২৫সেপ্টেম্বর, ২০১২

বিষন্ন রাত নতুন কিছু নয়। কিন্তু আজকের রাতটা বড় অসহ্যও লাগছে। কিছুক্ষণ ঘরের এপ্রান্ত ওপ্রান্ত হাটাহাটি করলাম, বারান্দাকে গিয়ে কিছু সময় দাঁড়িয়েও থাকলাম আঁধারের সাথে গা মিশিয়ে। কিন্তু কিছুতেই মন শান্ত হচ্ছেনা। দুপুর বেলায় সার্ভিস সেন্টারের বাচালটার সাথে খিটিমিটি করা থেকে শুরু । তারপর বাংলাদেশ এমন করে হেরে গেল পাকিস্তানের সাথে। সাথে আরো কয়েকটা হাবিজাবি মনখারাপ করা চিন্তা মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। সবমিলিয়ে এমন বাজে রাত সাম্প্রতিকসময়ে পার করতে হয়নি। ঘুম আসছেনা, একদমই না। আজ এবিসিতে গেলাম। কিছুসময় কাজ নিয়ে বিজি থাকলাম। ঐ সময়টুকুই একটু ভালো গেছে বলা চলে।
আমার পরীক্ষার খুব বেশি দেরি নেই। মাথার ওপর অনেক অনেক পড়ার চাপ। ধুর।

Posted in Uncategorized | ১ টি মন্তব্য

বদলে না যাওয়া ভালোবাসাগুলো


১৯৯৮ সালের জুন মাসের এক তারিখ

আব্বা, আম্মা আর আমি – এই তিনজন গাড়িতে করে টাঙ্গাইল যাচ্ছি। সবাই বললো ক্যাডেট কলেজে চান্স পাওয়া অনেক কঠিন। তাই ঠিক হলো আমাকে ক্যাডেট কোচিং এ দেয়া হবে। যেখানে থাকি সেখানে ভালো কোন কোচিং নেই। অগত্যা টাঙ্গাইলে চলো। ঠিক হলো আবাসিক থেকে কোচিং করবো কয়েক মাস। আজ সেই দিন। আমাকে কোচিং এ রেখে আসা হবে। গাড়িতে আম্মা আমার পাশে বসা। হাতদুটো শক্ত করে ধরে আছে। যেন ছেড়ে দিলেই কোথাও হারিয়ে যাবো। কাল সারারাত আম্মা ঠিকমতো ঘুমোয়নি। আম্মাকে অনেক দিনের জন্য শেষবারের মত জড়িয়ে ধরে ঘুমানোর সময় সেটা ঠিকই বুঝতে পেরেছি। গতরাতের কথা মনে করে হঠাৎ অনুভব করলাম, আজ রাতে আমি আর আম্মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে পারবোনা। আমি জানলা দিয়ে বাইরে তাকাই, কিন্তু কিছুই যেন চোখে পড়েনা। সবকিছু বিষণ্ন আর ঝাপসা লাগে। শুধু মনে হতে থাকে আমি আজ রাতে আম্মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে পারবোনা। না বলে কয়েই আমার চোখটা ভীষণ জ্বালা করতে থাকে। আম্মা যেন কিছু বুঝতে না পারে সেজন্য আমি জানলা দিয়ে বাইরেই তাকিয়ে থাকি। মনে মনে শুধু প্রার্থনা করছি এই পথ যেন কখনো শেষ না হয়। না তাকিয়েও বুঝতে কষ্ট হয়না সে প্রার্থনা আম্মাও করছে। আম্মা আমার হাতটা যেন আরেকটু শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। কিন্তু চল্লিশ মিনিট পরেই বোঝা হয়ে যায় এ প্রার্থনা সফল হবার নয়, দেখতে দেখতে কোচিং এ পৌঁছে যাই। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে নিজের রুমে যাই। আম্মা নিজের হাতে সব কিছু গুছিয়ে দিলো, আর সাথে সাথে খাওয়া, পড়া এই সেই নিয়ে হাজারটা উপদেশ। আমি শুধু হু হ্যা করি। রুম গুছানোও একসময় শেষ হয়ে যায়, যেমন করে শেষ হয়ে গেছে শেষ কয়েকটি ঘন্টা। এবার বিদায় দেবার পালা। আব্বা নরম গলায় অনেক উপদেশ দেন, ভালোভাবে থাকতে , নিয়ম মেনে চলতে, আর নিয়ম মেনে পড়াশুনা করতে। আম্মা তখনো হাত আঁকড়ে ধরে আছে শক্ত করে। আম্মা জানে এবার হাত ছেড়ে দিলে সত্যিই হারিয়ে যাবো। শেষ মুহুর্তে আম্মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে, আমি বহু কষ্টে চোখের পানি সামলাই। আমার মনে হতে থাকে আমাকে কাঁদতে দেখলে আম্মা আরো বেশি কষ্ট পাবে। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আব্বা, আম্মার চলে যাওয়া দেখি। তখন সন্ধ্যা আসি আসি করছে। আব্বা আম্মা বিশ্বাস বেতকার গলির পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে একসময় বিকেলের সূর্যটার মতই মিলিয়ে যায়। আমার সব কিছু ঝাপসা আর অস্পষ্ট লাগে। মাথার ভেতর শুধু ঘুরতে থাকে আজ রাতে আমি আম্মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে পারবোনা।

