাল শহরে তখন সন্ধ্যা হয় হয়। নেমে মনে হলো থাকবো ক‌োথায়। বরিশালে অবস্থান করার কোন প্ল্যান আমাদের ছিলোনা, তাই থাকার ব্যবস্থা নিয়েও ভাবা হয়নি আগে। আমিন ভাইয়ের মাথায় আসলো সার্কিট হাউজের কথা। কিন্তু সেখানে গিয়ে ব্যপক হাইকোর্টের সন্ধান পাওয়া গেল। হাইকোর্টের বিচারপতি সহ আরো কী কী জানি হতে হবে সেখানে থাকতে গেলে। এহসান ভাইকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে চালিয়েও খুব একটা সুবিধা করা গেলনা। সার্কিট হাউজ থেকে ব্যর্থ হয়ে শহরের কয়েকটা আবাসিক হোটেলে ঢুঁ মারলাম, কিন্তু একরাতের খরচ এত বেশি যে শুনে মন সায় দিচ্ছিলোনা। চিরাচরিত ক্যাডেট বন্ডিং এর কথা বিবেচনায় নিয়ে তারপর খোঁজা শুরু করলাম বরিশাল শহরে থাকে এমন পুলাপানের খোঁজ বের করতে। প্রথমে ফোন দিলাম বরিশালের তারিককে। কিন্তু বেয়াদপটা চারবার ফোন দেয়ার পরও ফোন ধরলোনা। সিরাজ ভাইয়ের নাম্বারে ট্রাই করলাম তারপর। বড়ভাইও সম্ভবত বিজি ছিলো। সামরিক বাহিনির মানুষ, প্যারাময় জীবন। এরপর কারে ফোন দেয়া যায় চিন্তা করতেসি। মনে পড়লো রেজওয়ানের কথা, কিন্তু সে এখন সুদূর কঙ্গোনিবাসী শান্তিরক্ষী। তারে মনে করেই বা কী হবে। তারপরও কী ভেবে ফেসবুকে নক করলাম, হারামীটা তখন অনলাইনেই ছিলো। সব শুনে বললো – নো চিন্তা, আমি এখনই আব্বাকে বলে দিচ্ছি, তোরা আমার বাসায় চলে যা। পুরা বাসা খালি, যেমনে খুশি সেমনে থাকতে পারবি। শুনে কিছুক্ষণ গাঁইগুই করলাম, কিন্তু আর কোন ভালো সল্যুশন না পেয়ে শেষমেষ রাজি হয়ে গেলাম। তারপর অনেক গলিঘুপচি পার হয়ে যখন রেজওয়ানের বর্ণনামত জায়গায় এসে পৌঁছলাম, ঘড়ির কাঁটা তখন আটটা ছুঁই ছুঁই। আংকেল নামায পড়ে আমাদের নিতে আসলেন। আমরা সুড়সুড় করে তার পিছু নিলাম। বাসায় যেয়ে আংকেল যেভাবে সবকিছুর ব্যবস্থা করতে তোরজোর করা শুরু করলেন আমরা লজ্জা পেয়ে গেলাম। অনেক বলে কয়ে আংকেলকে শেষমেষ বোঝানো গেল আমরা যা কিছু যেভাবে আছে সেভাবেই আরামসে রাতটা কাটিয়ে দিতে পারবো। এদিকে গোসলের একটা জায়গা পেয়েই আমরা ব্যপক খুশি। আংকেলের ব্যাপক আপত্তি স্বত্বেও বুঝিয়ে শুনিয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরোলাম ডিনার করতে। নানা প্রকার মৎস, মাংস এবং মিষ্টি সহযোগে খাওয়া সম্পন্ন করে কিছুক্ষণ এদিক ওদিক হাঁটলাম বাসায় ফেরার আগে। ফিরতে ফিরতে সোয়া দশটার মত বেজে গেল। ফিরে দেখি রেজওয়ানের ছোটভাই শৈবাল দরজায় বসে আছে আমাদের জন্য। সবাই এত কেয়ারিং হলে ক্যামনে কী। তারপর কিছুক্ষনের মধ্যেই বিছানায় উঠতেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। পরদিন সকাল বেলা দেখি ব্রেকফাস্ট রেডি করে আংকেল বসে আছে আমাদের জন্য। খাওয়ার টেবিলে বসে অনেক কথা হলো আংকেলের সাথে, আর খাওয়াটাও ব্যাপক ছিলো। পেটপুরে খেয়ে টেয়ে আমরা সাইকেল নিয়ে বেরোলাম বরিশাল শহর ঘুরতে। প্ল্যান হচ্ছে আমরা সারাদিন বরিশাল ঘুরে রাতের স্টীমারে ঢাকার পথে রওনা দিবো। আমরা দূর্গাসাগর যাবো শুনে আংকেল গুঠিয়া মসজিদও দেখে আসার জন্য বলে দিলেন, দূর্গাসাগর পেরিয়ে আরো আট কিলোর মত সামনে যেতে হবে। শুরুতে এলোপাথারি বরিশাল শহর ঘুরতে লাগলাম আমরা। যা কিছু দেখে ভালো লাগছিলো সেখানেই থেমে থেমে দেখছিলাম সবকিছু। সেভাবেই দেখা হলো পদ্মপুকুর, ব্রজমোহন বিদ্যালয়, ব্রজমোহন কলেজ, একটা মিশনারী স্কুল (নামটা খেয়াল আসছেনা)।
