অগাস্ট ৩১,২০১৪

থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে সেই কখন থেকে। কারেন্ট চলে গেছে শুরুর দিকেই।তারপর এক সময় জেনারেটরটাও। আছে শুধু ঘরভর্তি অন্ধকার,আর বৃষ্টির মন ভালো করে দেয়া ঝিরঝির শব্দ। অনেকক্ষণ হল বিছানায় শুয়ে আছি। ফুটবল খেলে গা ভর্তি ব্যাথা। এপাশ ওপাশ করতেও আহ উহ করছি। তারপরও খারাপ লাগছেনা। কিছু ব্যাথা মধুরও হয়।

কয়েকদিন ধরে প্রতিদিনই বৃষ্টি হচ্ছে। ব্যাপারটা দারুন সুখকর। বৃষ্টি ভাল লাগে, সকাল,বিকেল,রাত্রি,যখনই হোক তখনই ভাল লাগে। বৃষ্টি হচ্ছে সবচে প্রিয় বন্ধুটার মত, শুধু কখনোই আড়ি হয়না তার সাথে। মেঘের মত পেঁজা পেঁজা অনুভূতির সাথে দারুণ সময় কাটে।একা একা কত কিছু ভাবি। ভাবতে ভাবতে অনুভূতির নৌকা কখন কোন ঘাটে যেয়ে থামে তার হিসেব রাখা হয়না। মনের সাথে হিসেব করে কবেই বা কিছু করা হয়। 

আজকে প্রথম মোবাইল থেকে দিনলিপি লিখলাম। বেশ মজার।

Posted in Uncategorized | মন্তব্য দিন

জুলাই ৪, ২০১৪

বহুদিন পর কিছু একটা লিখতে ইচ্ছে করলো। ইচ্ছে করার এই ব্যাপারটা বর্তমান সময়ের বিবেচনায় একদমই যায়না। কতদিন যে কিছু লিখিনা, এক দুই লাইনও না। কিন্তু তারপরও আজ ইচ্ছে করলো, এতো বেশি যে সকল অলসতাকে চুপ করিয়ে দিয়ে সত্যি সত্যি এডিটর খুলে বসে পড়লাম লিখতে। অর্ণবের “হারিয়ে গিয়েছি” শুনলাম পর পর দুইবার। প্রথমবার শুনতে শুনতে আগের কিছু স্মৃতি মনে উঁকি দিয়ে গেল চুপি চুপি। তাদের দেখে আমার মনটা বিষণ্ন হয়ে গেল। তারপর দ্বিতীয়বার আবার শুনলাম। এবার মন খারাপের স্মৃতিগুলো বন্ধু হয়ে গেল গানটা শুনতে শুনতে। আর শুনতে অসম্ভব ভালো লাগলো। গান ব্যাপারটা আসলে দারুণ। ভালো লাগা খারাপ লাগার মাঝে যে ব্যবধানটুকু, খুব সহজে ভেঙে দেয়, কিছু বুঝে ওঠার আগেই। আর তখন মনে হয়, হাসিখুশি হয়েও বেঁচে থাকা যায় চাইলে, গানের কথাগুলোর মত, অনুভূতিগুলো পেঁজা তুলোর মত মেঘ হয়ে ভেসে ভেসে বেড়ায়। দারুণ অনুভূতি :)

তিনবছর এগারো মাস পর লাবলুস কে বিদায় জানানোর সময় হয়ে এসেছে। এই ব্যাপারটা যতবার মনে পড়ছে মনটা আবার একটু ভারি হয়ে আসছে। কী চমৎকার চারটি বছর কাটিয়েছি এখানে! সারা জীবন সাথে রেখে দেয়ার মত কত স্মৃতি জমে গেছে চারতলার এই ছোট্ট ভালোলাগার বাসাটুকু ঘিরে। এখন নিজেদের বাসায় উঠতে যাচ্ছি কাল, অথবা পরশু। কিন্তু এখানে, এই বাসায় যেমন ইচ্ছে ভাবার, কিংবা করার এই স্বাধীনতাটুকু, সেটা মিস করবো দারুণভাবে। গভীর রাতে যখন ঘুম আসবেনা, তখন আর চুপচাপ পৃথিবীর বাইরের একজন মানুষ হয়ে আর বসে থাকা হবেনা আমার এই চিলতে বারান্দাটায়। আর আমার ছোট্ট রুমটা, পারলে এটাকে সাথে করে নিয়ে যেতাম :(

আমি ইদানিং আগের মতই আছি বোধহয়। তবে যত বয়স হচ্ছে নানা জটিলতা বাড়ছে জীবনে। এবং এ বিষয়টাকে আমি প্রচন্ড রকমভাবে অপছন্দ করছি। আমার সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে সত্যিই হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। শুধু ইচ্ছেটুকুই শুধু সম্বল, আর কিছু নেই।

“গোটা শহর বাতি জ্বেলে সতর্ক, পায়ে পায়ে হারাবার জায়গা খুঁজে মরি..”