১২ বছরের ছেলেটি তখনো জানেনা তার একলা ঘুমানোর দিন সেদিন থেকেই শুরু হয়ে গেছে, আম্মাকে জড়িয়ে ঘুমানোর দিন তার জীবনে আগের মত করে আর কখনোই আসবেনা।

৩জুন, ১৯৯৯

মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে আমার প্রথম দিন। আমাকে রেখে যেতে আম্মা আর আব্বা এসেছে শুধু। গত কয়েকদিন মনে কত শত রঙিন স্বপ্ন আর কল্পনা, সাথে খানিকটা আশঙ্কার ছবি এঁকেছি ক্যাডেট কলেজকে নিয়ে। কিন্তু ৩তারিখ যতই কাছে চলে আসছিলো মন খারাপের ঘোড়া ততই ছুটছিলো টগবগিয়ে। পুরনো সেই ভয় আবার আঁকড়ে ধরে, আম্মাকে ছেড়ে থাকতে হবে এতগুলো বছর। সময় কেমন দ্রুত ছুটে চলে। একটু পড়েই আব্বা , আম্মা চলে যাবে। ভেবেছিলাম কোচিং এ কয়েক মাস একা থেকে আমি অনেক বড় হয়ে গেছি। কিছুতেই আর কোন দিন হুট করে চোখ জ্বালা করবেনা কারো কথা ভেবে। কিন্তু আব্বা, আম্মা চলে যাবার সময় যত ঘনিয়ে আসছিলো বড় হওয়ার সব সমীকরণ কেমন ওলোট পালোট হয়ে যেতে লাগলো। বিদায় নেবার আগে আম্মা দরুদ পড়ে বুকে ফুঁ দিলো। আমার বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করে উঠলো। ইচ্ছে করছিলো তক্ষুণি আম্মার সাথে বাসায় চলে যাই। আমি হাউসের সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। আম্মা যেতে যেতে বার বার পিছে ফিরে তাকাচ্ছেন। আমি বড় হওয়ার ভান করে হাসিমুখে তাকিয়ে থাকি সে পথের দিকে, যে পথ ধরে আম্মা একসময় আমার চোখের আড়ালে চলে যাবে। মির্জাপুরের আকাশ তখন লালচে বিষণ্নতায় ছেঁয়ে আছে। আমি ডিনার ড্রেসের ধবধবে সাদা শার্টের হাতায় চোখ মুছতে মুছতে আরো কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি। আমার শুধু আম্মার কথা মনে পড়ে।