বাইরে থেকে ভেতরটা দারুন সুন্দর মনে হচ্ছিলো। জামান গেলো ভেতরে ঢোকার পারমিশন আনতে, কিন্তু গার্ড বলে দিলো এত গুলো সন্দেহজনক ছেলে ভেতরে ঢুকতে পারবেনা, নিষেধ আছে। আমরা সুদূর ঢাকা থেকে আসা সাইকেলব্রাজক বলেও সুবিধা করা গেলনা, মুখের ওপর গেট বন্ধ করে দিলো। অগত্যা আরো এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করে দূর্গাসাগরের দিকে প্যাডেল মারা শুরু করলাম। রাস্তাগুলো বরাবরের মতই সাইকেল বান্ধব, চালাতে দারুণ ভালো লাগছিলো। এককথায় বলা যায় বরিশাল শহর সাইক্লিস্টদের জন্য দারুণ মনের মত জায়গা। আমরা দূর্গাসাগর যেয়ে অলস দুপুর কাটালাম। দীঘির চারপাশ ঘুরলাম, আর ঘাটে বসে থাকলাম বহুক্ষণ। এদিকে জামান টয়লেটে যাওয়ার পর ওখানকার কর্মচারী না জেনে বারান্দার গেট তালা মেরে দিলো, জামান হয়ে পড়লো বন্দী। সেটা নিয়ে খানিকটা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হল অমন ধীরলয়ের পরিবেশের মধ্যেও। শান্তিময় পরিবেশে আমরা যখন গল্প করছিলাম, আমিন ভাই সেসবের ধার ধারলোনা। ঘাটে শুয়ে পড়ে নাক ডেকে ঘুমানো শুরু করলো সে।
এভাবে শুয়ে বসে ঘন্টা খানেক পার হওয়ার পর রওনা দিলাম গুঠিয়া মসজিদের দিকে। কয়েক কিলোর কথা বললেও দেখা গেল গুঠিয়া মসজিদের আর দেখা মিলেনা। সাইকেল চালাচ্ছি তো চালাচ্ছিই। গ্রামের কিলোমিটার যে আসলে কত কিলোমিটারে হয়, সেটা নিয়ে আরো একবারের মত কনফিউজড হলাম আমরা সবাই। কিন্তু জার্নিটা মোটেও খারাপ ছিলোনা। ছায়াঘেরা পথ ধরে চলতে দারুন লাগছিলো। পথে যেতেই জমিদারবাড়ির ধ্বংসাবশেষ এর দেখা পেলাম, এখন তেমন কিছুই অবশিষ্ট নেই যদিও। গুঠিয়া মসজিদ পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল হয়ে গেল, গ্রামের লোকজন অবশ্য বলে গুইট্যা মসজিদ। মসজিদ চত্বরটা যেমনটা শুনে এসেছি, আসলেই চমৎকার। এত ভেতরের দিকে এত সুন্দর মসজিদ আসলে আশা করিনি। আমরা চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখলাম কিছুক্ষণ, সাথেই লাগোয়া একটা নার্সারী, একপাশ দিয়ে সরু পানির লেক। আর সামনে ঘাঁটবাঁধানো চমৎকার একটা পুকুর। মসজিদের খরচ যার যোগাড় করা, তিনি শান্টু সাহেব, বিএনপির নেতা। এখন বিদেশে পলাতক। তার পরিত্যক্ত প্রাসাদও দেখে আসলাম একফাঁকে, বাইরে থেকে দেখে মনে হলোনা কেউ থাকে এখন। সবমিলিয়ে বিকেলটা সুন্দর কাটলো। পুকুরঘাটে বসে থাকলাম অনেকক্ষন। বসে থেকেই হঠাৎ রাস্তার পাশে চোখে পড়লো একটা সাইনবোর্ড, আরো সামনের রাস্তার দিকে নির্দেশ করে তাতে বলা আছে আরেকটু এগোলেই চাখার এ শেরেবাংলা ফজলুল হকের স্মৃতি জাদুঘর। দেখে যাওয়ার লোভ লাগলো, কিন্তু গ্রামের কিলোমিটারের কথা চিন্তা করে মনকে সংযত করলাম। বরিশাল ফিরতে হবে সন্ধ্যের আগে, আটটায় স্টীমার ধরতে হবে। ফিরতি পথে কোথাও থামার তাড়া নেই, আবার সেই একটানা সাইকেল চালানো শুনশান ছায়াঘেরা পথ ধরে। সাইকেল হুইল ঘোরার খঁসখঁসে শব্দ গ্রামের পাকা পথ ধরে এগুতে লাগলো বরিশাল শহরের দিকে। মাঝপথে কোত্থেকে যেন বৃষ্টি চলে আসলো তার দলবল নিয়ে। আমরা কিছুক্ষণ থেমে চা খেয়ে একটু পরেই আবার রওনা দিলাম। শহরের কাছাকাছি আসতেই আবার মুষলধারে বৃষ্টি। এবার আর থামাথামি নেই। কাকভেঁজা হয়েই শহরের অলিগলি ঘুরলাম আরো কিছুক্ষণ। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে দেখে আসলাম জীবনানন্দ দাশের বাড়ি, বহু আগে একসময় এখানে ছিলেন তিনি। এখন আর তার উত্তরসূরী কেউ থাকেন না। পরবর্তীতে জায়গা কিনে যিনি মালিক হয়েছেন তার পরিবারের সাথে টুকটাক কথা বলে ফিরে আসলাম। সামনের সড়কটির নামকরণও করা হয়েছে কবির নামে – জীবনানন্দ দাস রোড। ততক্ষনে বৃষ্টি থামি থামি করছে। শহরেই আমিন ভাবীর বড় বোনের বাসা। সেখানে একবার যেতেই হবে আমিন ভাইকে। তো আমরাও তার সঙ্গী হলাম। বাসায় ঢুকতে না ঢুকতেই কারেন্ট চলে গেল। আমরা ভেজা কাপড়ে জড়োসড়ো হয়ে ড্রয়িং রুমে বসে আছি, ততক্ষণে অবশ্য কাপড় অনেকটাই শুকিয়ে গেছে। কিন্তু এতক্ষণ ঘেমে নেয়ে সারা শহর যে দাপড়ে বেড়ালাম শরীরের সে গন্ধ তো শুকিয়ে যাবার নয়। সবকিছু ইগনোর করে বসে থাকলাম তবু যেন কিছুই হইনি। ওদিকে অল্প সময়ের মধ্যেই আপু অনেক নাশতা সাজিয়ে ফেললো ডাইনিং টেবিলে। সবাই ক্ষুধার্ত ছিলাম। গোগ্রাসে গিললাম সবকিছু, শরীরের গন্ধ সংক্রান্ত সকল সংকোচ ভুলে গেলাম খাওয়া শুরুর সাথে সাথেই। খেতে খেতে কিছুক্ষন গল্প, আর খাওয়া শেষে অনেকখানি থ্যাংকস বলেটলে আমরা বিদায় নিলাম। রেজওয়ানদের বাসায় এসে ঝটপট গোসল করে সবকিছু গুছিয়ে নিলাম শেষবারের মত। আংকেলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে লঞ্চ টার্মিনালের দিকে পা বাড়ালাম। এই অল্প সময়ের ব্যবধানে আংকেল যেমন আন্তরিকতা দিয়ে আমাদের ঘিরে রাখলেন তার তুলনা নেই। রেজওয়ান ও আংকেলকে এই সুযোগে ধন্যবাদ জানিয়ে দেই আরেকবার।
ততক্ষণে রাত হয়ে গেছে। চারপাশ অন্ধকার। সাইকেলের টেইল লাইট জ্বালিয়ে টার্মিনালে যাওয়ার পথে ভুলে আমরা আরেকপথে চলে গিয়ে গোলকধাঁধার মত কিছুক্ষণ পাক খেলাম। ভুল পথে ফেরার সময় একজন দেখি পিছন থেকে বলছে: “ঐ দ্যাখ, সাইকেল বাহিনি আবার আইসে!”। আসলে সারাদিনে সব রাস্তা দিয়ে বেশ কয়েকবার চক্কর দেয়ায় শহরের সবাই মোটামুটি একবার করে দেখে ফেলসে আমাদের। আগের রাতে মিষ্টি খাওয়ার জন্য যে দোকানে ঢুকেছিলাম সেখানকার কর্মচারিও আমাদের দেখে বলে উঠেছিলো: “সাইকেল বাহিনি আসছে, টেবিলে পাঁচটা দই লাগা!” অথচ আমাদের সাথে তখন সাইকেল ছিলোনা! মানুষের এরকম ঔৎসুক্য আসলে স্বাভাবিকই। এই শহরে এরকম সাইকেল বাহিনি খুব বেশি চোখে পড়ার কথা না, কদাচিৎ কেউ হয়তো আসে ঢাকা থেকে। মানুষের এরকম আরো হাজারটা কৌতূহলের স্বীকার হয়েছি অনেকবারই। মাঝে মাঝে বিরক্ত লাগলেও পুরো অভিজ্ঞতাটা নেহায়েত খারাপ ছিলোনা। যাহোক, শেষমেষ স্টীমার ঘাটে সময়মতই পৌঁছলাম আমরা। খুব বেশি অপেক্ষা করতে হলোনা স্টীমারের জন্য, ঘাটে আসতেই ঝটপট উঠে গেলাম সাইকেল সমেত। এদিকে জামান এখান থেকেই অন্য আরেকটা স্টীমারে খুলনা চলে যাবে, ওর বাসা সেখানে। ওর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা ফার্স্টক্লাসের একটা রুম বাগিয়ে জিনিসপত্র রেখে ডেকে চলে আসলাম। প্ল্যান ছিলো