Posted in দিন লিপি | মন্তব্য দিন

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

মানুষের মন আসলে খুব অদ্ভূত। হাসিখুশি সময়ে যে জিনিসগুলো নজরে এসেও আসেনা একটু বিষণ্নতায় মগ্ন থেকে সেই জিনিসগুলোই একদম অন্যরকম ভাবে ধরা দেয়।

বহুদিন পর অঞ্জনের গান শুনি। একটার পর একটা, কোনরকম বাছবিছার না করে। ভাল্লাগতেসে।

আমি বহুবার করে পণ করি যা ইচ্ছা হয় তাই করবো, যেভাবে ইচ্ছা হয় সেভাবেই করবো। কিন্তু যখন সময়টা এসে উপস্থিত হয়, যখন ইচ্ছেমত আমার কিছু করার কথা, তখন সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায়। তারপর আমি বাসায় এসে দরজাটা বন্ধ করে পুরো পৃথিবীটাকে দরজার ওপাশে রেখে হালকা ভলিউমে গান শুনি, নিজের ইচ্ছেমত।

বহুদিন পর আজ কিছু একটা লিখতে ইচ্ছে করলো। তাই বহু বহুদিন পর আমার একলা আকাশে এক কোণে ভেসে বেড়ানো মেঘটুকুতে হানা দিলাম। একটু আগে অঞ্জনের গান শুনছিলাম – “আমার জানলা দিয়ে একটু খানি আকাশ দেখা যায়”। এই অদ্ভূত লোকটা কি অদ্ভুত সুন্দর করে কী অদ্ভুত সরলতায় মনের সকল কিছু গানে গানে বলে যায়। আসলেই অদ্ভুত!

আমার পরবর্তী কয়েকদিনের জন্য বেশ কিছু কাজ জমে গেছে। সেগুলো একে একে ঠান্ডা মাথায় শেষ করতে হবে। আমার এখন একদম গলা অবধি কাজে ডুবে থাকার সময়। আমার এখন সবকিছু ভুলে শুধু নিজেকে ভালোবাসার সময়। জামান যেমনটা বলে, জীবন আসলে খুব বড়সড় একটা ভ্রমণ। সে ভ্রমণে সহযাত্রী বদলায় সময় সময়, যাদেরকে আমরা সুন্দর করে বাংলায় “বন্ধু” বলি। একেক স্টেশনে একেক যাত্রী নেমে যাবে, সেটাই স্বাভাবিক। আবার সামনের কোন স্টেশন থেকে নতুন কেউ পাশে এসে বসবে। গল্প হবে কথা হবে, গল্প কথা হতে হতে আবার তারও নেমে যাবার সময় হয়ে আসবে একসময়। এবং এটাই স্বাভাবিক।