আমি বুঝে গেলাম, বড় হওয়ার এখনো ঢের দেরি।

১০ জুন, ২০১২

হুট করে অসুস্থ হয়ে পড়ে পাক্কা দু’সপ্তাহ বাসায় থেকে আজ আবার ঢাকা চলে যাবো। ভোরের বাসেই চলে যাওয়ার কথা ছিলো, আম্মা সেই ছয়টা থেকে ডাকাডাকি শুরু করেছে। কিন্তু আলসেমিতে আমার আর ওঠা হয়না। আম্মা কপট রাগ দেখায়, আবার একটু খুশিও হয়। আমি আরো কয়েকঘন্টা বাসায় থাকবো বলে। দুপুর হয়ে আসে আস্তে আস্তে। আম্মা জানলা দিয়ে তাকিয়ে বলে – এত কড়া রোদ, তোমার যেতে কষ্ট হবে। আজকে না হয় থেকেই যাও। কাল ভোরে জোর করে হলেও উঠিয়ে দেব। আমি যথাসম্ভব নিরাবেগ গলায় বলি – আজকে যেতেই হবে। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে অনেক। আম্মার মনের বিষণ্নতাটুকু পড়তে আমার কষ্ট হয়না। দুপুরে শেষবারের মত খাইয়ে দিতে দিতে আম্মা হা হুতাশ করেন, যাবার আগে শেষবারের মত আরো কিছু আম খাইয়ে দিতে পারলেন না বলে। এরকম অবস্থায় কিভাবে আবার একা একা থাকবো সেটা নিয়ে তার দুশ্চিন্তার শেষ নেই। ঘুরে ফিরে বার বার ঠিকমত খাওয়ার উপদেশ শুনতে থাকি কিছুক্ষণ পরপরই। সবকিছু শেষ বারের মত চেক করে বলি – আম্মা আমি বেরোই তাহলে এখন। গেটে দাঁড়িয়ে শেষ বারের মত বিদায় নেই। আম্মা যথাসম্ভব স্বাভাবিক গলায় বলে- ভালোভাবে যেও। বাসে পূর্ব দিকে বসবে যাতে রোদ না লাগে। আমি ছোট করে আচ্ছা বলে সামনে ঘুরে হাঁটা দেই। ক্যাডেট কলেজে থাকতেও ছুটি থেকে কলেজ ফেরার সময়ও বিদায় নিয়ে কখনো পেছন ফিরে তাকাতাম না। তাকালেই দেখতে পাবো – আম্মা শাড়ির আঁচলে নি:শব্দে চোখ মুছছেন। সে দৃশ্য সহ্য করার অভ্যেস আমার আজো হয়ে ওঠেনি। আজো আমার তাই কখনো পিছনে ফিরে তাকানো হয়না। হাঁটতে হাঁটতে আমার চোখটা সেই ১২ বছরের ছেলেটার মতই জ্বালা করে ওঠে। আম্মা নিশ্চয়ই ভাবে, ছেলে বড় হয়ে গেছে। আগের মত করে মায়ের কথা মনে করে চোখ ভেজায়না আর।

আমি শুধু জানি, আমার বুকের ভেতর সেই ১২ বছরের ছেলেটা আজো ঘুমিয়ে আছে। আমার আর কোনদিনই বড় হওয়া হবেনা।

Posted in Uncategorized | মন্তব্য দিন

১১.১১.১১

ঘুরে ফিরে সেই পুরনো উপলব্দিগুলোই আবার নিজের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। এ ব্লগে লেখা কেবলমাত্র চরম রকমের ডিপ্রেসড অবস্থাতেই বেশি হয়। স্বীকার করছি, আমি ভীষন রকমের ডিপ্রেসড এখন। সার্চ ইঞ্জিন আবার ব্লক করে দিলাম। নিজের ডিপ্রেশন মানুষ খুব গুরুত্ব নিয়ে বিচার করে, ভাবে। তবে অন্যেরটা শুনতে গেলা সেটাকে প্যানপ্যানানির চেয়ে বেশি ভালো কিছু কখনোই মনে হয়না।