এহসান ভাই ডেকেই রাত কাটিয়ে দেবে। আর আমরা তিনজন রুমে থাকবো। এদিকে স্টীমারে উঠে দেখি ফার্স্ট ক্লাসে যাত্রী আমরা চারজনই। ঈদের আগে সকল ভীরভাট্টা ঢাকা থেকে বরিশালের পথে, ফিরতি পথে তাই যাত্রীর এরকম আকাল। আমরা মাত্র চারজন দেখে স্টীমারের লোকজন এসি ছাড়তে নারাজ। আমিন ভাই এটা নিয়ে চিল্লাপাল্লা লাগিয়ে দিলো। এসি না ছাড়লে ফার্স্টক্লাসের ভাড়া পুরোপুরি দিবোনা বলে আমিন ভাই জানিয়ে দিলেন। শেষমেষ অনেক দরদাম করে আপোষ হলো আমরা দুটো রুম নিবো বিনিময়ে, ফার্স্টক্লাসের একরুমের ভাড়ার সাথে অতিরিক্ত আরো পাঁচশো টাকা দিতে হবে। ডেকের সাইকেল রাখার ভাড়াও এর মধ্যে যুক্ত। আমিন ভাইয়ের দামাদামির কল্যাণে ব্যাপক সস্তায় আমরা দু’টো রুম পেয়ে গেলাম। আমরা তার এই গুণ সম্পর্কে সেই বঙ্গবাজারে কেনাকাটার সময় থেকেই অবগত আছি, তারপরও আবারো মুগ্ধ হলাম। মানুষজন এমন দামাদামি করতে কীভাবে যে পারে! লঞ্চে বহুবার উঠলেও স্টীমারে ওঠার অভিজ্ঞতা এবারই প্রথম। ডেকটাতে চমৎকার বসার ব্যবস্থা আছে। আমরা শুয়ে বসে বাতাস খেতে খেতে সময় পার করলাম অনেক রাত পর্যন্ত। ডেকের একদম মাথায় দুটো সীট ছিলো, আমরা ওটার নাম দিলাম টাইটানিক চেয়ার। আমার হালকা ঠান্ডা আর কিছুটা ক্লান্ত লাগছিলো দেখে একসময় রুমে এসে শুয়ে পড়লাম। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে একবার টয়লেট থেকে ফিরে ঘুমঘুম চোখে নিজের বিছানায় উঠতে গিয়ে দেখি আরেকজনের ওপর শুচ্ছি, বিদ্যুৎ বেগে আমার ঘুম সব চলে গেল। ভুল করে অন্য রুমে চলে এসেছি, কার উপর না কার উপর শুয়েছিলাম সেই চিন্তা করতে করতে দ্রুতবেগে এবার নিজের বিছানায় ঠিকঠাক চলে আসলাম। ভোরে ঘুম ভেঙে ডেকে এসে দেখি এহসান ভাই আর ইমতিয়াজ আগেই এসে বসে আছে। চারপাশ তখন ভোরের নরোম আলোয় আলোকিত। আমিও বসে পড়লাম তাদের পাশে। একটু পর চলে আসলো আমিন ভাইও। চারজন মিলে ফিরতি পথের লঞ্চগুলো দেখছিলাম। ঈদের কারণে সবগুলো লঞ্চ একদম ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই অবস্থায় নানা গন্তব্যের দিকে যাচ্ছে। সেসব লঞ্চ আমাদের চার যাত্রী সম্বলিত স্টীমারের পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় বড়ই বিসাদৃশ্যপূর্ণ লাগছিলো ব্যাপারটা। তারাও আমাদের হাঁ করে দেখছিলো, আমরাও তাদের হাঁ করে দেখছিলাম। এর আগে যতবার লঞ্চ ভ্রমণ করেছি সব রাতের বেলায় ছিলো, দিনের বেলায় এবার নতুন অভিজ্ঞতা হলো। স্টীমারের দুই পাশের বড় বড় কানের মত প্রপেলার দেখার অভিজ্ঞতাও এবারই প্রথম। ভোরের আলো আরেকটু ভালোমত ফুটতে ফুটতে আমরা আস্তে আস্তে ঢাকার দিকে এগোতে লাগলাম।সোয়া নয়টা নাগাদ সদরঘাটের মুখ স্পষ্ট হতে লাগলো দৃষ্টিসীমায়। সেই চিরপরিচিত নাগরিক কোলাহল, বুড়িগঙ্গার নোংরা পানি আর ঘাট ছাড়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা শত শত লঞ্চ স্বাগতম জানালো আমাদের চারজনকে আরো একবার। গাট্টি বোচকা নামিয়ে সাইকেলে রওনা দিলাম বাসার পথে, নতুন সঙ্গী এবার গত তিনদিন ধরে জড়ো হওয়া সুখস্মৃতিগুলো। আজ আবার তাদের নিয়ে লিখতে বসে স্মৃতিগুলোর কানে কানে ফিঁসফিঁসিয়ে বললাম – “দুই চাকার দিনলিপিতে তোমাদের স্বাগতম!”