এখন সঞ্জীবের গান শুনি।

কোথাও বাঁশী বাজছিল
হাওয়ারা খুব হাসছিল
আমার ছিলো বন্ধ কপাট
অন্ধ চোখে রাত ছিলো

Posted in দিন লিপি | 2 টি মন্তব্য

২৬.৬.২০১৩

ভার্সিটি বাস থেকে নেমে দাড়ায় আছি সাফওয়ানের জন্য। সাফওয়ান আমার রুমমেট। সে বড়লোক। তার একটা হোন্ডা আছে। অফিস থেকে সে হোন্ডাতে ফিরতেসে। আর আমি দাঁড়ায় আছি তার জন্য। তারপর আমরা বৈকালিক নাশতা খেয়ে বাসার পথে হোন্ডাযোগে রওনা দিবো। কয়েকবার ফোন দিলাম। কিন্তু হারামি ফোন ধরেনা। মেজাজ পুরা বিলা। আজকের আবহাওয়া বেশ ভালো ছিলো, তাই চান্দি একটু কম গরম। কিন্তু গরম। এই যখন সর্বশেষ অবস্থা হঠাৎ কাঁধে কে যেন হাত রাখলো। কপাল কুঁচকে পিছন ফিরে তাকালাম। দেখলাম বয়স্ক এক মহিলা। ভাবলাম ভিক্ষুক। বলতে চাইতেসি মাফ করেন। কিন্তু তার আগেই শীর্ণ হাতটা বাড়ায় দিলেন আমার দিকে। তাতে একটা কাগজ। আমি হাতে নিলাম। সেটা আসলে কাগজ না। একটা প্রেসক্রিপশন। মনে হয় সাহায্যই চাবেন। আবারও রেডি হইলাম। বলবো – মাফ করেন। কিন্তু না। বৃদ্ধা বললেন – বাবা রক্ত টেশ করবো। কোথায় করবো একটু বলে দিবা? আমি আর মাফ করেন বলতে পারলাম না। বরং তার পিছনের দিকে একটা লম্বা বিল্ডিংয়ের দিকে আঙুল তুলে বললাম, ঐখানে যান। চাচী ফ্যালফ্যাল করে তাকায় থাকলেন। বুঝলাম কিছুই বুঝেননাই। উনারে চাচীই বললাম। যদিও উনি আমার নানীর বয়সী হবেন। যাইহোক। শেষমেষ বললাম – চলেন আপনারে নিয়া যাই। ডায়গনস্টিক সেন্টারটা দোতলায়। উনারে দোতলায় দরজার সামনে ছেড়ে দিয়ে ফিরে আসবো ভাবতেসি মনে মনে। শেষমেষ ভাবলাম, না। ভেতরে ঢুকায়েই দিয়ে আসি। ভেতরে ঢুকায়ে মনে হইলো উনি বিল্ডিং চিনেননাই, রিসেপশনিষ্ট চিনবেন ক্যামনে? আমি প্রেসক্রিপশনটা হাতে আর চাচীরে পিছনে নিয়া রিসেপশন ডেস্কের সামনে গিয়া দাঁড়াইলাম। রিসেপশনে একজন মহিলা। ঠিক মহিলাও না আবার। মহিলার চে একটু কম বয়েসী। উনাকে প্রেসক্রিপশন দিয়ে বললাম দেখেন তো কী অবস্থা। উনি দেখে টেখে বললেন এক হাজার টাকা লাগবে। আমি প্রেসক্রিপশনটা দেখলাম এইবার। একটা ব্লাড টেস্ট, আর একটা ইউরিন টেস্ট। দুই টেস্টে একহাজার টাকা। কঠিন অবস্থা। আমি আবার ভাবলাম। ভাবলাম যে রিসেপশনিস্ট চিনেনা তার কাছে একহাজার টাকা থাকবে ক্যামনে? আমার নিজের পকেটেই একহাজার টাকা নাই। তবু চাচীরে জিজ্ঞেস করলাম। কারণ জিজ্ঞেস করা ছাড়া কোন উপায়ও নাই। বললাম – চাচী এক হাজার টেকা লাগবে। চাচী এইবার হাউমাউ করে কিছু বললেন। পুরাটা বুঝলাম না। খালি বুঝলাম উনার কাছে একহাজার টাকা নাই। আমি রিসেপশনিস্টকে বললাম – একটু কমানো যায়? রিসেপশনিস্ট তার লাস্যময়ী হাসিটা এবার আগেরবারের চে আরেকটু বাড়ায় দিলেন, কিন্তু টেকা কমালেন না। চাচীরে আবার জিগাই। চাচী, টেকা তো মেলা লাগে। কী করবেন? চাচী আবার হাউমাউ করে করে কিছু একটা বলেন। সবকথা বুঝতে পারিনা। শুধু বুঝলাম তার কাছে তিনশো টেকা আছে। কিন্তু একহাজার টাকা নাই। আমি এইবার রিসেপশনের আরেক ভদ্রলোকের কাছে যাই। বললাম ভাই দেখেন না একটু। চাচীর তো টেকাটুকা নাই। শুনে তিনিও হাসেন। সে হাসিতে মধু ঝরে পড়ে। ঠিক তার সহকর্মীনীর মত। কিন্তু একহাজার টাকা একহাজার টাকাই থাকে। আমি চাচীর দিকে তাকাই। চাচীও আমার দিকে তাকায়। কী করবো বুঝতে পারিনা। আমিই যেইখানে বুঝতে পারিনা সেইখানে চাচী বুঝবে ক্যামনে? তারপরও শেষবারের মত হাসিখুশি রিসেপশনিস্টকে আরেকবার অনুরোধ করি ডাক্তার সাবকে একটু বলতে। যদি একটু কমানো যায়। নিতান্ত অনিচ্ছাতেও তিনি ডাক্তার সাবকে গিয়া জিগান। কী জিগাইলেন কিছু শুনতে পাইনা। দূর থেকে শুধু দেখি তার মুখ থেকে আবার মধু ঝরে পড়তেসে। ডাক্তার সাবও সবশুনে হাসেন। সে হাসিও মধুমাখা। কিছু একটা বললেন। বলে আবার তিনি রোগী দেখার মহান কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। রিসেপশনিস্ট ভদ্রলোক ফিরে এসে বললেন – কমসে। আমি খুশি হয়ে উঠি। জিজ্ঞেস করলাম – কত? উনি টাকার অংক বললেন। ডাক্তার সাহেব অতি মহানুভব ব্যক্তি। একহাজার টাকা থেকে নয়শো টাকা করে দিয়েছেন তিনি। ডাক্তার সাহেবের এহেন মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে গেলাম। খালি মুখটা কেমন তিতা তিতা হয়ে গেল। রিসেপশনিস্টও বোধহয় ব্যপারটা বুঝতে পারলেন। সে জন্যেই বোধহয় হাসিতে আরো একটু মধু ঢেলে দিলেন। আমি তাকায় তাকায় তা’ দেখলাম। দেখে মনে হইলো গালে দুইখান চটকানা মেরে মধুর সাপ্লাই বন্ধ কইরা দেই। কিন্তু মুখে বললাম – ঠিকাছে। প্রেসক্রিপশন রাখেন। চাচীরে বললাম – চাচী আপনে বসেন আমি আসতেসি। নিচে ডিবিবিএল বুথ থেকে টেকা তুলে আবার এসে রিসেপশনিস্টকে দিলাম। টেকা দেখে কে না খুশি হয়। আমি হই, সাফওয়ান হয়। দুনিয়ার সবাইই হয়। কিন্তু রিসেপশনিস্ট কেন জানি খুশি হইলেননা। জিগাইলেন – আপনার কে হয়? আমি বললাম – কেউ হয়না। আপনি টাকা রাখেন। শুনে রিসেপশনিস্টের মুখও কেমন কেমন তিতা তিতা হয়ে গেল বলে মনে হয়। মধু ঢালার দায়িত্ব এইবার আমি গ্রহণ করলাম। দিনের সবচে সুন্দর হাসিটা হেসে বললাম- ঠিকাছে না? রিসেপশনিস্ট এইবার কিছু বললেন না। শুধু মাথা নাড়লেন উপর নিচ। আমি মনে মনে বললাম আলহামদুলিল্লাহ। মধুর সাপ্লাই পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে। আমি উল্টা ঘুরে চাচীকে বললাম – চাচী চলেন। ঝামেলা শেষ। এইবার আপনার টেশ করার পালা।