মানুষ সবচে বড় কষ্টগুলো পায় তখনই যখন সে কী বলতে চাইছে তা যখন যাকে উদ্দেশ্য করে বলা সে বুঝতে পারেনা, উল্টো পুরো ব্যাপারটা ভুল বুঝে সেই মানুষটা যখন নিজের অজান্তেই কষ্টের বোঝাটা বহন করতে না পারার মত অসহনীয় করে দেয়।

আমি কাউকেই দোষ দিচ্ছিনা। কিন্তু আমি সত্যিই জানিনা আমার এ অবস্থায় কী করা উচিত। সারারাত ঘুমোতে পারিনি। কিন্তু আমি সত্যিই আর পুরো ব্যাপারটা সইতে পারছিনা। তাই মনটা হালকা করতে আবার সেই পুরনো বন্ধুর কাছে মাথা নিচু করে ফিরে আসা। অন্তত যে কখনো আমার কথার মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে এমন কিছু বলেনি যা আমাকে ভেতরে ভেতরে দুমড়ে মুচড়ে দেয়।

মাঝের বেশ কিছু সময় আমি দারুণ রকমের ভালো ছিলাম। মনে হতো আমার জীবনটা বেশ সহজ, সরল আর হাসিখুশি হয়ে আসছে। ইদানিং আবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আবার সেই পুরনো, ভেতরে ভেতরে ভেঙে যাওয়া প্রতিকৃতি দেখতে পাচ্ছি। কাছের মানুষরা বলে আমি একটা রোবট, কথাটা আসলে সত্যি ছিলোনা। শামুককে যখন কেউ বলে তুমি খুব শক্ত দেহের মানুষ, সেও নিশ্চয়ই আমার মতই অনেক বেশি চাপা কষ্ট অনুভব করে। তবে যারা এমন বলে কিংবা বলতো তাদের কথা মনে হয় সত্যি হয়ে যাচ্ছে। আমি ইদানিং টের পাই আমার অনুভূতিগুলো কাঁচের দেয়ালে আছড়ে পড়তে পড়তে তারা ইদানিং আর কোন ব্যথা অনুভব করেনা। আমি সত্যিই রোবট হয়ে যাচ্ছি।

পৃথিবীতে দুটো মানুষের জন্য আমি এখনো বেঁচে আছি। আমার বাবা, মা। আমি জানিনা আমার জীবনে এ দু জন মানুষ না থাকলে আমি এই লেখাটা লেখার জন্য অপেক্ষা করতাম কীনা।

আমি আসলে ব্লগ লিখতে ভালোবাসি। কারণ আমি এখানে একতরফা ভাবে ভেবে নিতে পারি আমার ভেতর থেকে বের হয়ে আসা শব্দগুলো আমার কথাগুলো শুনে বুঝতে পারছে আর মমতা নিয়ে আমার অনুভূতির গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

Posted in দিন লিপি

২৬ অক্টেভ, ২০১১

মনটা ভীষণ অস্থির আর মাথাটা ভীষণ ভারি হয়ে আছে। আমি চেয়ারে বসে আছি, আর ভাবছি কতদিন পর দিনলিপি লিখতে বসলাম।

আজ মহিবের এই ব্লগটা বহুদিন পর আবার পড়লাম এবং হঠাৎ করে সচলায়তনের প্রথমদিককার সময়গুলো আর আই ইউ টিতে ৫২৮নাম্বার রুমে ঘর অন্ধকার করে ব্লগিং করার দিনগুলো মিস করতে থাকলাম। মনে হলো সবকিছুর পরেও সময়গুলো কত দারুণ ছিলো!