Posted in দিন লিপি | Tagged , , , | মন্তব্য দিন

The Proposal!

Originally posted on Merna Faheem:

I always knew he was mad!

View original 896 more words

Posted in Uncategorized | মন্তব্য দিন

অক্টোবর ১০,২০১৪

সিগারেট খাওয়া পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছি বহুদিন হল।এমনকি এক দুই টানও দেয়া হয়না,শখ করে কিংবা অনুরোধে। তারপরও গত তিনদিনে তিনটা সিগারেট খেয়ে ফেললাম। কতদিন যে এমন বিষণ্ণ লাগেনা! সন্ধ্যের আলো যখন বজলুদের বাড়ির সুপারি গাছের সারির ফাঁকে লালচে একটু আভা নিয়ে গায়ে গা মিশিয়ে শেষবারের মত বিশ্রাম নেয়,আমি আর শাথিল তখন বিলের আকাশের তারার সং্খ্যা আরো দুটো বাড়িয়ে দিয়েছি দেশলাই হাতে। আকাশে মন ভালো করে দেয়া একটা চাঁদ ছিল। আর ছিলো বিলের পানিতে তার ঝিকিমিকি প্রতিচ্ছবি । সেসব দেখে মন তবু ভালো হয়নি, হিন্দুবাড়ির পুকুরের ওপর দিয়ে হঠাত উড়ে যাওয়া বাদুড়ের দিকে দৃষ্টি রেখে  সিগারেট এর দৈর্ঘ্য কমিয়ে গেছি শুধু। তারপর বাসায় এসে একটার পর একটা অঞ্জন,চন্দ্রবিন্দু কিংবা লালন।কিন্তু কেউ আমার মন ভাল করে দিতে পারেনি। মাঝে মাঝে নিজের কাছে নিজেকে বোঝা বড় অসম্ভব মনে হয়।

Posted in Uncategorized | মন্তব্য দিন

অগাস্ট ৩১,২০১৪

থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে সেই কখন থেকে। কারেন্ট চলে গেছে শুরুর দিকেই।তারপর এক সময় জেনারেটরটাও। আছে শুধু ঘরভর্তি অন্ধকার,আর বৃষ্টির মন ভালো করে দেয়া ঝিরঝির শব্দ। অনেকক্ষণ হল বিছানায় শুয়ে আছি। ফুটবল খেলে গা ভর্তি ব্যাথা। এপাশ ওপাশ করতেও আহ উহ করছি। তারপরও খারাপ লাগছেনা। কিছু ব্যাথা মধুরও হয়।

কয়েকদিন ধরে প্রতিদিনই বৃষ্টি হচ্ছে। ব্যাপারটা দারুন সুখকর। বৃষ্টি ভাল লাগে, সকাল,বিকেল,রাত্রি,যখনই হোক তখনই ভাল লাগে। বৃষ্টি হচ্ছে সবচে প্রিয় বন্ধুটার মত, শুধু কখনোই আড়ি হয়না তার সাথে। মেঘের মত পেঁজা পেঁজা অনুভূতির সাথে দারুণ সময় কাটে।একা একা কত কিছু ভাবি। ভাবতে ভাবতে অনুভূতির নৌকা কখন কোন ঘাটে যেয়ে থামে তার হিসেব রাখা হয়না। মনের সাথে হিসেব করে কবেই বা কিছু করা হয়। 

আজকে প্রথম মোবাইল থেকে দিনলিপি লিখলাম। বেশ মজার।

Posted in Uncategorized | মন্তব্য দিন

জুলাই ৪, ২০১৪

বহুদিন পর কিছু একটা লিখতে ইচ্ছে করলো। ইচ্ছে করার এই ব্যাপারটা বর্তমান সময়ের বিবেচনায় একদমই যায়না। কতদিন যে কিছু লিখিনা, এক দুই লাইনও না। কিন্তু তারপরও আজ ইচ্ছে করলো, এতো বেশি যে সকল অলসতাকে চুপ করিয়ে দিয়ে সত্যি সত্যি এডিটর খুলে বসে পড়লাম লিখতে। অর্ণবের “হারিয়ে গিয়েছি” শুনলাম পর পর দুইবার। প্রথমবার শুনতে শুনতে আগের কিছু স্মৃতি মনে উঁকি দিয়ে গেল চুপি চুপি। তাদের দেখে আমার মনটা বিষণ্ন হয়ে গেল। তারপর দ্বিতীয়বার আবার শুনলাম। এবার মন খারাপের স্মৃতিগুলো বন্ধু হয়ে গেল গানটা শুনতে শুনতে। আর শুনতে অসম্ভব ভালো লাগলো। গান ব্যাপারটা আসলে দারুণ। ভালো লাগা খারাপ লাগার মাঝে যে ব্যবধানটুকু, খুব সহজে ভেঙে দেয়, কিছু বুঝে ওঠার আগেই। আর তখন মনে হয়, হাসিখুশি হয়েও বেঁচে থাকা যায় চাইলে, গানের কথাগুলোর মত, অনুভূতিগুলো পেঁজা তুলোর মত মেঘ হয়ে ভেসে ভেসে বেড়ায়। দারুণ অনুভূতি :)

তিনবছর এগারো মাস পর লাবলুস কে বিদায় জানানোর সময় হয়ে এসেছে। এই ব্যাপারটা যতবার মনে পড়ছে মনটা আবার একটু ভারি হয়ে আসছে। কী চমৎকার চারটি বছর কাটিয়েছি এখানে! সারা জীবন সাথে রেখে দেয়ার মত কত স্মৃতি জমে গেছে চারতলার এই ছোট্ট ভালোলাগার বাসাটুকু ঘিরে। এখন নিজেদের বাসায় উঠতে যাচ্ছি কাল, অথবা পরশু। কিন্তু এখানে, এই বাসায় যেমন ইচ্ছে ভাবার, কিংবা করার এই স্বাধীনতাটুকু, সেটা মিস করবো দারুণভাবে। গভীর রাতে যখন ঘুম আসবেনা, তখন আর চুপচাপ পৃথিবীর বাইরের একজন মানুষ হয়ে আর বসে থাকা হবেনা আমার এই চিলতে বারান্দাটায়। আর আমার ছোট্ট রুমটা, পারলে এটাকে সাথে করে নিয়ে যেতাম :(

আমি ইদানিং আগের মতই আছি বোধহয়। তবে যত বয়স হচ্ছে নানা জটিলতা বাড়ছে জীবনে। এবং এ বিষয়টাকে আমি প্রচন্ড রকমভাবে অপছন্দ করছি। আমার সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে সত্যিই হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। শুধু ইচ্ছেটুকুই শুধু সম্বল, আর কিছু নেই।

“গোটা শহর বাতি জ্বেলে সতর্ক, পায়ে পায়ে হারাবার জায়গা খুঁজে মরি..”