টেস্টের জন্য ডাক পড়ার অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে চাচীরে জিগাই- বাড়ি কই আপনার? চাচী বলেন – ফুলবাড়িয়া ময়মনসিংহ। একটা মেয়ে। গার্মেন্টসে কাম করে । আর সে কাম করে বাসায় বাসায়। নিজে নিজেই গড়গড়িয়ে আরো বহু কথা বলতে থাকেন। আমি শুনি। চুপচাপ শুনি। শুনতে শুনতে আমি চাচীর দিকে আবারো তাকাই। তারে আমি চাচী চাচী বললেও সে আসলে আমার নানীর বয়েসি। আমার নানী যখন বেঁচে ছিলেন একটা একান্নবর্তী পরিবারের সর্বময় কর্ত্রী ছিলেন। তিনি যখন হাঁটতেন তখন আঁচলের গোছায় ঝুন ঝুন করে বাজতো আমাদের বিশাল পরিবারের কর্তৃত্বের প্রতীক, এক গোছা চাবি। নানী মারা গেছেন বহু বছর আগে। কিন্তু ঝুনঝুন করে চাবির গোছা বাজার শব্দ এখনো চোখ বন্ধ করলে আমি শুনতে পাই। অন্যদিকে কোমরের ব্যাথায় বার বার বাঁকা হয়ে যাওয়া এই চাচী ঢাকা শহরে একা একা রক্ত টেশ করতে আঁচলে তিনশো টেকা বেঁধে উদভ্রান্তের মত এদিক সেদিক ঘুরেন। আমরা খালি তা’ তাকায় তাকায় দেখি। দেখে দেখে রিসেপশনিস্টের হাসি আরো মধুমাখা হয়, ডাক্তার সাহেব একশো টাকার সমপরিমাণ মহানুভব হয়ে ওঠেন।