আমার রুমের লাইটটার নিচে একটা টিকটিকি নিচের দিকে মুখ দিয়ে স্পাইডার ম্যানের মত ঝুলে কী গভীর মনযোগ দিয়ে কিছু একটা খেয়াল করছে। চাউনি দেখে মনে হচ্ছে পর্যবেক্ষণের বস্তুটা আমি। অবশ্য আমি নিশ্চিত নই। টিকটিকি গুলা খাড়া দেয়ালে এভাবে কেমন করে ঝুলে থাকে কে জানে। ওদের কি মাথা ঘুরায়না একটুও? কি আজিব।

আমার হাতে অনেকগুলো কাজ। কিছুই করতে ইচ্ছে করছেনা। কিছুইনা। সব ছেড়েছুড়ে নিরুদ্দেশ হওয়াটা এত কঠিন কেন?

আবার কপালের দু পাশে চিনচিনে ব্যথা শুরু হলো। এটা চার পাঁচদিন ধরে আমাকে সঙ্গ দিচ্ছে। এবং সত্যি বলতে আমি সেটা মোটেও উপভোগ করছিনা।

সুইমিং করতে গিয়ে ক্লোরিন পানিতে শরীর কালো হয়ে যাচ্ছে দেখে আজ আর যাইনাই। জামান, ইমতিয়াজ, রায়হান গেলো শুধু। রায়হানের স্পেনের ভিসাটা ঠিক সময়ে হলোনা, তাই কনফারেন্সটা মিস করলো ও। বেচারা সারাক্ষনই অনেক হাসছিলো, আর ভাব নিতেসিলো কিছুই হয়নি। লুকিয়ে রাখা এত সহজ, হাহ? আমার নিজেরই অনেক খারাপ লাগতেসিলো শোনার পর।

আর আজ আমাদের সবার মুখেই কিছুক্ষন পর পর “সে এক রুপকথারই দেশ” গানটা উঠে আসছিলো আর আমরা গুনগুনিয়ে উঠছিলাম।

মিতালিতে ভর্তার দাম হঠাৎ করে ১২টাকা থেকে ২০টাকা হয়ে গেছে। তাই আমরা টাকা বাঁচাতে এখন সোহাগে যাই। শুধু মুশকিল একটাই। সোহাগে সব ভর্তা আর ভাজির স্বাদই একরকম লাগে।

আমার আবার নিয়মিত দিনলিপি লেখা উচিত। মাথার ভেতর অনেক অনেক হাবিজাবি ঢুকে আছে। সেগুলোকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা দরকার।

Posted in দিন লিপি | ১ টি মন্তব্য

বাঁইচ্যা আছি


মানুষ বড় হয়ে কত কিছু হইতে চায়। কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, নবীন গবেষক, আবার কেউ ছাত্রলীগের নেতা। আমি যত বড় হইতে লাগলাম খালি মনে হতে লাগলো আমার কিছুই হওয়ার দরকার নাই। ২৪/৭ মনের মত আলসেমি করে দিন পার করে দিতে পারলেই আমি খুশী। সে লক্ষ্যে বেশ ভালোমতই এগিয়ে যাচ্ছিলাম। বিএসসি সার্টিফিকেট বালিশের তলায় রেখে রাতের বেলায় ঘুমাতাম আর সকাল সাড়ে বারোটায় ঘুম থেকে উঠে হাই তুলতে তুলতে ভাবতাম – আহা, জীবন কত সুন্দর! মানুষ হয়ে জন্মানোর অন্যতম বড় অভিশাপ হইতেসে এই প্রজাতির কপালে বেশিদিন সুখ সয়না। কপাল খারাপ, চেহারা দেখে মাঝে মাঝে অন্যপ্রজাতির মনে হইলেও আমিও আসলে মানুষ হয়েই জন্মাইসিলাম। ওয়ান ফাইন মর্ণিং আমার সকল অলসতা জলাঞ্জলি দিয়ে লাবলু ভাইয়ের পিছু পিছু অফিস যাওয়া শুরু করলাম। তারপর একদিন না, দুই দিন না, তিন তিনটা মাস এবিসির ডেস্কে বইসা কম্প্যুটার চালাইলাম। ভাবলাম কী, আর হইলোডা কী। হায় সুখ, সোনালী ডানার সুখ!