Posted in দিন লিপি | মন্তব্য দিন

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

মানুষের মন আসলে খুব অদ্ভূত। হাসিখুশি সময়ে যে জিনিসগুলো নজরে এসেও আসেনা একটু বিষণ্নতায় মগ্ন থেকে সেই জিনিসগুলোই একদম অন্যরকম ভাবে ধরা দেয়।

বহুদিন পর অঞ্জনের গান শুনি। একটার পর একটা, কোনরকম বাছবিছার না করে। ভাল্লাগতেসে।

আমি বহুবার করে পণ করি যা ইচ্ছা হয় তাই করবো, যেভাবে ইচ্ছা হয় সেভাবেই করবো। কিন্তু যখন সময়টা এসে উপস্থিত হয়, যখন ইচ্ছেমত আমার কিছু করার কথা, তখন সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায়। তারপর আমি বাসায় এসে দরজাটা বন্ধ করে পুরো পৃথিবীটাকে দরজার ওপাশে রেখে হালকা ভলিউমে গান শুনি, নিজের ইচ্ছেমত।

বহুদিন পর আজ কিছু একটা লিখতে ইচ্ছে করলো। তাই বহু বহুদিন পর আমার একলা আকাশে এক কোণে ভেসে বেড়ানো মেঘটুকুতে হানা দিলাম। একটু আগে অঞ্জনের গান শুনছিলাম – “আমার জানলা দিয়ে একটু খানি আকাশ দেখা যায়”। এই অদ্ভূত লোকটা কি অদ্ভুত সুন্দর করে কী অদ্ভুত সরলতায় মনের সকল কিছু গানে গানে বলে যায়। আসলেই অদ্ভুত!

আমার পরবর্তী কয়েকদিনের জন্য বেশ কিছু কাজ জমে গেছে। সেগুলো একে একে ঠান্ডা মাথায় শেষ করতে হবে। আমার এখন একদম গলা অবধি কাজে ডুবে থাকার সময়। আমার এখন সবকিছু ভুলে শুধু নিজেকে ভালোবাসার সময়। জামান যেমনটা বলে, জীবন আসলে খুব বড়সড় একটা ভ্রমণ। সে ভ্রমণে সহযাত্রী বদলায় সময় সময়, যাদেরকে আমরা সুন্দর করে বাংলায় “বন্ধু” বলি। একেক স্টেশনে একেক যাত্রী নেমে যাবে, সেটাই স্বাভাবিক। আবার সামনের কোন স্টেশন থেকে নতুন কেউ পাশে এসে বসবে। গল্প হবে কথা হবে, গল্প কথা হতে হতে আবার তারও নেমে যাবার সময় হয়ে আসবে একসময়। এবং এটাই স্বাভাবিক।