সবকিছু শেষ হয়ে গেলে স্লীপখানা চাচীর হাতে দিয়ে বলি চাচী বাড়ি যান। কালকে এসে রিপোর্ট নিয়ে গিয়ে ডাক্তার রে আবার দেখাইয়েন। চাচী হাউমাউ করে এবারও কিছু বলেন। কী বললেন সেটা এবারও পুরেপুরি বোঝা হয়না । শুধু বুঝলাম চাচী বলসেন – অনেক বড় হও বাপ। আমি মনে মনে বললাম – আমারে বড় হইতে বলে কী হবে চাচী। তার চে বরং ডাক্তার সাবের জন্যে আরো বড় হবার দোয়া করেন। ভবিষ্যতে যাতে আরো দশ বিশ টাকা কম নিতে পারে মানুষের কাছ থেকে। ভবিষ্যতে যেন একশো টাকা থেকে দুইশো টাকার মহানুভব হইতে পারেন।

আমার হঠাৎ খুব হতাশ লাগে। কেন লাগে বুঝতে পারিনা। কিংবা বুঝলেও আসলে নিজেকে বুঝতে দিতে চাইনা। এতক্ষণ ধরে চাচী চাচী করলেও আসলে আমার নানীর বয়সী মানুষটার কথা ভেবে হতাশ লাগে। আজকে তিনশো টেকা বেঁচে গেসে তার। কিন্তু কালকে বাঁচার গ্যারান্টি নাই। ডাক্তার সাব হয়তো আবারও মহানুভব হবেন। কিংবা হবেন না। হয়তো পাঁচশো টাকা থেকে একশো টাকা কালও মহানুভবতার খাতায় যাবে। বাকি থাকবে চারশো টাকা। কিন্তু আরেকশো টেকা আসবে কোত্থিকা? বুঝে পাইনা। এত লেখাপড়া কইরা আমিই যেইটা বুঝতে পাইনা, সেইটা আমার মত মহানুভব মানুষদের বাসায় বাসায় কাজ করা চাচী বুঝবে ক্যামনে?

চাচীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি বাসার দিকে রওনা দেই। হঠাৎ আমার খেয়াল হয় সাফওয়ান হারামিটা এখনো আসেনাই। যার সাথে হোন্ডায় চড়ে আমাদের একসাথে বাসায় ফেরার কথা ছিলো।

Posted in দিন লিপি, Uncategorized | ১ টি মন্তব্য

২৫সেপ্টেম্বর, ২০১২

বিষন্ন রাত নতুন কিছু নয়। কিন্তু আজকের রাতটা বড় অসহ্যও লাগছে। কিছুক্ষণ ঘরের এপ্রান্ত ওপ্রান্ত হাটাহাটি করলাম, বারান্দাকে গিয়ে কিছু সময় দাঁড়িয়েও থাকলাম আঁধারের সাথে গা মিশিয়ে। কিন্তু কিছুতেই মন শান্ত হচ্ছেনা। দুপুর বেলায় সার্ভিস সেন্টারের বাচালটার সাথে খিটিমিটি করা থেকে শুরু । তারপর বাংলাদেশ এমন করে হেরে গেল পাকিস্তানের সাথে। সাথে আরো কয়েকটা হাবিজাবি মনখারাপ করা চিন্তা মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। সবমিলিয়ে এমন বাজে রাত সাম্প্রতিকসময়ে পার করতে হয়নি। ঘুম আসছেনা, একদমই না। আজ এবিসিতে গেলাম। কিছুসময় কাজ নিয়ে বিজি থাকলাম। ঐ সময়টুকুই একটু ভালো গেছে বলা চলে।
আমার পরীক্ষার খুব বেশি দেরি নেই। মাথার ওপর অনেক অনেক পড়ার চাপ। ধুর।