এই দিকে বাসায় বাপ মা টেনশন করে। ছেলে কিছু করেনা ক্যান, পড়াশুনা করতে চায়না ক্যান, চাকরি করতে চায় না ক্যান, খালি ক্যান আর ক্যান। এত ক্যান ক্যান সহ্য করতে না পাইরা রাজি হইলাম যে এমবিএ করমু। ঢাকা ভার্সিটির ফর্ম তুইলা পরীক্ষা দিলাম। ভাবসিলাম পামুনা, অবশ্য পামুই বা ক্যান। না পইড়া কে কবে পাশ করসে। কিন্তু হয়ে গেল। আমি পড়লাম চিপায়। তারপর আবার বুঝাইলাম সামনে আইবিএ পরীক্ষা, এইটা এমবিএর বড় বাপ। এইটা বাদ্দিয়া ঐটায় দেই। বাপ মা প্রথম প্রথম গাইগুই করে পরে রাজি হয়ে গেল। আমি আরো কয়েকমাস আলসেমি করার লাইসেন্স পাইলাম। এদিকে নবীন গবেষক রায়হান আবীরের ডিপার্টমেন্টে এমফিল এর জন্য এপ্লাই করলাম। এমবিএর চে নিজের পছন্দের কিছু নিয়ে থাকা ভালো সেইটা ভেবে দেয়া। আর বিদেশ টিদেশ থাকা আমারে দিয়া হবেনা সেটা বহু আগেই বোঝা হয়ে গেসে। তবে এপ্লাইয়ের পরেই বুঝলাম এইখানেও আশা নাই। দশ জন নেয়ার কথা, আমি এগারো নাম্বারে এপ্লাই করসি। তাই এইটার আশা বাদ্দিয়া ভাবতে লাগলাম এখন কী করা যায়। ভাবতে ভাবতে দেখি আইবিএ এক্সামের ফর্ম তোলার ডেট কবে চলে গেসে টেরও পাইনাই। :-? বাসায় এইটা বললে মাইরা ফেলবে। তাই কিছু বললাম না। বাসায় বললাম ঠিকাছে, সামনে পরীক্ষা, দোয়া কইরো। যথাসময়ে পরীক্ষা দিলাম এবং বাসায় জানাইলাম দুর্ভাগ্যক্রমে তাদের পুত্র চান্স পায়নাই। বাপ মা মন খারাপ করলো, আমিও করলাম। এমন সময় জানলাম এমফিলে আশা এখনো আছে, হয়ে যাইতে পারে। চাকরি এড়ানোর সুযোগ আবার চোখের সামনে দেখতে পেয়ে মনে বল ফিরে পাইলাম। আমার লাক বরাবরই খারাপ। তাই খুব বেশি আশা করে রইলাম তাও না। বাসাতেও আগে থেকে কিছু জানাইলাম না। বাপ মা রে বার বার ছ্যাঁকা দিতে কারই বা ভালো লাগে। শেষ মেষ স্যার নিশ্চিত করলো যে নেক্সট তিনবছর চাকরি বাকরি নিয়া টেনশন করতে হবেনা। আমি হাপ ছেড়ে বাচলাম।

তাই এখন আমি সকাল বেলা উঠে রুটি খাই। তারপর চৈতালি বাসে দুলতে দুলতে কার্জন হলের গেটের সামনে পৌঁছে নেমে পড়ি। চারপাশটা বড়ই মনোরম। ছেলে পিলেরা প্রেম করে, মাঝে মাঝে জীবনে বৈচিত্র্য আনতে পড়াশুনা করে। দেখে ভালো লাগে। ছোটবেলায় খুব শখ ছিলো ঢাকা ভার্সিটিতে পড়বো। কিন্তু কখনো ভাবিনি পূরণ হবে। হয়ে গেল ক্যামনে ক্যামনে জানি। তাই আপাতত খুশি।