এখন সঞ্জীবের গান শুনি।

কোথাও বাঁশী বাজছিল
হাওয়ারা খুব হাসছিল
আমার ছিলো বন্ধ কপাট
অন্ধ চোখে রাত ছিলো

Posted in দিন লিপি | 2 টি মন্তব্য

২৬.৬.২০১৩

ভার্সিটি বাস থেকে নেমে দাড়ায় আছি সাফওয়ানের জন্য। সাফওয়ান আমার রুমমেট। সে বড়লোক। তার একটা হোন্ডা আছে। অফিস থেকে সে হোন্ডাতে ফিরতেসে। আর আমি দাঁড়ায় আছি তার জন্য। তারপর আমরা বৈকালিক নাশতা খেয়ে বাসার পথে হোন্ডাযোগে রওনা দিবো। কয়েকবার ফোন দিলাম। কিন্তু হারামি ফোন ধরেনা। মেজাজ পুরা বিলা। আজকের আবহাওয়া বেশ ভালো ছিলো, তাই চান্দি একটু কম গরম। কিন্তু গরম। এই যখন সর্বশেষ অবস্থা হঠাৎ কাঁধে কে যেন হাত রাখলো। কপাল কুঁচকে পিছন ফিরে তাকালাম। দেখলাম বয়স্ক এক মহিলা। ভাবলাম ভিক্ষুক। বলতে চাইতেসি মাফ করেন। কিন্তু তার আগেই শীর্ণ হাতটা বাড়ায় দিলেন আমার দিকে। তাতে একটা কাগজ। আমি হাতে নিলাম। সেটা আসলে কাগজ না। একটা প্রেসক্রিপশন। মনে হয় সাহায্যই চাবেন। আবারও রেডি হইলাম। বলবো – মাফ করেন। কিন্তু না। বৃদ্ধা বললেন – বাবা রক্ত টেশ করবো। কোথায় করবো একটু বলে দিবা? আমি আর মাফ করেন বলতে পারলাম না। বরং তার পিছনের দিকে একটা লম্বা বিল্ডিংয়ের দিকে আঙুল তুলে বললাম, ঐখানে যান। চাচী ফ্যালফ্যাল করে তাকায় থাকলেন। বুঝলাম কিছুই বুঝেননাই। উনারে চাচীই বললাম। যদিও উনি আমার নানীর বয়সী হবেন। যাইহোক। শেষমেষ বললাম – চলেন আপনারে নিয়া যাই। ডায়গনস্টিক সেন্টারটা দোতলায়। উনারে দোতলায় দরজার সামনে ছেড়ে দিয়ে ফিরে আসবো ভাবতেসি মনে মনে। শেষমেষ ভাবলাম, না। ভেতরে ঢুকায়েই দিয়ে আসি। ভেতরে ঢুকায়ে মনে হইলো উনি বিল্ডিং চিনেননাই, রিসেপশনিষ্ট চিনবেন ক্যামনে? আমি প্রেসক্রিপশনটা হাতে আর চাচীরে পিছনে নিয়া রিসেপশন ডেস্কের সামনে গিয়া দাঁড়াইলাম। রিসেপশনে একজন মহিলা। ঠিক মহিলাও না আবার। মহিলার চে একটু কম বয়েসী। উনাকে প্রেসক্রিপশন দিয়ে বললাম দেখেন তো কী অবস্থা। উনি দেখে টেখে বললেন এক হাজার টাকা লাগবে। আমি প্রেসক্রিপশনটা দেখলাম এইবার। একটা ব্লাড টেস্ট, আর একটা ইউরিন টেস্ট। দুই টেস্টে একহাজার টাকা। কঠিন অবস্থা। আমি আবার ভাবলাম। ভাবলাম যে রিসেপশনিস্ট চিনেনা তার কাছে একহাজার টাকা থাকবে ক্যামনে? আমার নিজের পকেটেই একহাজার টাকা নাই। তবু চাচীরে জিজ্ঞেস করলাম। কারণ জিজ্ঞেস করা ছাড়া কোন উপায়ও নাই। বললাম – চাচী এক হাজার টেকা লাগবে। চাচী এইবার হাউমাউ করে কিছু বললেন। পুরাটা বুঝলাম না। খালি বুঝলাম উনার কাছে একহাজার টাকা নাই। আমি রিসেপশনিস্টকে বললাম – একটু কমানো যায়? রিসেপশনিস্ট তার লাস্যময়ী হাসিটা এবার আগেরবারের চে আরেকটু বাড়ায় দিলেন, কিন্তু টেকা কমালেন না। চাচীরে আবার জিগাই। চাচী, টেকা তো মেলা লাগে। কী করবেন? চাচী আবার হাউমাউ করে করে কিছু একটা বলেন। সবকথা বুঝতে পারিনা। শুধু বুঝলাম তার কাছে তিনশো টেকা আছে। কিন্তু একহাজার টাকা নাই। আমি এইবার রিসেপশনের আরেক ভদ্রলোকের কাছে যাই। বললাম ভাই দেখেন না একটু। চাচীর তো টেকাটুকা নাই। শুনে তিনিও হাসেন। সে হাসিতে মধু ঝরে পড়ে। ঠিক তার সহকর্মীনীর মত। কিন্তু একহাজার টাকা একহাজার টাকাই থাকে। আমি চাচীর দিকে তাকাই। চাচীও আমার দিকে তাকায়। কী করবো বুঝতে পারিনা। আমিই যেইখানে বুঝতে পারিনা সেইখানে চাচী বুঝবে ক্যামনে? তারপরও শেষবারের মত হাসিখুশি রিসেপশনিস্টকে আরেকবার অনুরোধ করি ডাক্তার সাবকে একটু বলতে। যদি একটু কমানো যায়। নিতান্ত অনিচ্ছাতেও তিনি ডাক্তার সাবকে গিয়া জিগান। কী জিগাইলেন কিছু শুনতে পাইনা। দূর থেকে শুধু দেখি তার মুখ থেকে আবার মধু ঝরে পড়তেসে। ডাক্তার সাবও সবশুনে হাসেন। সে হাসিও মধুমাখা। কিছু একটা বললেন। বলে আবার তিনি রোগী দেখার মহান কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। রিসেপশনিস্ট ভদ্রলোক ফিরে এসে বললেন – কমসে। আমি খুশি হয়ে উঠি। জিজ্ঞেস করলাম – কত? উনি টাকার অংক বললেন। ডাক্তার সাহেব অতি মহানুভব ব্যক্তি। একহাজার টাকা থেকে নয়শো টাকা করে দিয়েছেন তিনি। ডাক্তার সাহেবের এহেন মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে গেলাম। খালি মুখটা কেমন তিতা তিতা হয়ে গেল। রিসেপশনিস্টও বোধহয় ব্যপারটা বুঝতে পারলেন। সে জন্যেই বোধহয় হাসিতে আরো একটু মধু ঢেলে দিলেন। আমি তাকায় তাকায় তা’ দেখলাম। দেখে মনে হইলো গালে দুইখান চটকানা মেরে মধুর সাপ্লাই বন্ধ কইরা দেই। কিন্তু মুখে বললাম – ঠিকাছে। প্রেসক্রিপশন রাখেন। চাচীরে বললাম – চাচী আপনে বসেন আমি আসতেসি। নিচে ডিবিবিএল বুথ থেকে টেকা তুলে আবার এসে রিসেপশনিস্টকে দিলাম। টেকা দেখে কে না খুশি হয়। আমি হই, সাফওয়ান হয়। দুনিয়ার সবাইই হয়। কিন্তু রিসেপশনিস্ট কেন জানি খুশি হইলেননা। জিগাইলেন – আপনার কে হয়? আমি বললাম – কেউ হয়না। আপনি টাকা রাখেন। শুনে রিসেপশনিস্টের মুখও কেমন কেমন তিতা তিতা হয়ে গেল বলে মনে হয়। মধু ঢালার দায়িত্ব এইবার আমি গ্রহণ করলাম। দিনের সবচে সুন্দর হাসিটা হেসে বললাম- ঠিকাছে না? রিসেপশনিস্ট এইবার কিছু বললেন না। শুধু মাথা নাড়লেন উপর নিচ। আমি মনে মনে বললাম আলহামদুলিল্লাহ। মধুর সাপ্লাই পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে। আমি উল্টা ঘুরে চাচীকে বললাম – চাচী চলেন। ঝামেলা শেষ। এইবার আপনার টেশ করার পালা।