Posted in Uncategorized | ১ টি মন্তব্য

বদলে না যাওয়া ভালোবাসাগুলো


১৯৯৮ সালের জুন মাসের এক তারিখ

আব্বা, আম্মা আর আমি – এই তিনজন গাড়িতে করে টাঙ্গাইল যাচ্ছি। সবাই বললো ক্যাডেট কলেজে চান্স পাওয়া অনেক কঠিন। তাই ঠিক হলো আমাকে ক্যাডেট কোচিং এ দেয়া হবে। যেখানে থাকি সেখানে ভালো কোন কোচিং নেই। অগত্যা টাঙ্গাইলে চলো। ঠিক হলো আবাসিক থেকে কোচিং করবো কয়েক মাস। আজ সেই দিন। আমাকে কোচিং এ রেখে আসা হবে। গাড়িতে আম্মা আমার পাশে বসা। হাতদুটো শক্ত করে ধরে আছে। যেন ছেড়ে দিলেই কোথাও হারিয়ে যাবো। কাল সারারাত আম্মা ঠিকমতো ঘুমোয়নি। আম্মাকে অনেক দিনের জন্য শেষবারের মত জড়িয়ে ধরে ঘুমানোর সময় সেটা ঠিকই বুঝতে পেরেছি। গতরাতের কথা মনে করে হঠাৎ অনুভব করলাম, আজ রাতে আমি আর আম্মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে পারবোনা। আমি জানলা দিয়ে বাইরে তাকাই, কিন্তু কিছুই যেন চোখে পড়েনা। সবকিছু বিষণ্ন আর ঝাপসা লাগে। শুধু মনে হতে থাকে আমি আজ রাতে আম্মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে পারবোনা। না বলে কয়েই আমার চোখটা ভীষণ জ্বালা করতে থাকে। আম্মা যেন কিছু বুঝতে না পারে সেজন্য আমি জানলা দিয়ে বাইরেই তাকিয়ে থাকি। মনে মনে শুধু প্রার্থনা করছি এই পথ যেন কখনো শেষ না হয়। না তাকিয়েও বুঝতে কষ্ট হয়না সে প্রার্থনা আম্মাও করছে। আম্মা আমার হাতটা যেন আরেকটু শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। কিন্তু চল্লিশ মিনিট পরেই বোঝা হয়ে যায় এ প্রার্থনা সফল হবার নয়, দেখতে দেখতে কোচিং এ পৌঁছে যাই। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে নিজের রুমে যাই। আম্মা নিজের হাতে সব কিছু গুছিয়ে দিলো, আর সাথে সাথে খাওয়া, পড়া এই সেই নিয়ে হাজারটা উপদেশ। আমি শুধু হু হ্যা করি। রুম গুছানোও একসময় শেষ হয়ে যায়, যেমন করে শেষ হয়ে গেছে শেষ কয়েকটি ঘন্টা। এবার বিদায় দেবার পালা। আব্বা নরম গলায় অনেক উপদেশ দেন, ভালোভাবে থাকতে , নিয়ম মেনে চলতে, আর নিয়ম মেনে পড়াশুনা করতে। আম্মা তখনো হাত আঁকড়ে ধরে আছে শক্ত করে। আম্মা জানে এবার হাত ছেড়ে দিলে সত্যিই হারিয়ে যাবো। শেষ মুহুর্তে আম্মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে, আমি বহু কষ্টে চোখের পানি সামলাই। আমার মনে হতে থাকে আমাকে কাঁদতে দেখলে আম্মা আরো বেশি কষ্ট পাবে। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আব্বা, আম্মার চলে যাওয়া দেখি। তখন সন্ধ্যা আসি আসি করছে। আব্বা আম্মা বিশ্বাস বেতকার গলির পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে একসময় বিকেলের সূর্যটার মতই মিলিয়ে যায়। আমার সব কিছু ঝাপসা আর অস্পষ্ট লাগে। মাথার ভেতর শুধু ঘুরতে থাকে আজ রাতে আমি আম্মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে পারবোনা।

১২ বছরের ছেলেটি তখনো জানেনা তার একলা ঘুমানোর দিন সেদিন থেকেই শুরু হয়ে গেছে, আম্মাকে জড়িয়ে ঘুমানোর দিন তার জীবনে আগের মত করে আর কখনোই আসবেনা।