——————————————————————————-

পহেলা বৈশাখে মানুষ কত কী করে। বাইরে বেরোয়, পাঞ্জাবী পড়ে মাঞ্জা মেরে ঘুর্তে বেড়োয়, পান্তা খায় , সাথে একটা মরিচ চিবায়। আর আমার কাছে পহেলা বৈশাখ মানে সারাদিন বাসায় একটু আরামে থাকা যাবে, আজকে আর কারেন্ট যাবেনা। কিন্তু এইবার সকাল সাড়ে দশটায় কারেন্ট গেলোগা। মেজাজ গেলো খারাপ হয়ে। তখনই উদয় এসে জানালো নিচে খাবার রেডি। লাবলু ভাই যেতে বলসে। উদয় লাবলু ভাইয়ের একমাত্র ছোট ছেলে :D । রেডি হয়ে জামানরে ডাকি। সে উঠেনা। দশ মিনিট ধাক্কাধাক্কি করে তার চোখ খুলাইলাম। সেই খোলা চোখ চার সেকেন্ড পড়েই আবার বন্ধ হয়ে গেল। বুঝলাম হবেনা। তাই সাফওয়ান আর আমি মিলেই রওনা দিলাম দুই তলার উদ্দেশ্যে। খাওয়ার টেবিলে বসে চোখ কপালে উঠলো। গুনে গুনে দেখলাম আট পদের ভর্তা। সাথে পান্তা ইলিশ ভাজি। আর খিচুড়ি গরু। দেখেই অর্ধেক পেট ভরে গেল। বাকি অর্ধেক ভরাতে খাওয়া শুরু করলাম। যারা আমাকে চিনে তারা খুব ভালো মতই জানে আমি কত বড় ভোজন রসিক। কিন্তু আমিও ক্যামনে ক্যামনে জানি বহু খেয়ে ফেললাম। আর খেয়ে টেয়ে মনে হল কী অছাম একখান বাঙালি খানা খাইলাম বহুদিন পর। খাওয়া শেষে ঢেকুর তুলতে তুলতে আবার চারতলা অভিমুখে রওনা দিলাম। রুমে ঢুকে দেখি জামান বিরস মুখে ফেসবুকিং করে। বেচারা। জানলোও না তার পেটে কী জিনিস ঢুকলোনা।
———————————————————————————————–

ইদানিং আবার নতুন কাহিনি যোগ হইসে। ইস্টার্ন হাউজিং এর অনেক প্লট এখনো খালিই রয়ে গেছে। এলাকার পোলাপান সেগুলারে মাঠা বানায়া সকাল বেলা ক্রিকেট খেলে তো বিকেল বেলায় ফুটবল। এতদিন খালি তাদের খেলা দেখতাম, আর মনে হইতো বড় হয়া গেলাম নাকি। খেলাধূলা যে একেবারেই বাদ গেল। তবে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আমরা ক্রিকেট খেলা শুরু করসি উইকেন্ড এ। কত বছর ক্রিকেট ব্যাট ধরিনা গুনতে গেলে আঙুল ব্যাথা হয়ে যাবে। তাই গোণাগুণি বাদ্দিয়া ক্রিকেট খেলি দুপুরের রোদরে বুড়া আঙুল দেখায়া। খারাপ লাগেনা। হঠাৎ করে মনে হয় এখনো বড় হয়ে যাইনাই। আমাদের পোলাপান খেলতে আসে দেখে বেশ আড্ডা আর খানাপিনাও হয়ে যায় খেলাধুলা শেষে। ভালোই লাগে।

সব মিলায়া দিনকাল ভালোই। মহাসুখে না হইলেও, আপাতত সুখেই আছি। তবে একটু টেনশনেও আছি। মানুষ প্রজাতি বড়ই দুর্ভাগা । তাদের কপালে নাকি বেশিদিন সুখ সয়না।