টেস্টের জন্য ডাক পড়ার অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে চাচীরে জিগাই- বাড়ি কই আপনার? চাচী বলেন – ফুলবাড়িয়া ময়মনসিংহ। একটা মেয়ে। গার্মেন্টসে কাম করে । আর সে কাম করে বাসায় বাসায়। নিজে নিজেই গড়গড়িয়ে আরো বহু কথা বলতে থাকেন। আমি শুনি। চুপচাপ শুনি। শুনতে শুনতে আমি চাচীর দিকে আবারো তাকাই। তারে আমি চাচী চাচী বললেও সে আসলে আমার নানীর বয়েসি। আমার নানী যখন বেঁচে ছিলেন একটা একান্নবর্তী পরিবারের সর্বময় কর্ত্রী ছিলেন। তিনি যখন হাঁটতেন তখন আঁচলের গোছায় ঝুন ঝুন করে বাজতো আমাদের বিশাল পরিবারের কর্তৃত্বের প্রতীক, এক গোছা চাবি। নানী মারা গেছেন বহু বছর আগে। কিন্তু ঝুনঝুন করে চাবির গোছা বাজার শব্দ এখনো চোখ বন্ধ করলে আমি শুনতে পাই। অন্যদিকে কোমরের ব্যাথায় বার বার বাঁকা হয়ে যাওয়া এই চাচী ঢাকা শহরে একা একা রক্ত টেশ করতে আঁচলে তিনশো টেকা বেঁধে উদভ্রান্তের মত এদিক সেদিক ঘুরেন। আমরা খালি তা’ তাকায় তাকায় দেখি। দেখে দেখে রিসেপশনিস্টের হাসি আরো মধুমাখা হয়, ডাক্তার সাহেব একশো টাকার সমপরিমাণ মহানুভব হয়ে ওঠেন।

সবকিছু শেষ হয়ে গেলে স্লীপখানা চাচীর হাতে দিয়ে বলি চাচী বাড়ি যান। কালকে এসে রিপোর্ট নিয়ে গিয়ে ডাক্তার রে আবার দেখাইয়েন। চাচী হাউমাউ করে এবারও কিছু বলেন। কী বললেন সেটা এবারও পুরেপুরি বোঝা হয়না । শুধু বুঝলাম চাচী বলসেন – অনেক বড় হও বাপ। আমি মনে মনে বললাম – আমারে বড় হইতে বলে কী হবে চাচী। তার চে বরং ডাক্তার সাবের জন্যে আরো বড় হবার দোয়া করেন। ভবিষ্যতে যাতে আরো দশ বিশ টাকা কম নিতে পারে মানুষের কাছ থেকে। ভবিষ্যতে যেন একশো টাকা থেকে দুইশো টাকার মহানুভব হইতে পারেন।

আমার হঠাৎ খুব হতাশ লাগে। কেন লাগে বুঝতে পারিনা। কিংবা বুঝলেও আসলে নিজেকে বুঝতে দিতে চাইনা। এতক্ষণ ধরে চাচী চাচী করলেও আসলে আমার নানীর বয়সী মানুষটার কথা ভেবে হতাশ লাগে। আজকে তিনশো টেকা বেঁচে গেসে তার। কিন্তু কালকে বাঁচার গ্যারান্টি নাই। ডাক্তার সাব হয়তো আবারও মহানুভব হবেন। কিংবা হবেন না। হয়তো পাঁচশো টাকা থেকে একশো টাকা কালও মহানুভবতার খাতায় যাবে। বাকি থাকবে চারশো টাকা। কিন্তু আরেকশো টেকা আসবে কোত্থিকা? বুঝে পাইনা। এত লেখাপড়া কইরা আমিই যেইটা বুঝতে পাইনা, সেইটা আমার মত মহানুভব মানুষদের বাসায় বাসায় কাজ করা চাচী বুঝবে ক্যামনে?

চাচীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি বাসার দিকে রওনা দেই। হঠাৎ আমার খেয়াল হয় সাফওয়ান হারামিটা এখনো আসেনাই। যার সাথে হোন্ডায় চড়ে আমাদের একসাথে বাসায় ফেরার কথা ছিলো।

Posted in দিন লিপি, Uncategorized | ১ টি মন্তব্য