৩জুন, ১৯৯৯

মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে আমার প্রথম দিন। আমাকে রেখে যেতে আম্মা আর আব্বা এসেছে শুধু। গত কয়েকদিন মনে কত শত রঙিন স্বপ্ন আর কল্পনা, সাথে খানিকটা আশঙ্কার ছবি এঁকেছি ক্যাডেট কলেজকে নিয়ে। কিন্তু ৩তারিখ যতই কাছে চলে আসছিলো মন খারাপের ঘোড়া ততই ছুটছিলো টগবগিয়ে। পুরনো সেই ভয় আবার আঁকড়ে ধরে, আম্মাকে ছেড়ে থাকতে হবে এতগুলো বছর। সময় কেমন দ্রুত ছুটে চলে। একটু পড়েই আব্বা , আম্মা চলে যাবে। ভেবেছিলাম কোচিং এ কয়েক মাস একা থেকে আমি অনেক বড় হয়ে গেছি। কিছুতেই আর কোন দিন হুট করে চোখ জ্বালা করবেনা কারো কথা ভেবে। কিন্তু আব্বা, আম্মা চলে যাবার সময় যত ঘনিয়ে আসছিলো বড় হওয়ার সব সমীকরণ কেমন ওলোট পালোট হয়ে যেতে লাগলো। বিদায় নেবার আগে আম্মা দরুদ পড়ে বুকে ফুঁ দিলো। আমার বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করে উঠলো। ইচ্ছে করছিলো তক্ষুণি আম্মার সাথে বাসায় চলে যাই। আমি হাউসের সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। আম্মা যেতে যেতে বার বার পিছে ফিরে তাকাচ্ছেন। আমি বড় হওয়ার ভান করে হাসিমুখে তাকিয়ে থাকি সে পথের দিকে, যে পথ ধরে আম্মা একসময় আমার চোখের আড়ালে চলে যাবে। মির্জাপুরের আকাশ তখন লালচে বিষণ্নতায় ছেঁয়ে আছে। আমি ডিনার ড্রেসের ধবধবে সাদা শার্টের হাতায় চোখ মুছতে মুছতে আরো কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি। আমার শুধু আম্মার কথা মনে পড়ে।

আমি বুঝে গেলাম, বড় হওয়ার এখনো ঢের দেরি।

১০ জুন, ২০১২

হুট করে অসুস্থ হয়ে পড়ে পাক্কা দু’সপ্তাহ বাসায় থেকে আজ আবার ঢাকা চলে যাবো। ভোরের বাসেই চলে যাওয়ার কথা ছিলো, আম্মা সেই ছয়টা থেকে ডাকাডাকি শুরু করেছে। কিন্তু আলসেমিতে আমার আর ওঠা হয়না। আম্মা কপট রাগ দেখায়, আবার একটু খুশিও হয়। আমি আরো কয়েকঘন্টা বাসায় থাকবো বলে। দুপুর হয়ে আসে আস্তে আস্তে। আম্মা জানলা দিয়ে তাকিয়ে বলে – এত কড়া রোদ, তোমার যেতে কষ্ট হবে। আজকে না হয় থেকেই যাও। কাল ভোরে জোর করে হলেও উঠিয়ে দেব। আমি যথাসম্ভব নিরাবেগ গলায় বলি – আজকে যেতেই হবে। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে অনেক। আম্মার মনের বিষণ্নতাটুকু পড়তে আমার কষ্ট হয়না। দুপুরে শেষবারের মত খাইয়ে দিতে দিতে আম্মা হা হুতাশ করেন, যাবার আগে শেষবারের মত আরো কিছু আম খাইয়ে দিতে পারলেন না বলে। এরকম অবস্থায় কিভাবে আবার একা একা থাকবো সেটা নিয়ে তার দুশ্চিন্তার শেষ নেই। ঘুরে ফিরে বার বার ঠিকমত খাওয়ার উপদেশ শুনতে থাকি কিছুক্ষণ পরপরই। সবকিছু শেষ বারের মত চেক করে বলি – আম্মা আমি বেরোই তাহলে এখন। গেটে দাঁড়িয়ে শেষ বারের মত বিদায় নেই। আম্মা যথাসম্ভব স্বাভাবিক গলায় বলে- ভালোভাবে যেও। বাসে পূর্ব দিকে বসবে যাতে রোদ না লাগে। আমি ছোট করে আচ্ছা বলে সামনে ঘুরে হাঁটা দেই। ক্যাডেট কলেজে থাকতেও ছুটি থেকে কলেজ ফেরার সময়ও বিদায় নিয়ে কখনো পেছন ফিরে তাকাতাম না। তাকালেই দেখতে পাবো – আম্মা শাড়ির আঁচলে নি:শব্দে চোখ মুছছেন। সে দৃশ্য সহ্য করার অভ্যেস আমার আজো হয়ে ওঠেনি। আজো আমার তাই কখনো পিছনে ফিরে তাকানো হয়না। হাঁটতে হাঁটতে আমার চোখটা সেই ১২ বছরের ছেলেটার মতই জ্বালা করে ওঠে। আম্মা নিশ্চয়ই ভাবে, ছেলে বড় হয়ে গেছে। আগের মত করে মায়ের কথা মনে করে চোখ ভেজায়না আর।