Posted in দিন লিপি | ১ টি মন্তব্য

মার্চ এর শেষ , ২০১১

কয়েকদিন ধরে বুঝতে পারছি আমার ব্লগে নতুন একজন পাঠক বেড়েছে। সে খুব মনযোগ দিয়ে আমার পুরনো ব্লগগুলো ধুলো ঝেড়ে বের করে আনে। তারপর পড়া শুরু করে। এবং পড়া শেষে মন খারাপ করে একা একা বসে থাকে। কাল রাতেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি : )

আমার অনেকগুলো কাজ জমে গেছে হাতে। কোনটার পর কোনটা শুরু করবো সেটা ঠিক করতে গিয়ে কোনটাই শেষমেষ শুরু করা হচ্ছেনা। ইদানিং মনে হচ্ছে আমার হাত দুটো টিকটিকির ল্যাজের মত না বলে কয়ে একদিন দুই সাইড থেকে খসে পড়ে যাবে। কিছুক্ষন টাইপ করলেই প্রচন্ড ব্যথা শুরু হয়। নিয়মিত কিছু হাতের এক্সারসাইজ করা দরকার। অন্তত গত একবছর ধরে এক্সারসাইজ শুরু করার কথাটা ভাবছি। খেকয

ডানে তাকালেই দেখা যাচ্ছে আমার জানলার মুখোমুখি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা বাসার সামনের রাস্তাটুকুতে প্রমীলা ক্রিকেট চলছে। অনেকগুলো বিকেলবেলাতেই এই বাসার মেয়েগুলো হাতে ব্যটবল নিয়ে নেমে যায়, ক্রিকেট খেলে। ইস্টার্ণ হাউজিং এর এই এলাকাটাতে এখনো ঘরোয়া একটা ভাব আছে। দেখে মনে হয় ঢাকা শহরের মানুষগুলো নিজেদের জন্য কিছু সময় ব্যয় করার কথা এখনো পুরোপুরি ভুলে যায়নি। দেখে ভালো লাগে।

কয়েকদিন ধরে আবহাওয়া দারুণ। কেমন ঠান্ডা ঠান্ডা একটা বাতাস চুপচাপ বয়ে গিয়ে সবসময় মন ভালো করে দিয়ে যায়। আকাশটা খানিকটা মেঘলা থাকে যদিও, তবে মেনে নিতে সমস্যা হয়না। আর এখন হচ্ছে টিপটিপ বৃষ্টি। হালকা ছাঁটের মত। শরীর ভেজেনা। তবু মনটা ঠিকই কেমন ভেজা ভেজা হয়ে যায়।

মাই ডীয়ার নতুন পাঠক, এত রাত জেগে জেগে ব্লগ পড়া ঠিক না। পরের দিনের ক্লাস, ল্যাব দুটোই মিস করবেন তাহলে : )

Posted in দিন লিপি | 3 টি মন্তব্য

মার্চ ২৯, ২০১১


ব্যস্ত থাকা মানেই বোধহয় ভালো থাকা।

দিনগুলো কখন কেমনে ক্যালেন্ডারের ফাঁক গলে চলে যাচ্ছে বুঝতে পারছিনা। তবে বোধহয় ভালোই আছি। সকাল নয়টায় উঠি , ডিপার্টমেন্টে যাই, কাজ করি, আকাজ করি, চা খাই, কালাভুনার ঝাঁঝ মাথা পর্যন্ত উঠিয়ে দুপুরের খাবার শেষ করি। তারপর ৫:২০ এর ভার্সিটির বাসের দোতলা থেকে ঢাকা শহরটাকে দেখতে দেখতে বাসায় ফেরা প্রতিদিন। তার সাথে দলে এসে ভিড়ে বৃহস্পতি-শুক্রবারের আলসেমি, সপ্তাহে সাতদিন থেমে থেমে স্কাইপেতে ঝগড়া,খুনসুটি, ভালোবাসা। এইতো

Posted in দিন লিপি | মন্তব্য দিন