আমি শুধু জানি, আমার বুকের ভেতর সেই ১২ বছরের ছেলেটা আজো ঘুমিয়ে আছে। আমার আর কোনদিনই বড় হওয়া হবেনা।

Posted in Uncategorized | মন্তব্য দিন

১১.১১.১১

ঘুরে ফিরে সেই পুরনো উপলব্দিগুলোই আবার নিজের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। এ ব্লগে লেখা কেবলমাত্র চরম রকমের ডিপ্রেসড অবস্থাতেই বেশি হয়। স্বীকার করছি, আমি ভীষন রকমের ডিপ্রেসড এখন। সার্চ ইঞ্জিন আবার ব্লক করে দিলাম। নিজের ডিপ্রেশন মানুষ খুব গুরুত্ব নিয়ে বিচার করে, ভাবে। তবে অন্যেরটা শুনতে গেলা সেটাকে প্যানপ্যানানির চেয়ে বেশি ভালো কিছু কখনোই মনে হয়না।

মানুষ সবচে বড় কষ্টগুলো পায় তখনই যখন সে কী বলতে চাইছে তা যখন যাকে উদ্দেশ্য করে বলা সে বুঝতে পারেনা, উল্টো পুরো ব্যাপারটা ভুল বুঝে সেই মানুষটা যখন নিজের অজান্তেই কষ্টের বোঝাটা বহন করতে না পারার মত অসহনীয় করে দেয়।

আমি কাউকেই দোষ দিচ্ছিনা। কিন্তু আমি সত্যিই জানিনা আমার এ অবস্থায় কী করা উচিত। সারারাত ঘুমোতে পারিনি। কিন্তু আমি সত্যিই আর পুরো ব্যাপারটা সইতে পারছিনা। তাই মনটা হালকা করতে আবার সেই পুরনো বন্ধুর কাছে মাথা নিচু করে ফিরে আসা। অন্তত যে কখনো আমার কথার মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে এমন কিছু বলেনি যা আমাকে ভেতরে ভেতরে দুমড়ে মুচড়ে দেয়।

মাঝের বেশ কিছু সময় আমি দারুণ রকমের ভালো ছিলাম। মনে হতো আমার জীবনটা বেশ সহজ, সরল আর হাসিখুশি হয়ে আসছে। ইদানিং আবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আবার সেই পুরনো, ভেতরে ভেতরে ভেঙে যাওয়া প্রতিকৃতি দেখতে পাচ্ছি। কাছের মানুষরা বলে আমি একটা রোবট, কথাটা আসলে সত্যি ছিলোনা। শামুককে যখন কেউ বলে তুমি খুব শক্ত দেহের মানুষ, সেও নিশ্চয়ই আমার মতই অনেক বেশি চাপা কষ্ট অনুভব করে। তবে যারা এমন বলে কিংবা বলতো তাদের কথা মনে হয় সত্যি হয়ে যাচ্ছে। আমি ইদানিং টের পাই আমার অনুভূতিগুলো কাঁচের দেয়ালে আছড়ে পড়তে পড়তে তারা ইদানিং আর কোন ব্যথা অনুভব করেনা। আমি সত্যিই রোবট হয়ে যাচ্ছি।

পৃথিবীতে দুটো মানুষের জন্য আমি এখনো বেঁচে আছি। আমার বাবা, মা। আমি জানিনা আমার জীবনে এ দু জন মানুষ না থাকলে আমি এই লেখাটা লেখার জন্য অপেক্ষা করতাম কীনা।

আমি আসলে ব্লগ লিখতে ভালোবাসি। কারণ আমি এখানে একতরফা ভাবে ভেবে নিতে পারি আমার ভেতর থেকে বের হয়ে আসা শব্দগুলো আমার কথাগুলো শুনে বুঝতে পারছে আর মমতা নিয়ে আমার অনুভূতির গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

Posted in দিন লিপি